বাংলা নিউজ > বাংলার মুখ > অন্যান্য জেলা > শহর থেকে গ্রামবাংলা মেতেছে কালীপুজোয়, কোথায়–কেমন পুজো হচ্ছে জানুন এক ক্লিক
নদিয়ায় চলছে কালীপুজোর প্রস্তুতি (ছবি সৌজন্য পিটিআই)
নদিয়ায় চলছে কালীপুজোর প্রস্তুতি (ছবি সৌজন্য পিটিআই)

শহর থেকে গ্রামবাংলা মেতেছে কালীপুজোয়, কোথায়–কেমন পুজো হচ্ছে জানুন এক ক্লিক

আজ কালীপুজো। তাই মায়ের পায়ে জবা দিতে চান আপামর বাঙালি।

আজ কালীপুজো। তাই মায়ের পায়ে জবা দিতে চান আপামর বাঙালি। ১০৮ জবা ফুলের মালার দাম পুজোর আগের দিনই উঠেছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। আজ তা ছাড়িয়ে গিয়েছে ২০০ টাকা। অথচ সেই সাইজের প্লাস্টিকের মালা বিকোচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকাতেই। ফলে পকেট বাঁচিয়ে ‘মা’-কে খুশি রাখতে ‘নকল’ জবাতেই ভরসা করছেন অনেকেই। হাওড়ার মল্লিকঘাট ফুলবাজারে ১,০০০ পিস জবা বিক্রি হয়েছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। খুচরো বাজারে ১০৮ জবার মালা দাম আজ ১৪০ টাকা ছাড়াবে বলেই জানাচ্ছেন ফুল বিক্রেতারা। তাছাড়া বেলপাতার মালা বিকোচ্ছে ৩০ টাকা প্রতি পিস। পদ্ম ৩০ টাকা প্রতি পিস। শনিবার মল্লিকঘাটে পাইকারি বাজারে গাঁদা ১০০ থেকে ১২০টাকা প্রতি কেজি, দোপাটি ১০০ থেকে ১১০ টাকা প্রতি কেজি, অপরাজিতা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি, রজনীগন্ধা ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তাই প্লাস্টিকের জবায় ভরসা রাখতে হচ্ছে।

এদিকে দীপান্বিতা অমাবস্যার দিন কড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে দক্ষিণেশ্বরে শুরু হয়েছে পুজো অর্চনা। দুরত্ববিধি মেনে, শরীরের তাপমাত্রা দেখে, স্যানিটাইজ গেটের মধ্যে দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করানো হচ্ছে দর্শনার্থীদের। পিপিই পরে রয়েছেন পুরোহিতরা। কারণ, প্রসাদ বিতরণের জন্য দর্শনার্থীদের কাছে যেতে হচ্ছে তাদের। এই বছর মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনও দর্শনার্থী ফুল, ধূপ–ধুনো নিয়ে গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে পারছেন না। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অন্যদিকে একান্ন পীঠের অন্যতম সতীপীঠ কঙ্কালীতলা সেজে উঠেছে উৎসবের আমেজে। পুরাণ অনুযায়ী সতীপীঠ কঙ্কালীতলায় মায়ের কাঁখ বা কাকাল পড়েছিল। মন্দিরের পাশেই রয়েছে সতীকুণ্ড। সেখানেই সবাই গিয়ে একে একে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলছে পুজো। কালীপুজো উপলক্ষ্যে বিশেষভাবে সেজে উঠেছে বীরভূমের কঙ্কালীতলা। করোনাভাইরাসের কারণে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। প্রত্যেক দর্শনার্থীদের মুখে মাস্ক বাধ্যতামূলক। সকলকে স্যানিটাইজার নিয়ে প্রবেশ করতে হচ্ছে।

তারাপীঠে সেজে উঠেছে বিগ্রহ। করোনা পরিস্থিতিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণে সতর্ক রয়েছে প্রশাসন থেকে মন্দির কর্তৃপক্ষ। ভক্তদের নিয়ে আসা ফুল, মালা স্যানিটাইজ করার পর তারপরই পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতিমার গলায়। সংক্রমণ যাতে কোনওভাবেই না ছড়িয়ে পড়ে, তাই সতর্কতার সঙ্গে মেনে চলা হচ্ছে সমস্ত করোনা বিধি। করোনা পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক মাস্ক। মুখে মাস্ক পরেই পুজো করছেন পুরোহিতরা। তারপর মা তারাকে ভোগ দেওয়ার জন্য মূল মন্দিরে ভোগ নিয়ে যান সেবায়েতরা।

