বাংলা নিউজ > বাংলার মুখ > কলকাতা > কালীঘাটে ছেঁড়া নোটের স্তূপ কোথা থেকে এল? রিকশাচালককে জিজ্ঞাসাবাদেই রহস্যভেদ!
সেই ছেঁড়া নোট। (ছবি সৌজন্য সংগৃহীত)
সেই ছেঁড়া নোট। (ছবি সৌজন্য সংগৃহীত)

কালীঘাটে ছেঁড়া নোটের স্তূপ কোথা থেকে এল? রিকশাচালককে জিজ্ঞাসাবাদেই রহস্যভেদ!

ছেঁড়া নোটের সেই প্যাকেট ভুলবশত ফেলে যাওয়া হয়েছিল কালীঘাটে, গঙ্গার ধারে। নোট রহস্যের তদন্তে নেমে এই তথ্য পেল পুলিশ।

ঈশ্বরকে নিবেদন করা অর্থ ফিরে গেল ‘ঈশ্বরের’ কাছেই। বিলীন হয়ে গেল পঞ্চভূতে। জৈন মন্দিরের প্রণামীর নষ্ট হয়ে যাওয়া কয়েক হাজার টাকার নোট বস্তাবন্দি করে রিজার্ভ ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার জন্য রাখা হয়েছিল। ছেঁড়া নোটের সেই প্যাকেট ভুলবশত ফেলে যাওয়া হয়েছিল কালীঘাটে, গঙ্গার ধারে। নোট রহস্যের তদন্তে নেমে এই তথ্য পেল পুলিশ।

আর ভুল করে ফুলের সঙ্গে সেই নষ্ট হয়ে যাওয়া টাকার বস্তাও মন্দিরের এক কর্মী তুলে দেন বাঁধাধরা রিকশাচালকের হাতে। রাজেন্দ্র সাউ নামে ওই বিশ্বস্ত রিকশাচালক আদিগঙ্গার ঘাটে ফুলের সঙ্গে হেলায় বিসর্জন দেন সেই খাজানা। খরখরে শুকনো নোটে কেউ জ্বলন্ত ধূপ অথবা সিগারেট ফেলতেই আগুন। বেশিরভাগ নোট আধপোড়া হয়ে যায়। লালবাজার সূত্রে খবর, ভবানীপুরের পদ্মপুকুর এলাকার একটি মন্দিরে গত কয়েক মাসে যে প্রণামী জমা পড়েছিল, তার মধ্যে থাকা অচল নোটগুলি আলাদা করে রাখা ছিল একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে। সেই ক্যারিব্যাগ রাখা ছিল মন্দিরের বর্জ্য ফুলের বস্তার পাশে। মন্দিরের এক কর্মী ফুলের বস্তার সঙ্গে নোটের ব্যাগটিও তুলে এনে কালীঘাটের মুখার্জি ঘাটে ফেলে দেন।

রবিবার দুপুরে ওই ঘাটে আধপোড়া ছেঁড়া নোটের প্যাকেটটি দেখতে পান এলাকার বাসিন্দারা। ভেতরে ছিল ৫, ১০, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার সব নোট। খবর পেয়ে আসেন কালীঘাট থানার অফিসাররা। তাঁরা নোটগুলি বাজেয়াপ্ত করেন। অক্ষত নোট খোঁজার জন্য মানুষের ঢল নেমেছিল। ঘটনাস্থলে কালীঘাট থানার পুলিশ গিয়ে নোটগুলি উদ্ধার করে। রহস্য উন্মোচন হয় পুলিশ রিকশাচালকের সন্ধান পাওয়ার পর। মুখার্জি ঘাটের গায়েই রাধাকৃষ্ণের মন্দির। সেখানকার পূজারি গোপাল মিশ্র জানান, ভবানীপুরের হেশ্যাম রোডের একটি জৈন মন্দিরের রিকশাচালক গত ২০ বছর ধরেই দিনে দু’বার করে এই ঘাটে এসে বাসি ফুল ও জল গঙ্গায় বিসর্জন দেন।

