বাংলা নিউজ > বাংলার মুখ > কলকাতা > ইস্তফার হিড়িক, তৃণমূলের রাস্তাতেই তৃণমূলকে কাত করছে গেরুয়া শিবির
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

ইস্তফার হিড়িক, তৃণমূলের রাস্তাতেই তৃণমূলকে কাত করছে গেরুয়া শিবির

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।

তৃণমূলের রাস্তাতেই তৃণমূলকে কাত করছে গেরুয়া শিবির। আপাতত সেরকমই চিত্র দেখা যাচ্ছে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে। সেটা হল—‘‌দল ভাঙানো’‌। ভাঙন তীব্র হয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। প্রথম ধাক্কাটি ছিল মমতার আন্দোলনের প্রথম দিনের সঙ্গী ও তৃণমূলের একসময়ের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড মুকুল রায়ের দল ছাড়াকে কেন্দ্র করে। এখন যতদিন যাচ্ছে তত এই ভাঙন বড় আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

এটা যে বিজেপি করছে তা নিজের মুখেই বলেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জনসভার মঞ্চ থেকে তিনি বলেন, ‘‌দলের বর্ষীয়ান নেতাদের ফোন করা হচ্ছে বিজেপি’‌র পক্ষ থেকে। দিল্লি থেকে ফোন আসছে। দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি এবং বীরভূমের জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলকে ফোন করা হয়েছিল। বিজেপি নেতারা দিল্লি থেকে ফোন করে বৈঠক করতে চাইছে। ভাবুন কি সাহস!‌ তাঁরা ন্যূনতম সৌজন্য জানে না। এভাবেই তাঁরা দল ভাঙাতে চাইছে।’‌

মুকুল রায় থেকে শুরু। বর্তমানে শুভেন্দু। একের পর এক রাজনীতিতে পরিচিত মুখ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের সঙ্গী ছেড়ে চলেছেন। ২০১৪ সালের পর থেকেই মোটামুটি ভাঙন ধরেছে। এমনকী গত ৬–৭ বছরে তৃণমূল ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন ঘাসফুলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুখ। সৌমিত্র খান, অনুপম হাজরা থেকে মিহির গোস্বামী কেউ বাদ যাননি। সবাই গিয়েছেন বিজেপিতে। দিদির লড়াকু সৈনিক শুভেন্দুও দল ছেড়ে দিল্লি পাড়ি দিয়েছেন। এখন বিজেপিতে যোগ দেওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।

মুকুল রায় ১৯৯৭ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্নে নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। তারপর মমতা–ব্রিগেডের দ্বিতীয় মুখ হয়ে ওঠেন। তৃণমূল কংগ্রেস–মুকুল রায় ছিল সমার্থক। ২০১৭ সাল থেকেই তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করেন মুকুল। তৃণমূল–মুকুল সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতা হয় ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তৃণমূল ছেড়ে বিজেপি যোগ দেন মুকুল রায়। শোভন চট্টোপাধ্যায় হলেন মমতার স্নেহের কানন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সব আন্দোলনের সঙ্গী অত্যন্ত আস্থাভাজন। ২০১৯ সালে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভনের সঙ্গে বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক ঘিরে শোভনের ব্যক্তিগত জীবনে নানা অশান্তি তৈরি হয়। শোভনের সাংসারিক অশান্তি দলীয় কাজেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলীয় বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শোভন নিয়ে। সেই বছরেই মমতার সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে শুরু করেন শোভন। তৃণমূলের সঙ্গেও। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শোভন।

এই বিষয়ে মুকুল রায় বলেন, ‘‌কোনও নীতি, আদর্শ ও মূল্য ছাড়া একটা রাজনৈতিক দল বেঁচে থাকতে পারে না। জন্ম নিতেই পারে কিন্তু বেশিদিন টেকে না। তৃণমূল ক্ষমতকায় এসেছিল সিপিএম–কংগ্রেসের বিরোধিতা করে। এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী–স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে গালিগালাজ করছে। আর বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক দল বলে তকমা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আসলে তাদের কোনও কাজ নেই। তাই তৃণমূল শেষ হয়ে যাচ্ছে, কোনও রাজনৈতিক নেতা সেখানে থাকতে চাইছে না।’‌ উল্লেখ্য, তৃণমূলে জননেতার তালিকা করলে, মমতার পরেই নাম ছিল শুভেন্দু অধিকারীর। কাঁথির অধিকারী পরিবারের সঙ্গে মমতা বা তৃণমূলের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। সেই শুভেন্দু অধিকারীও তৃণমূলে কোণঠাসা হওয়ার অভিযোগ জানাতে শুরু করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে শুভেন্দুর তিক্ত সম্পর্কের জেরে শুভেন্দুর দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূল কংগ্রেস থেকে দূরত্ব বজায় রাখার প্রক্রিয়া শুরু করেন। শুভেন্দু–তৃণমূল সম্পর্ক আরও তলানিতে যায়, বিধানসভায় প্রশান্ত কিশোরকে ভোটকুশলীর দায়িত্ব দেওয়ার পরে। এখন বিজেপিতে শুভেন্দু অধিকারীর যোগ স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।

