বাংলা নিউজ > ভোটযুদ্ধ ২০২১ > পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন 2021 > রাত পোহালেই প্রথম দফার নির্বাচন, জঙ্গলমহলের ওপর সবার নজর
(ফাইল ছবি, সৌজন্য পিটিআই)
(ফাইল ছবি, সৌজন্য পিটিআই)

রাত পোহালেই প্রথম দফার নির্বাচন, জঙ্গলমহলের ওপর সবার নজর

  • রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী, একদিকে যেমন লোকসভা নির্বাচনে পাওয়া জনসমর্থন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ বিজেপির সামনে, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের হারানো জমি পুনরুদ্ধার করার লড়াই৷

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই রাজ্যে বিজেপির উত্থান হয়েছিল দ্রুত গতির সঙ্গে৷ ১৮টি লোকসভা আসন জিতে নিয়েছিল বিজেপি৷ জঙ্গলমহলের পাশাপাশি দুর্দান্ত ফল হয়েছিল উত্তরবঙ্গেও৷ সেই জঙ্গলমহল থেকেই শনিবার বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শুরু হচ্ছে৷ রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী, একদিকে যেমন লোকসভা নির্বাচনে পাওয়া জনসমর্থন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ বিজেপির সামনে, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের হারানো জমি পুনরুদ্ধার করার লড়াই৷

শনিবার, ২৭ মার্চ রাজ্যের পাঁচটি জেলা পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম এবং পূর্ব মেদিনীপুরে অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদিও তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরা নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। তাঁর দাবি, বাম–কংগ্রেসের ভোট ভাঙিয়েই রাজ্যে ভোটবাক্স ভরাতে সক্ষম হয়েছিল বিজেপি। তাই তাঁদের ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু কয়েক বছর আগে পর্যন্ত বাংলার রাজনীতিতে যাদের কোনও অস্তিত্বই ছিল না, সেই গেরুয়া শিবিরই নবান্ন দখলের লড়াইয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের থেকে তিন বছরে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ভোট বেড়েছিল ৩৮ শতাংশ।

প্রথম দফায় পাঁচ জেলার ৩০টি আসনে নির্বাচন৷ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল নিরিখে এর মধ্যে ১০টি আসনে এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷ আর বিজেপি এগিয়ে ছিল বাকি ২০টি আসনে৷ সেভাবে কোনও ছাপই ফেলতে পারেনি বাম–কংগ্রেস৷  ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যে প্রধান বিরোধীদল হয়ে ওঠাই লক্ষ্য ছিল বিজেপির। কিন্তু খড়্গপুর সদর, মাদারিহাট এবং বৈষ্ণবনগর— বিধানসভায় মাত্র তিনটি আসন পেয়েছিল তারা। তারপর ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ১৮টি আসনে জয়লাভ করে বিজেপি। এবার দেখে নেওয়া যাক চুলচেরা বিশ্লেষণে অবস্থান—

পূর্ব মেদিনীপুর–২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসে৷ পূর্ব মেদিনীপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের ফলও হয়েছিল যথেষ্ট ভাল৷ লোকসভা ভোটের নিরিখে ১৬টি বিধানসভার মধ্যে ১৪টিতে এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷ শনিবার এই জেলার যে সাতটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে, তার মধ্যে ৬টিতেই এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷ একটিতে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷ এখন শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে। ফলে সমীকরণ পাল্টেছে।

কাঁথি উত্তর—অধিকারী পরিবারের গড় হিসাবেই পরিচিত কাঁথি। এই কেন্দ্রে লোকসভা নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ১৩,০৭৪ ভোটে এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷

কাঁথি দক্ষিণ—এই কেন্দ্র থেকেও তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে ছিল ১৯,০১৫ ভোটে৷ যদিও লোকসভা নির্বাচনের সময় শুভেন্দু অধিকারী, শিশির অধিকারীরা ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসে৷ এখন তাঁরা শিবির বদলে বিজেপিতে৷

পটাশপুর–এই কেন্দ্র থেকে ১৪,৩৫৫ ভোটে এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷

ভগবানপুর–এই কেন্দ্র থেকেও ৩৭,৩৯১ ভোটে এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷

খেজুরি–নন্দীগ্রাম লাগোয়া এই কেন্দ্রে লোকসভা নির্বাচনের ৫,৫৫৩ ভোটে এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷

এগরা–এই কেন্দ্র থেকে অবশ্য লোকসভার ফল অনুযায়ী ৮,৬৯৪ ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷

রামনগর–এই কেন্দ্রে এবারও তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী অখিল গিরি৷ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী এই কেন্দ্রে এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেসই৷ ব্যবধান ছিল ৭,৭৬৬৷

পশ্চিম মেদিনীপুরে মোট বিধানসভা রয়েছে ১৫টি৷ তার মধ্যে ৬টি আসনে শনিবার ভোট৷ লোকসভা ভোটের নিরিখে এই জেলাতেও ১৫টি আসনের মধ্যে ৮টিতে এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস, ৭টিতে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷

দাঁতন–বিজেপি এগিয়ে ছিল ৬,৬৮৯ ভোটে৷

কেশিয়াড়ি–এই বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি এগিয়ে ছিল ১০,৮৭৪ ভোটে৷

গড়বেতা–লোকসভা ভোটের ফলের নিরিখে গড়বেতাতেও বিজেপি এগিয়ে ছিল ৬,৮১১ ভোটে৷

শালবনী–এই কেন্দ্রে এবার বামেদের প্রার্থী সুশান্ত ঘোষ৷ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী অবশ্য এই কেন্দ্র থেকে এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷ দু’‌নম্বরে ছিল বিজেপি৷ ব্যবধান ছিল ৮,৭২৫৷ বামেরা পেয়েছিল মাত্র ১১,০২৪টি ভোট৷

মেদিনীপুর–এবার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী জুন মালিয়া৷ তবে লোকসভা নির্বাচনের ফলের নিরিখে এই কেন্দ্রে ১৬,৬৪১ ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷

খড়্গপুর–লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী এই কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে ছিল ৯,৪৬৭ ভোটে৷

ঝাড়গ্রামের চারটি বিধানসভা কেন্দ্রেই ভোটগ্রহণ শনিবার৷ লোকসভা নির্বাচনের ফল অনুযায়ী তার মধ্যে তিনটিতে এগিয়ে ছিল বিজেপি, একটিতে এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷

বিনপুর–লোকসভা নির্বাচনের ফলের নিরিখে ৩,০৫৯ ভোটে বিজেপির তুলনায় এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷

নয়াগ্রাম–এই কেন্দ্রটিতে ৩,৩৩৮ ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷

গোপীবল্লভপুর–এই কেন্দ্রে ৬,৮২৯ ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷

ঝাড়গ্রাম–এই বিধানসভা কেন্দ্রেও লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বলছে, ১৬৪৩ ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷

পুরুলিয়া জেলার ৯টি বিধানসভাতেই প্রথম দফায় শনিবারই ভোটগ্রহণ হবে৷ লোকসভা নির্বাচনের ফল বলছে তার মধ্যে ৮টি বিধানসভায় এগিয়ে ছিল বিজেপি, মাত্র একটি বিধানসভায় এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷

বাঘমুন্ডি–লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে এই কেন্দ্র থেকে ৫২,৭০৮ ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷

বলরামপুর–এই কেন্দ্র থেকে ৩৫,৪৬৯ ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসকে পেছনে ফেলে বিজেপি৷

বান্দোয়ান–বিজেপি এগিয়ে ছিল ২৯৭০ ভোটে৷

জয়পুর–এই কেন্দ্র থেকেও ৩১,৭৪৪ ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷

পুরুলিয়া–এই বিধানসভা কেন্দ্রেও বিজেপি এগিয়ে ছিল ৩৬,৪৯৭ ভোটে৷

মানবাজার–পুরুলিয়া জেলার এই কেন্দ্রটিতে লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে ১০,৫৮৩ ভোটে এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷

কাশীপুর–এই কেন্দ্র থেকেও বিজেপি তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে এগিয়ে ছিল ১৬,১৫৪ ভোটে৷

পারা–তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে ৪১,২৪২ ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷

রঘুনাথপুর–লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রেও যথেষ্ট বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷ তৃণমূল কংগ্রেসের তুলনায় ৪২,৬৩৩ ভোটে এগিয়ে ছিল তারা৷

বাঁকুড়া লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে ১২টি আসনেই এগিয়ে ছিল বিজেপি৷ শনিবার এই জেলার চারটি আসনে ভোটগ্রহণ৷

রায়পুর–এই কেন্দ্রে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এগিয়ে ছিল ৩৩৫১ ভোটে৷

রানিবাঁধ–বাঁকুড়ার এই কেন্দ্রেও ১৫,৮১৪ ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷

ছাতনা–লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে এই কেন্দ্রেও বিজেপি এগিয়ে ছিল ৩১,১৮২ ভোটে৷

শালতোড়া–এই বিধানসভায় লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে ১৫০৫৬ ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷

সুতরাং শনিবার প্রথম দফায় রাজ্যের পাঁচটি জেলার যে ৩০টি আসনে ভোট হতে চলেছে, আগের তুলনায় সেখানে বিজেপি বেশ মজবুত বলেই প্রাথমিক অঙ্ক বলছে। কারণ, শনিবার পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পূর্ব মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রাম— এই পাঁচ জেলার যে ৩০টি আসনে ভোটগ্রহণ, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেখানে একটিতেও জয়লাভ না করলেও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে ওই বিধানসভা কেন্দ্রগুলির মধ্যে ২০টিতেই এগিয়ে ছিল বিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে ছিল মাত্র ১০টিতে। অথচ ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান বলছে, ওই ৩০টি আসনের ২৭টিতে জয়লাভ করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। দু’টি আসনে পেয়েছিল কংগ্রেস এবং একটি আসন পেয়েছিল বামশরিক আরএসপি। সেবার ওই ৩০টি আসনের একটিতেও জেতেনি বিজেপি।

বন্ধ করুন