সূত্রের খবর, সিসিটিভির ফুটেজে ওই রিকশা চালককে দেখে তাঁর সন্ধান পায় পুলিশ। রবিবার রাতে তাঁকে নিয়ে পুলিশ মুখার্জি ঘাটে যায়। তিনি পুলিশ আধিকারিকদের দেখান, কীভাবে ঈশ্বরকে নিবেদন করা ফুল ও টাকা তিনি গঙ্গার ঘাটে ফেলেছেন। সোমবার ওই ব্যক্তি এবং মন্দিরের পুরোহিতের সঙ্গে কথা বলতেই পুলিশের কাছে গোটা বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রণামীর বাক্সের ছেঁড়া–ফাটা নোটগুলি আলাদা করে বড় একটি প্লাস্টিকে ভরে বর্জ্য ফুলের বস্তার পাশে রাখা হয়েছিল। আমফানে নষ্ট হওয়া কিছু নোটও তাতে ছিল। পরে ব্যাঙ্ক থেকে সেগুলি বদলে আনা হবে বলে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু মন্দিরের ওই কর্মী ভেবেছিলেন, টাকার প্যাকেটেও বর্জ্য ফুল রাখা আছে। তাই সেটি গঙ্গার ঘাটে ফেলে যান তিনি।

হেশ্যাম রোডের ‘শ্রী ভবানীপুর মূর্তিপূজক জৈন শ্বেতাম্বর সংঘ’-র অফিসের আধিকারিক পঙ্কজ দোশির কাছে কালীঘাট থানা থেকে ফোন আসে। তাঁর কাছ থেকে টাকা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। সোমবার পঙ্কজবাবু জানান, এই জৈন মন্দিরে পার্শ্বনাথ ও অন্য তীর্থঙ্করদের মূর্তি প্রচুর ফুল দিয়ে পুজো করা হয়। পুজোর সময় মূর্তি স্নান করানো হয়। স্নানের জল ও পুজোর ফুল ফেলা হয় আদিগঙ্গায়। মন্দিরের একতলা ও দোতলায় রয়েছে আলাদা প্রণামীর বাক্স। ভক্তরা এসে টাকা ফেলেন প্রণামীর বাক্সে। দুটি বাক্সেই জমছিল টাকা। তদন্তকারীরা জানান, ওই ঘাটে অনেকেই আড্ডা মারেন, ধূমপান করেন। তাঁদের ফেলে দেওয়া সিগারেটের আগুন থেকেই হয়তো ওই টাকার বস্তায় আগুন লেগে সেগুলির কিছুটা অংশ পুড়ে যায়।

উল্লেখ্য, করোনা আবহে লকডাউনে গত মার্চ মাস থেকে বন্ধ হয়ে যায় মন্দির। তখন মাত্র তিনজন কর্মী ছিলেন মন্দিরে। গত মে মাসে আসে আমফান। প্রচণ্ড ঝড় ও জলের ঝাপটায় নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েন সবাই। প্রণামীর বাক্সsর দিকে নজর ছিল না কারও। তার মধ্যেই রাস্তার জমা জল ঢুকতে শুরু করে মন্দিরের ভেতরে। ভিজে চুপচুপে প্রণামীর বাক্স। ক্রমে তা শুকিয়েও যায়। আরও টাকা জমতে শুরু করে বাক্স দু’টিতে। ট্রাস্টির সদস্যরা বাক্স দু’টি খোলার পরই তাঁদের চক্ষু চড়কগাছে। বাক্সগুলির উপরের দিকের টাকাগুলি ভালa অবস্থায় থাকলেও নষ্ট হয়ে গিয়েছে নিচের দিকে রাখা প্রণামীর টাকা। বাছাই করে ‘নষ্ট’ হয়ে যাওয়া নোটগুলি আলাদা করে ফেলে একটি বস্তায় রাখা হয়।

বন্ধ করুন