আবার ৯৩৩০২১৬৩০৩ এই নম্বরে নিজের নাম, গোত্র হোয়াটসঅ্যাপ করলেই মিলবে আর্শীবাদ। সে ব্যবস্থাও করা হয়েছে। অনলাইনে ঈশ্বরের আশীর্বাদ পাওয়ার এমনই ব্যবস্থা রয়েছে কয়েকটি বিখ্যাত মন্দিরে। তবে শহরের কালীপুজোর ইতিহাসে এই প্রথম। শ্যামবর্ণা, স্বাস্থ্যবতী, মুক্তকেশী, দিগম্বরী, পীনপয়োধরা, শবরূপী মহাদেবের বুকের উপর দাঁড়িয়ে পাথুরিয়াঘাটা বড়কালীর আর্শীবাদ পৌঁছে যাবে দুবাই, আমেরিকা, গ্রিসেও। ১৯২৭ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী বাঘাযতীনের হাতে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল পাথুরিয়াঘাটা ব্যায়াম সমিতির। সেই থেকেই শুরু বড়কালীর কাঠামো পুজো। মুখে মুখে আজও তাই এটি পরিচিত বাঘাযতীনের কালী হিসেবেই। শোনা যায়, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর পা পড়েছিল এই চৌকাঠে। অগণিত ভক্তদের জন্য এবার নতুন পরিকল্পনা করেছেন ক্লাব সদস্যরা। পাথুরিয়াঘাটা ব্যায়াম সমিতির সাংস্কৃতিক সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, মায়ের পুজোর জন্য দুটি নম্বর চালু করা হয়েছে। ১৩ নভেম্বরের মধ্যে সেখানেই জমা পড়ে গিয়েছে নাম গোত্র। পুরোহিত পুজোয় বসে সে নাম গোত্র ধরে পুজো দেবেন। নিজের কানে শুনতে চান? তাহলে পাথুরিয়াঘাটা ব্যায়াম সমিতির ফেসবুক পেজে চোখ রাখতে পারেন।

পীঠমালা অনুসারে কালীঘাটে সতীর দক্ষিণ পদাঙ্গুলি পড়েছিল, তাই এটি পীঠস্থান হিসাবে চিহ্নিত। এখানকার দেবী কালী ও পীঠরক্ষক ভৈরব নকুলেশ্বর। সতীর প্রতি স্নেহবশত শিব লিঙ্গরূপ ধারণ করে কালীঘাটে নকুলেশ্বর নামে বিরাজ করছেন এবং ব্রহ্মা এখানে একটি কালীমূর্তি স্থাপন করেন। হিন্দুতীর্থের ৫১ টি পীঠস্থানের অন্যতম হল মহাতীর্থ কালীঘাট। পীঠস্থানগুলি শক্তিপূজার প্রধান স্থান। পীঠস্থান কেন?‌ পুরাণে তা বর্ণনা করা আছে। পূর্বকালে প্রজাপতি দক্ষ হিমালয়ের পাদদেশে সিদ্ধমহর্ষি পরিসেবিত পবিত্র হরিদ্বারে বৃহস্পতিসব নামে যজ্ঞের আয়োজন করেন এবং সেখানে ব্রহ্মর্ষি, দেবর্ষি ও দেবগণকে আমন্ত্রণ করেন। কিন্তু তাঁর নিজের জামাই শিবকে বিদ্বেষবশত আমন্ত্রণ করেননি। দক্ষকন্যা সতী পিতৃযজ্ঞ মহোৎসবের কথা শুনে পিতৃগৃহে যাওয়ার জন্য তাঁর পতি শিবের অনুমতি প্রার্থনা করেন। শিব অনুমতিও দেন।

সতী পিতৃগৃহে গিয়ে দেখলেন সেখানে রুদ্রের ভাগ নেই। দক্ষ তাঁর কন্যার সামনেই শিবনিন্দা করতে থাকেন। এতে সতী অপমানিত ও ক্রুদ্ধ হয়ে সেখানেই দেহ পরিত্যাগ করেন। এই সংবাদে মহাদেব ক্রুদ্ধ হয়ে দক্ষের যজ্ঞ পণ্ড করেন এবং সতীর মৃতদেহ নিজের স্কন্ধে নিয়ে উন্মত্তের মতো নৃত্য করতে করতে সমস্ত পৃথিবী পরিভ্রমণ করতে লাগলেন। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অবস্থা। শিবকে থামাতেই হবে। আসরে নামলেন বিষ্ণু। সতীর মৃতদেহ সুদর্শনচক্র দিয়ে খণ্ড করে ফেললেন। যে যে স্থানে সতীর অঙ্গ পড়ল, সেই সেই জায়গায় মহাদেব সতীস্নেহবশত স্বয়ং লিঙ্গরূপে উদ্ভূত হলেন। ব্রহ্মা সেই সব স্থানে শক্তির এক এক মূর্তি স্থাপন করলেন। সতীর অঙ্গ ৫১টি খণ্ড হয়েছিল, সুতরাং ৫১টি পীঠস্থান হল। কালীক্ষেত্র কালীঘাটে পড়েছিল সতীর দক্ষিণ পদের চারটি আঙুল। তাই কালীঘাট একচল্লিশতম সতীপীঠ। এখানেও সকাল থেকে ভিড় কম হয়নি। তবে সবটাই চলেছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে।

শহরের রাস্তা–ঘাট আলোক মালায় সেজে উঠেছে। মৌলালি, ধর্মতলা থেকে বাঘাযতীন, যাদবপুর, গড়িয়া, চেতলা সর্বত্র আলোর রোশনাই। শেওড়াফুলি–বৈদ্যবাটিতেও চলছে কালীপুজোর আমেজ। বারাসাতে এক এক জায়গায় এক এক রকমের কালী। এখানে বড় বড় থিমের কালীপুজো হচ্ছে। তবে এবার সেই আমেজ অনেকটা কমে গিয়েছে। কিন্তু আলোকসজ্জা আর মানুষের ঢল উৎসবের আমেজকে তুলে ধরছে। হাওড়া এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় উৎসবের আমেজ আছড়ে পড়েছে। শহর–শহরতলি থেকে গ্রাম বাংলায় এখন একটাই সুর, ‘‌আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন.............‌।

বন্ধ করুন