নজরে বিধানসভা, ভুল শোধরাতে মরিয়া তৃণমূল (ছবিটি প্রতীকী, সৌজন্য পিটিআই)
নজরে বিধানসভা, ভুল শোধরাতে মরিয়া তৃণমূল (ছবিটি প্রতীকী, সৌজন্য পিটিআই)

লক্ষ্য বিধানসভা ভোট, 'স্যার'-এর কড়া নজরদারিতে 'ভুল শোধরাতে' উদ্যোগী তৃণমূল

যদিও তৃণমূলের এই 'রেমেডিয়াল' পরীক্ষায় গুরুত্ব দিতে নারাজ বিজেপি।

পরীক্ষায় ফল অত্যন্ত খারাপ হয়েছিল। সেজন্য নতুন শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। তাঁর 'বকুনি'-তে তটস্থ ছাত্ররা। বকলেও শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন তিনি। কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, 'নিজেদের শুধরে নাও।' তবে সেখান থেকে একচুল এদিক-ওদিক হলে কখন যে 'স্যার'-এর কাছে বকা খেতে হয়, বলা যায় নাকি!

আরও পড়ুন :নারী দিবসে বিশেষ বার্তা মমতার, রাজ্যসভায় তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় দুই মহিলা

লোকসভা ভোটে পর্যদুস্ত হওয়ার পর গত তিন-চার মাস ধরে ঠিক এই কাজটাই করে চলেছেন 'স্যার' প্রশান্ত কিশোর। সাধারণ নির্বাচনে কোথায় কোথায় খামতি ছিল, তা খুঁজে বের করে দিয়েছেন ওষুধ। চলেছে 'শুধরে যাওয়ার পর্ব'। মূলত চারটি দিক ছিল। প্রথমত, বিধানসভা ভিত্তিক নজর বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, 'অপকর্ম' ও স্বেচ্ছাচারিতা রুখতে দলের নেতা ও কাঠামোর উপর নজরদারি চালানো। তৃতীয়ত, কেন্দ্রের সঙ্গে অকারণে সম্মুখসমরে না নামা ও চতুর্থত, সামাজিক-আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের আস্থা পুনরূদ্ধার করা।

আরও পড়ুন Bengal Government Retirement Age: যোগ্যদের আরও ২ বছর সরকারি চাকরিতে রাখা হোক, নির্দেশ মমতার:

'স্যার'-এর কড়া নজরদারি (ফাইল ছবি, সৌজন্য এএনআই)
'স্যার'-এর কড়া নজরদারি (ফাইল ছবি, সৌজন্য এএনআই)

লোকসভা ভোটের ফল থেকে স্পষ্ট, তফসিলি জাতি ও জনজাতি-সহ বিভিন্ন অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জাতির মধ্যে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছিল বিজেপি। বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু শরণার্থীদের মধ্যেও বেড়েছিল গ্রহণযোগ্যতা। লোকসভা ভোটের নিরিখে তফসিলি জাতি ও জনজাতিদের জন্য সংরক্ষিত ৮৪ টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৪৬ টি এগিয়ে ছিল বিজেপি। ৩৭ টিতে এগিয়ে ছিল তৃণমূল।

আরও পড়ুন : দিল্লির হিংসা থেকে নজর ঘোরাতে করোনা নিয়ে হুজুগে মেতেছে কেন্দ্র, দাবি মমতার

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের এক মন্ত্রী জানান, আরআরএস নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে যে কাজ করেছে, তার ফায়দা তুলেছিল বিজেপি। তা বুঝতে পেরে বিধানসভা ভিত্তিক বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন : নারী দিবসে বিশেষ বার্তা মমতার, রাজ্যসভায় তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় দুই মহিলা

তাই তৃণমূলের মৃতপ্রায় তফসিলি জাতি ও জনজাতি-সহ বিভিন্ন অন্যান্য পড়া জাতির জন্য গঠিত সেল গত তিন মাসে আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেছে। সেজন্য একাধিক কর্মসূচি নিয়েছে তৃণমূল। আগামী ১৪ এপ্রিল বি আর অম্বেডকরের জন্মবার্ষিকীতে দলিত মুখেদের সংবর্ধনার জন্য ২৭৭ টি বিধানসভার প্রায় আড়াই লাখ তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের জড়ো করা হবে। আগামী ১৯ এপ্রিল একই ধরনের একটি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে আদিবাসী-অধ্যুষিত বিধানসভাতেও। পাশাপাশি, একটি উদ্বাস্তু সেলও তৈরি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন : বিধানসভা ভোটের আগে নয়া অস্ত্র, 'বাংলার গর্ব মমতা' কর্মসূচি চালু তৃণমূলের

প্রশাসনিক তরফেও একাধিক পদক্ষেপ করেছে তৃণমূল সরকার। জাতির শংসাপত্র পাওয়ার নিয়ম সহজ করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দুদের জন্য উদ্বাস্তু কলোনির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্ত প্রবীণ নাগরিকদের জন্য মাসিক পেনশন দিচ্ছে সরকার। চা-বাগানের আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য বাড়ি প্রকল্পও চালু হয়েছে।

আরও পড়ুন :মালদায় সরকারি গণবিবাহের আসরে আদিবাসী নৃত্যের তালে পা মেলালেন মুখ্যমন্ত্রী

তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য, রাজ্যের পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজ্যের তফসিলি জাতির অন্তর্ভুক্ত ২৩.৫ শতাংশ। তফসিলি জনজাতি ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জাতির ক্ষেত্রে তা যথাক্রমে ৫.৮ ও ৭ শতাংশ। বর্ধমান পূর্বের এক সাংসদ বলেন, 'বাংলায় জাতি ভিত্তিক রাজনীতির কোনও অস্তিত্ব ছিল না। আমরাও বিভিন্ন জাতিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করার বিষয়টি অবহেলা করেছি। তবে গ্রাম পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত এখন এসসি, এসটি ও ওবিসিদের জন্য সেল খোলা হয়েছে।'

আরও পড়ুন : ‘কর্মসাথী’ প্রকল্পে এক লাখ নবীনকে ব্যবসায় অর্থ সাহায্য ঘোষণা মমতার

যদিও তৃণমূলের এই 'রেমেডিয়াল' পরীক্ষায় গুরুত্ব দিতে নারাজ বিজেপি। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেন, 'কিছু লোক দেখানো পদক্ষেপ করে উনি (মমতা) মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছেন। পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। তারা জানে, তৃণমূলের তোলাবাজির রাজত্ব ও অনুপ্রবেশকারীরা কী করেছে।'

আরও পড়ুন :গুলি মারো স্লোগানে আপত্তি নেই দিলীপের, দানবিক বললেন মমতা

তবে তৃণমূল যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা বলেছেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী। তিনি জানান, তৃণমূল এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ সামনে রেখেই লড়ে। কিন্তু এখন বিভিন্ন সম্প্রদায়কে পাশে পাওয়ার চেষ্টা করছে। যারা লোকসভা ভোটে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছিল। তাদের ঘাসফুল শিবিরে টানতেই একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে তৃণমূল।

আরও পড়ুন : শান্তির আহ্বানে একই সঙ্গে ৩টি ভাষায় কবিতা লিখে নজির গড়লেন মমতা

এমনকী দলের ভাবমূর্তিও স্বচ্ছ করতে কাটমানির তত্ত্ব খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো ভাসিয়ে দিয়েছিলেন বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। সঙ্গে যোগ হয়েছে পিকে 'স্যার'-এর ফোন। মাঝে তো রীতিমতো আতঙ্কে থাকতেন তৃণমূল নেতারা। এই বুঝি ফোন এল 'তাঁর'। সে রাত তিনটে হোক বা যখনই হোক, ফোনের আতঙ্কে ঘুম ছুটেছিল নেতা-কর্মীদের। তাতে যে কাজ হয়েছে, সেটা তো উপনির্বাচনে প্রমাণিতও হয়েছে। এমনকী হুগলির এক বিধায়ক তো বলেই ফেললেন, 'আমরা সবাই নজরদারিতে রয়েছি।'

আরও পড়ুন: রাজ্যের জন্য ৫০ হাজার কোটি চেয়ে মোদীকে চিঠি মমতার

যদিও তাতে কটাক্ষ ছুড়ে দিয়েছেন দিলীপ। তিনি বলেন, 'কে এই চোখে ধুলো দেওয়াটা বিশ্বাস করবে? সবাই নারদা স্টিং অপারেশন দেখেছিল। যেখানে সাংসদ ও মন্ত্রীর টাকা নিচ্ছিলেন।তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?'

আরও পড়ুন : রাজনীতির আগে দিল্লি সমস্যার সমাধান হোক, অমিতের সঙ্গে বৈঠকের পরে মমতার আর্জি

দিলীপের সঙ্গে অবশ্য একমত নন কলকাতায় সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মইদুল ইসলাম। তিনি জানান, তৃণমূলের 'শুধরে যাওয়ার পর্ব' রীতিমতো চোখে পড়ছে। মইদুলের কথায়, 'তৃণমূল এই ভাবমূর্তি তৈরি করতে চাইছে যে জনাদেশ থেকে শিক্ষা নিয়ে শিখছে তারা।'

আরও পড়ুন : ভুবনেশ্বরে মুখোমুখি অমিত শাহ ও মমতা, আলোচনায় যৌন হেনস্থা ও সীমান্তে গোরুপাচার

তৃণমূলের অন্দরের খবর, আগের মতো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করছেন না তিনি। অনেক বেশি মেপে আক্রমণে করছেন তিনি। সম্প্রতি একাধিক জনসভাতে মোদী-শাহকে আক্রমণ করলে নিজের সরকারের উন্নয়নের খতিয়ানও তুলে ধরেন তিনি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক উদয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে এমনভাবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছেন যিনি প্রশাসনিক কাজে রাজনীতি টেনে আনেন না। তবে তৃণমূলের বড় পরীক্ষা হল সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পুরসভা নির্বাচন করা। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে যে সন্ত্রাস ও হিংসা হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হলে গত কয়েক মাসে তিনি যে জমি পুনরূদ্ধার করেছে তা ফের সরে যাবে।'

আরও পড়ুন :করোনার আবহে কেন্দ্রকে সখ্যের বার্তা মমতার

অমিত শাহের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ফাইল ছবি, সৌজন্য পিটিআই)
অমিত শাহের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ফাইল ছবি, সৌজন্য পিটিআই)

আর ঠিক এখানেই কাজ করছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নাম গোপন রাখার শর্তে তৃণমূলের এক জেলা সভাপতি জানান, প্রশান্ত ও অভিষেক বৈঠকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন চায় দল। বাড়তি কয়েকটি ওয়ার্ড জেতার জন্য তৃণমূলের নাম খারাপ হবে ও রাজ্য হাতছাড়া হবে। তা মানা না হলে কড়া ব্যবস্থারও হুঁশিয়ারি রয়েছে। আর সেই ভয়েই তটস্থ তৃণমূলের একাংশ।

বন্ধ করুন