ফিরোজ মিনার, গৌড়, মালদহ
ফিরোজ মিনার, গৌড়, মালদহ

আপনি কি জানেন, এক সময়ে বাংলা শাসন করতেন আফ্রিকার রাজারা!

  • ক্ষমতাবান আফ্রিকান শাসকরা দক্ষিণ ভারতে ছিল সিদ্দি ও উত্তর ভারতে হাবসি |
  • আরবসাগরের ঢেউ বেয়ে বহু যুগ ধরেই আফ্রিকার সঙ্গে ব্যবসায়িক আদানপ্রদান ছিল ভারতের |

করোনার গ্রাসে যখন সারা বিশ্ব। তখন স্বাভাবিক ভাবেই দেশ-বিদেশের সংবাদ মাধ্যমে একটাই খবরের শিরোনাম, তাহল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। আর তার বিরুদ্ধে লড়ায়ে নেমে সারা দেশ এখন ঘরবন্দি। Lockdown-এর এই বাজারে তবে একটু অন্য সাদের খবর পড়তে ভালোই লাগবে আপনাদের। আপনি কি জানেন, এক সময়ে বাংলা শাসন করতেন আফ্রিকার রাজারা। না 'জয়বাবা ফেলুনাথ'-এর 'কিং অফ আর্ফিকা' নয়। বাস্তবের আর্ফিকার রাজারা। কিন্তু কী ভবাে। সেই প্রসঙ্গে আসার আগে বলেনি, রাজিয়া সুলতানা ছিলেন ভারতের অন্যতম বীরাঙ্গনা | তৎকালীন বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, তাঁর সঙ্গে জামালউদ্দিন ইয়াকুতের সম্পর্ক নিয়ে বহু কথা শোনা যেত অভিজাত মহলে | কে ছিলেন ইয়াকুত ? মধ্যযুগীয় দিল্লিতে তিনি ছিলেন এক চর্চিত নাম | সে সময় দিল্লি শাসন করত তুরস্কের অভিজাত রক্তরা | ইয়াকুত কিন্তু জন্মগত দিক দিয়ে অভিজাত বা তুর্কী, কোনওটাই ছিলেন না | তিনি ছিলেন আফ্রিকান ক্রীতদাস | সেই অবস্থা থেকে উন্নীত হয়ে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন আভিজাত্যের শিখরে | ফলে পেয়েছিলেন আমির-উল-উমারা উপাধি | তিনিই প্রথম আফ্রিকান যিনি ভারতীয় সমাজে এতটা গুরুত্ব লাভ করেছিলেন |

তারপরে অবশ্য আরও অনেক আফ্রিকান উজ্জ্বল হয়েছেন ভারতের ইতিহাসে | ইয়াকুত্‍ প্রথম আলোকবর্তিকা, তাতে সন্দেহ নেই | নানা রূপে আফ্রিকানরা ভারতে এসেছিলেন | ক্রীতদাস, ব্যবসায়ী, সৈন্য এবং জলদস্যু | অনেকেই নতুন রূপে ও পরিচয়ে মিশে গিয়েছিলেন ভারতীয় জনমানসে | সেনাপতি, অভিজাত ওমরাহ, রাজনীতিক-সহ নানা পরিচয় | এমনকী, নিজেদের রাজত্বও স্থাপন করে ফেলেছিলেন | যেমন মুঘলদের ত্রাস ছিলেন মালিক অম্বর | মহারাষ্ট্রের উপকূলীয় অংশে জঞ্জীরা দুর্গ ছিল আফ্রিকান শাসকের ঘাঁটি |

প্রসঙ্গত আমেরিকা ও ইউরোপে আর্ফিকান দাসদের নিয়ে গিয়ে কারখানার কাজে, বা অন্য কাজে লাগানো হত। কিন্তু ভারতে এই আর্ফিকান দাসজের অবস্থা ছিল অনেক উন্নত। অর্থাৎ মধ্যযুগেও ভারতের শাসকেরা যা ভাবতেন তা বিশ্বের অন্য দেশ ভাবতেও পারত না। তার আর্ফিকান দাশদের নিয়োগ করতেন সেনা বাহিনী ও রাজ্য পরিচালনার বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক কাজে। আর তেৃারই হাত ধরে বাংলায় আর্ফিকান দাসদের উত্থান।

হাবশি বংশের সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রা।(১৩৫২ সাল)
হাবশি বংশের সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রা।(১৩৫২ সাল)



ক্ষমতাবান আফ্রিকান শাসকরা দক্ষিণ ভারতে ছিল সিদ্দি ও উত্তর ভারতে হাবসি | আরবসাগরের ঢেউ বেয়ে বহু যুগ ধরেই আফ্রিকার সঙ্গে ব্যবসায়িক আদানপ্রদান ছিল ভারতের | কবে প্রথম ভারতে আফ্রিকানদের পা পড়েছিল, তা সঠিক জানা যায় না | প্রথম প্রমাণ আছে সপ্তম শতাব্দীর | যখন তারা ভারতে এসেছিল ক্রীতদাস হয়ে | আরব বণিকরাই বিক্রি করত তাদের | ইউরোপীয়ানরা আসার পরে দাস ব্যবসার হাল চলে গিয়েছিল তাদের হাতে | সবথেকে বড় মাইগ্রেশন হয় উনবিংশ শতাব্দীতে | যখন হায়্দ্রাবাদের নিজাম আফ্রিকান হাবসিদের নিয়োগ করেছিলেন ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর পদে |

