বাংলা নিউজ > বাংলার মুখ > অন্যান্য জেলা > লক্ষ্মীর ভাণ্ডার: নারী ক্ষমতায়ন নাকি বাড়তি ঋণের বোঝা?
নারী ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্প চালু করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার৷ (ছবিটি প্রতীকী, সৌজন্যে পিটিআই)

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার: নারী ক্ষমতায়ন নাকি বাড়তি ঋণের বোঝা?

  • জানুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাজার থেকে তিনবার ঋণ নিয়েছে৷

নারী ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্প চালু করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার৷ অথচ বিপুল ঋণের দায়ে ধুঁকছে রাজ্যের অর্থনীতি৷ তাই নগদ অর্থের বদলে অন্য জনমুখী প্রকল্প নেওয়া যেত কিনা, এ প্রশ্ন উঠেছে৷

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্পের সূচনা করেন৷ গত ২৩ জুলাই এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন তিনি৷

২০২১-২২ অর্থবর্ষে দুই কোটি নারীর অ্যাকাউন্টে মাসে মাসে টাকা পাঠানো হচ্ছে৷ তফসিলি জাতি-উপজাতির জন্য এক হাজার ও অনান্য নারীর ক্ষেত্রে মাসে ৫০০ টাকা দিচ্ছে রাজ্য সরকার৷ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত রাজ্য চার হাজার ৭৩ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে৷ আগামী মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ সাত হাজার কোটি টাকা৷ পরবর্তী অর্থবছর থেকে প্রয়োজন হবে ১২ হাজার কোটি টাকা৷

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত দেড় কোটি নারী এই প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করেছেন৷ তাঁদের হাতে নিয়মিত ও দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে টাকা পৌঁছে দেওয়ার মতো অবস্থা কি রাজ্যের কোষাগারের আছে?

জানুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাজার থেকে তিনবার ঋণ নিয়েছে৷ তিন দফায় এক হাজার, আড়াই হাজার ও তিন হাজার কোটি অর্থাৎ মোট সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে৷ তার আগের মাসে ডিসেম্বরে একই অঙ্কের টাকা দুই কিস্তিতে বাজার থেকে ঋণ নিয়েছিল৷ এমনিতে বামফ্রন্টকে সরিয়ে মহাকরণে প্রবেশের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরাধিকার সূত্রে ১.৯৩ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ হিসাবে পেয়েছেন৷ তাই পশ্চিমবঙ্গের কোষাগারের স্বাস্থ্য ভালো নয়৷ বৃহস্পতিবার কলকাতার প্রশাসনিক সভায় মুখ্যমন্ত্রী অর্থের অপচয় রোধ করার নির্দেশ দিয়েছেন আধিকারিকদের৷ একইসঙ্গে কেন্দ্রের দিকে আঙুল তুলেছেন তিনি৷ তাঁর দাবি, বিভিন্ন খাতে রাজ্যের ৯০ হাজার কোটি টাকা পাওনা৷ কেন্দ্র টাকা না মেটানোয় রাজ্যকে ঋণ নিতে হচ্ছে৷ ইয়াসের জেরে ক্ষতি হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকা৷ জিএসটির ক্ষতিপূরণ বাবদ টাকাও প্রাপ্য৷

এই পরিস্থিতিতে নগদ হস্তান্তরের বড় মাপের প্রকল্প হাতে নেওয়া কতটা সমীচীন, এই প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদদের একাংশ৷ যেমন - অর্থনীতিবিদ রতন খাসনবীশ মনে করেন, স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি না করতে পারলে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়৷ ‘মহিলাদের হাতে ৫০০ টাকা তুলে দেওয়ার বদলে তাদের পরিবারের একজন চাকরি পেলে মহিলার আর ওই টাকার দরকার পড়ত না৷ নিয়োগ হলেই প্রকৃত অর্থে মানুষ স্বাবলম্বী হবেন৷'

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেকে মানুষের হাতে সরাসরি টাকা দিয়ে তাদের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন৷ এ প্রসঙ্গে রতন খাসনবিশ বলেন, ‘‘মানুষের হাতে টাকা দিয়ে চাহিদা সৃষ্টি করে জিনিসের ক্রয় বাড়ানোর কথা অর্থনীতিবিদরা বলে থাকেন৷ কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে টাকা না দিয়ে রাস্তাঘাট তৈরি বা হাঁসমুরগী প্রতিপালন, স্বাস্থ্যপ্রকল্পে স্বাস্থ্যকর্মীদের টাকা দিলেও চাহিদা সৃষ্টি হবে৷ তারাও টাকা খরচ করবেন৷ কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার চালাতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গে অন্য দপ্তরের বাজেট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে৷''

অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বসু অবশ্য মনে করেন, মহিলাদের হাতে যে পরিমাণ অর্থ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে দেওয়া হয়, তা অপর্যাপ্ত৷ এতে যতটুকু ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি হয়, তা যথেষ্ট নয়৷ তিনি বলেন, ‘এই ধরনের অর্থ হস্তান্তর আসলে কেন্দ্রীয় সরকারের করা উচিত ছিল৷ রাজ্য সরকারের ক্ষমতা সীমিত৷ কেন্দ্র ও রাজ্য মিলে করলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও বাড়ানো যেত৷'

লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে কেবল আর্থিক প্রকল্প হিসেবে দেখতে রাজি নন অর্থনীতিবিদদের একাংশ৷ অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার বলেন, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে শুধু টাকা সাধারণ মানুষের হাতে যাচ্ছে তা নয়, নারী ক্ষমতায়নও হচ্ছে৷ গরিব দেশের নারী সমাজকে অর্থের সঙ্গে কিছুটা আত্মমর্যাদাও দেয়৷ তাই আমি একে সমর্থন করি৷'

(বিশেষ দ্রষ্টব্য : প্রতিবেদনটি ডয়চে ভেলে থেকে নেওয়া হয়েছে। সেই প্রতিবেদনই তুলে ধরা হয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমস বাংলার কোনও প্রতিনিধি এই প্রতিবেদন লেখেননি।)

বন্ধ করুন