লোকসভায় কংগ্রেসের বিরোধী দলনেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী বলেন, ‘‌তৃণমূল দলটা তৈরিই হয়েছিল অন্য দলে ভাঙন ধরিয়ে। তাই এখন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। মিথ্যে মামলার ভয় দেখিয়ে কংগ্রেসের নেতাদের দলে যোগ দেওয়ানো হয়েছিল। তাই এখন তাঁর কয়েনই তাঁকে ফেরত পেতে হচ্ছে।’‌ মানস ভুঁইয়া, অজয় দে, কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী, হুমায়ুন কবীরকে কংগ্রেস থেকে ভাঙানো হয়েছিল। আর বামফ্রন্ট থেকে ছায়া দোলুই, অনন্তদেব অধিকারী, দশরথ তিরকে, সুনীল মণ্ডলকে যোগ দেওয়ানো হয়েছিল। ২০১৯ সালের মার্চে ঠিক লোকসভা ভোটের আগে ভাটপাড়ার দোর্দণ্ডপ্রতাপ তৃণমূল বিধায়ক অর্জুন সিং যোগ দেন বিজেপিতে। মুকুল রায় ও কৈলাস বিজয়বর্গীয়র হাত ধরে গেরুয়া পতাকা তুলে নেন। ব্যারাকপুরে লোকসভায় তৃণমূলের প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন অর্জুন। কিন্তু ওই কেন্দ্রে দীনেশ ত্রিবেদীর উপরই আস্থা রাখেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলনেত্রীর এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে বিজেপিতে যোগ দেন এবং দীনেশ ত্রিবেদীকে পরাজিত করেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময় ঘনিষ্ঠ মহলেই ঘোরাফেরা করতেন সব্যসাচী দত্ত। রাজারহাট–নিউটাউনের তৃণমূল বিধায়ক ছিলেন। বিধাননগরের মেয়রও ছিলেন। ২০১৯ সালের শুরু থেকেই তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু হয় সব্যসাচীর। সব্যসাচী ইস্তফা দেন মেয়রের পদে। ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে যোগ দেন বিজেপিতে। ব্যারাকপুরের তৃণমূল বিধায়ক শীলভদ্র দত্ত প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানান ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোরের বিরুদ্ধে। নভেম্বর মাসের শুরুতেই মুখ খোলেন তিনি। বলেন, ‘‌একটা বাজারি কোম্পানি এখন এখানে টাকা নিয়ে ভোট করাতে এসেছে। তারা আমাকে বলছে আপনাকে ভোট নিয়ে কিছু ভাবতে হবে না। ভোট আমরাই করাব। ৯–১০ বছর বয়স থেকে রাজনীতি করছি, আর আমাকে এখন রাজনীতির জ্ঞান দিচ্ছে।’‌ আজ তৃণমূল ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। বিজেপিতে যোগ দেওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।

এমনকী তৃণমূল ছেড়ে দিয়েছেন পাণ্ডবেশ্বরের বিধায়ক জিতেন্দ্র তিওয়ারী। সুতরাং এভাবে যদি একের পর এক বিধায়ক তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন তাহলে এই সরকার সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে। এমনকী আস্থাভোট ডাকতে পারে রাজ্যপাল এই পরিস্থিতি চললে। তখন  জাদু সংখ্যা প্রমাণ করতে না পারলে সরকার পড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। যদিও রাজ্যের দুই মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় ও চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য তা মনে করেন না। সুব্রতবাবু বলেন, ‘‌দু–দশজন বিধায়ক গেলে তৃণমূলের কিছু যায় আসে না।’‌ চন্দ্রিমা বলেন, ‘‌যাঁরা নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন তাঁরাই এইসব ভিত্তিহীন কথাবার্তা বলছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, করে যাবেন। দলবদলে তৃণমূলে কোনও প্রভাব পড়বে না।’‌

 

বন্ধ করুন