বাড়ি > বাংলার মুখ > কলকাতা > চাকুলিয়ার বাম বিধায়কের দাবি উড়িয়ে দিল আই–প্যাক, ভিডিও ফুটেজ–রসিদের তরজা তুঙ্গে!
প্রশান্ত কিশোর। ফাইল ছবি
প্রশান্ত কিশোর। ফাইল ছবি

চাকুলিয়ার বাম বিধায়কের দাবি উড়িয়ে দিল আই–প্যাক, ভিডিও ফুটেজ–রসিদের তরজা তুঙ্গে!

  • বাম বিধায়ক ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে নিরুত্তর ছিলেন। তিনি স্বীকারও করেন যে সেদিনের বিল প্রশান্ত কিশোরই মিটিয়েছেন।

২০১৯–এর লোকসভা নির্বাচনে ৪২টি আসনের মধ্যে বিজেপি দখল করে ১৮টি, প্রাপ্য ৩৪টির জায়গায় মাত্র ২২টি আসন পায় তৃণমূল। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে বুঝতে পেরে সংগঠন আরও শক্ত করার তাগিদে বিশেষ পদক্ষেপ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বঙ্গ রাজনীতিতে আগমন ঘটে প্রশান্ত কিশোর ও তাঁর কোম্পানি আই–প্যাকের। আর তার পর থেকেই এই রাজনৈতিক জনসংযোগ সংস্থার বিরুদ্ধে প্রলোভন দেখানোর অভিযোগ উঠতে থাকে।

ইতিমধ্যে বহু সিপিএম নেতা, বিধায়ককে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিতে লোভনীয় ‘অফার’ দিয়েছে আই–প্যাক। কিছু ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। মুদ্রার এপিঠের গল্প প্রাক্তন তথ্য–প্রযুক্তি মন্ত্রী দেবেশ দাস, বাম বিধায়ক লক্ষ্মীকান্ত রাও বা মমতা রায়ের মুখে আমরা জেনেছিও। কিন্তু এবার সামনে এল মুদ্রার অপরপিঠের গল্প।

প্রশান্ত কিশোর খোদ এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন— এমনই দাবি করেছিলেন উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়ার বাম বিধায়ক আলি ইমরান রামজ ওরফে ভিক্টর। তাঁর দাবি, ইএম বাইপাসের ধারে এক হোটেলে এসে পরবর্তী সরকারে ইমরানের পাকা মন্ত্রিত্ব পাইয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন পিকে।

ফরওয়ার্ড ব্লকের যুবনেতা ও পরপর ২ বারের বিধায়ক ইমরান জানান, জুলাইয়ের ১৭ তারিখ সস্ত্রীক ওই হোটেলে নৈশভোজ সারতে যান তিনি। সেখানেই প্রশান্ত কিশোর তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। ইমরানের দাবি, ‘আমার কথা বিশ্বাস না হলে ওই হোটেলের সিসি টিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখতে পারেন। সেদিন রাত ১০টা–১১টা নাগাদ আমাদের সঙ্গে চা খেয়েছিলেন প্রশান্ত কিশোর।’

কিন্তু এ কথা যে একেবারেই মিথ্যে— তা পরিষ্কার জানালেন আই–প্যাকের ওই আধিকারিক। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইমরান প্রায়ই বলতেন যে তাঁর স্ত্রী প্রশান্ত কিশোরের ভক্ত। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছেও প্রকাশ করেন ওই দম্পতি। বছরখানেক আগে প্রশান্ত কিশোর যখন পশ্চিমবঙ্গে প্রথম কাজ শুরু করেন তখন থেকে বাইপাসের ওই হোটেলেই থাকেন তিনি। তা ছাড়া সাধারণ বিধায়কদের সঙ্গে সচরাচর তিনি দেখাও করেন না। ইমরান তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলেন বলেই সৌজন্যের খাতিরে তাঁদের সঙ্গে দেখা করেন প্রশান্ত কিশোর।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আই–প্যাকের ওই আধিকারিক জানান, ‘ওই দম্পতি পিকে–র পরামর্শ মন দিয়ে শোনেন। ইমরান তাঁকে জানান যে ফরওয়ার্ড ব্লকে তাঁর কোনও ভবিষ্যত নেই।’ আই–প্যাক আধিকারিকের মতে, ‘ওই হোটেলে স্ত্রীর সঙ্গে ইমরানের নৈশভোজ করার কথাটিও ভিত্তিহীন। কারণ, প্রশান্ত কিশোর তাঁদের খাবার খাওয়ার প্রস্তাব দিলেও তাঁরা তাঁকে জানান যে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে খাওয়া–দাওয়া সেরে এসেছেন। তাই পিকে তাঁদের চা খাওয়ার কথা বলেন। ওই দম্পতি চা, কফি খেলে তার বিলও মেটান প্রশান্ত কিশোর। সেই রসিদও আমাদের কাছে আছে।’