বিশ্বের অন্যান্য দেশে আফ্রিকান ক্রীতদাসদের দিয়ে নিকৃষ্টতম কাজ করিয়ে নেওয়া হয়েছে | কিন্তু ভারতবর্ষে গুরুত্ব ও মূল্য দেওয়া হয়েছে তাদের সাহস ও দৈহিক শক্তির উপরে | সুলতান, মুঘল এবং হায়দ্রাবাদি নিজাম, সবার সেনাবাহিনীতে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে | বিংশ শতাব্দী অবধি এই নিয়োগ জারি ছিল | তবে পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দী ছিল ভারতে আফ্রিকানদের সোনালি সময় | বাংলা, গুজরাত ও দাক্ষিণাত্য রীতিমতো শাসন করেছে তারা |

বঙ্গদেশে চতুর্দশ শতাব্দী থেকেই বহাল ছিল সুলতানি শাসন | সেনাবাহিনীতে বহুলাংশে নিযুক্ত হয়েছিল আফ্রিকান যোদ্ধারা | সেখান থেকে তারা ধীরে ধেরে দেখা দিল প্রশাসনিক রূপে | তবে সবাইকে টেক্কা দিয়ে গেলেন একজন আবসিনিয়ান, বরবক শাহজাদা | তত্‍কালীন বাংলার শাসক জালালউদ্দিন ফতে শাহ-র সময়ে প্রাসাদের মূল রক্ষী ছিলেন তিনি | পরে সেনাবিদ্রোহ করে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন ক্ষমতা | বরবক হলেন বাংলার প্রথম আফ্রিকান শাসক | তিনি শুরু করেছিলেন হাবসি শাসক বংশ |

তবে এই শাসন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি | ১৪৯৩ তেই শেষ হয়ে যায় হাবসি বংশ | তবে এই বংশের শাসকরা ছিলেন উদার | অন্য ধর্মের বহু নিদর্শন বানিয়েছিলেন তাঁরা | মালদাতে গৌড়ে আছে ফিরোজ মিনারের মতো বহু নিদর্শন, যা নির্মিত হয়েছিল হাবসি রাজাদের আমলে | গুজরাতের সেনাবাহিনীতেও মূল স্তম্ভ ছিল আফ্রিকান হাবসিরা |

তর্কসাপেক্ষে ভারতের উজ্জ্বলতম আফ্রিকান বা হাবসি মালিক অম্বর | ষোড়শ শতাব্দীর মাঝে তাঁর জন্ম ইথিওপিয়ায় | ক্রীতদাস হয়ে হাতবদল হতে হতে মধ্যপ্রাচ্য, বাগদাদ হয়ে এসে পৌঁছেছিলেন ভারতে | সেখানেও বেশ কয়েবার ঠিকানা বদলে অবশেষে থিতু হন দাক্ষিণাত্যে | আহমদনগর সুলতানি বংশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি | গেরিলা যুদ্ধে পটু মালিক অম্বরের জন্য দাক্ষিণাত্য অধরা রয়ে গিয়েছিল মুঘলদের কাছে | মালিক অম্বরের মেয়েদের বিবাহ হয়েছিল সুলতানি বংশে |

আফ্রিকান শক্তির আর এক নিদর্শন হল মরাঠা উপকূলের জঞ্জিরা দুর্গ | জঞ্জিরা দ্বীপ অধিকার এই দুর্গ বানিয়েছিলেন মালিক অম্বর | মরাঠা বা মুঘল কেউ দখল করতে পারেনি | ব্যর্থ হয়েছিল ব্রিটিশরাও | ভারতের স্বাধীনতা লাভ অবধি এই দুর্গ থেকে সিদ্দিরা ছোট্ট এলাকা শাসন করে গিয়েছিল | গুজরাত, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, গোয়া, হায়দ্রাবাদে খুব সামান্য হলেও এখনও সিদ্দিরা আছেন |

তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আফ্রিকানরা ভারতীয়দের বিয়ে করে মিশে গেছেন জনজীবনের মূলস্রোতে | বর্তমানে ভারতে প্রায় ৫০ হাজার আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আছেন | তবে তাঁরা এখন পোশাক-আচার-আচরণে এতটাই ভারতীয়, যে চেহারায় কিছু বৈশিষ্ট্য ছাড়া বোঝার উপায় নেই যে এঁদের পূর্বপুরুষরা কয়েকশো বছর আগে আফ্রিকা থেকে ভারতে এসেছিলেন |

বন্ধ করুন