এদিকে, বাম বিধায়ক ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে নিরুত্তর ছিলেন। তিনি স্বীকারও করেন যে সেদিনের বিল প্রশান্ত কিশোরই মিটিয়েছেন। ইমরানের দাবি, ‘আমি জানতামও না যে ওই হোটেলেই প্রশান্ত কিশোর ছিলেন। তবে এটা ঠিক যে আমি তাঁর সঙ্গে নিজে থেকে সাক্ষাতের আগ্রহ দেখাইনি। এমনকী আমার স্ত্রী তো তাঁকে চিনতেনই না।’

যদিও এ ব্যাপারে তৃণমূল নেতা ও রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী সুব্রত মুখার্জি বাম শিবিরের নাম না করে কটাক্ষ করে বলেন, ‘ভোটে হারার পর ওদের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।’

এদিকে, বাম জমানার প্রাক্তন তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী, ৫ শীর্ষস্থানীয় বাম নেতা এবং একজন বর্তমান বাম বিধায়ক ‘হিন্দুস্তান টাইমস’–কে জানিয়েছেন যে অগস্ট মাসে পিকে–র দল থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁদের দাবি, শাসকদল তৃণমূলে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁদের লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়। যদিও সেই প্রস্তাব সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করেছেন বলে দাবি করেছেন তাঁরা। ওই বাম নেতামন্ত্রী আরও জানান, আই–প্যাকের ওই প্রতিনিধিরা তাঁদের সঙ্গে হিন্দি আর ইংরেজিতে কথা বলেছেন। আর তাঁরা প্রত্যেকেই হয়তো উত্তরপ্রদেশ, বিহার বা অন্ধ্রপ্রদেশের বাসিন্দা।

প্রাক্তন তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক দেবেশ দাস বলেন, ‘‌৪ অগস্ট আমার কাছে আই–প্যাকের তরফ থেকে একটি ফোন আসে। তবে কথা এগনোর আগেই আমি তাঁদের পরিষ্কার জানিয়ে দই যে আমি কোনও ব্যাপারেই আগ্রহী নই আর ফোনটা কেটে দিই।’ পিকে–র টিমের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ এনেছেন জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ির প্রাক্তন বাম বিধায়ক লক্ষ্মীকান্ত রাও ও মমতা রায়। তাঁদের দাবি, তৃণমূলে যোগ দান করার জন্য তাঁদের বিপুল পরিমাণ টাকা ‘‌অফার’‌ করা হয়।

মমতা রায় বলেন, ‘‌৯ অগস্ট একজন আমার বাড়িতে এসে বাড়ির চারিদিকে দেখতে থাকেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, এত ছোট ঘরে আমি থাকি কীভাবে, কেন আমার কোনও গাড়ি নেই— এ সব। তিনি জানান, তৃণমূলে যোগ দিলে টাকাপয়সার কোনও অভাব হবে না, যা প্রয়োজন সব পাওয়া যাবে। আমি তখন তাঁকে পরিষ্কার জানিয়ে দিই যে কমিউনিস্টদের কেনা যায় না এবং তাঁকে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে যেতে বলি।’ একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয় লক্ষ্মীকান্ত রায়ের। তিনি বলেন, ‘আমি ওই লোকটিকে বলেছিলাম যে কমিউনিস্টরা তাঁদের মতাদর্শ থেকে বিচ্যুত হয় না এবং আমি আমার জীবন নিয়ে খুবই খুশি।’‌‌

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হরিরামপুরের সিপিএম বিধায়ক রফিকুল ইসলাম বলছিলেন, ‘‌আমাকে কলকাতায় প্রশান্ত কিশোরের অফিসে যাওয়ার জন্য অনেকবার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু আমি তাঁদের জানাই যে আমার বয়স এখন ৬৭ বছর এবং একজন মানুষ এই বয়সে তাঁর আদর্শ ত্যাগ করেন না।’‌‌

নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভার প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক আইনজীবী সুবিনয় ঘোষ জানান, হায়দরাবাদ থেকে একজন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে রীতিমতো আদালতে চত্বরে পৌঁছে যান। সুবিনয়বাবু ওই অপরিচিত ব্যক্তিকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে তিনি কাউন্সিলর ও বিধায়ক হয়ে সাধারণ মানুষের সেবা করেছেন, এর থেকে বেশি এ জীবনে তাঁর আর কিছু চাওয়ার বা পাওয়ার নেই।‌’‌

‘‌হিন্দুস্তান টাইমস’‌‌–এর তরফ থেকে আই–প্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের এক শীর্ষ ব্যক্তিত্ব স্বীকার করেন যে তাদের বিভিন্ন প্রতিনিধি দল সমীক্ষা চালিয়ে বাম শিবিরের হাতেগোনা কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করছে। নিজের পরিচয় গোপন রেখে আই–প্যাকের ওই আধিকারিক বলেন, ‘এটা পরিষ্কার যে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ২ বিরোধী দল হল তৃণমূল ও বিজেপি। এই দু’কেন্দ্রীক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাম শিবিরের কোনও জায়গা আপাতত নই। তাই আমরা যে সব বাম নেতা মানুষের সেবা করতে চান তাঁদের তৃণমূলে যোগদান করার প্রস্তাব দিচ্ছি। যদিও সিদ্ধান্তটা পুরোপুরি তাঁদের হাতে।’

বন্ধ করুন