বাড়ি > বায়োস্কোপ > আমায় অশ্বিনী বাবু বলে ডাকত, সুশান্তের স্মৃতিকথায় অভিনেতা অরিন্দোল বাগচি
সুশান্ত সিং রাজপুত ও অরিন্দোল বাগচী। ব্যোমকেশের প্রিমিয়ারে যশ স্টুডিয়োতে।
সুশান্ত সিং রাজপুত ও অরিন্দোল বাগচী। ব্যোমকেশের প্রিমিয়ারে যশ স্টুডিয়োতে।

আমায় অশ্বিনী বাবু বলে ডাকত, সুশান্তের স্মৃতিকথায় অভিনেতা অরিন্দোল বাগচি

‘হেলিকপ্টার শট হোক বা বাঙলি স্টাইলে মুড়ি খাওয়া, চ্যালেঞ্জ জেতাটা একজন পারফেকশনিস্ট নেশা। সুশান্ত সিং রাজপুত একজন জিনিয়াস। অভিনয়, লেখাপড়া, খেলাধুলো যাই করেছে তাতেই চূড়ান্ত সফল।’ অভিনেতা অরিন্দোল বাগচীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল সুশান্তের। স্মৃতি ভাগ করে নিলেন HT Bangla-র সঙ্গে।

 তিন মাস আগে শেষবারের মতো ফোনে কথা 

ডিটেক্টিভ ব্যোমকেশ বক্সীর ফ্লোরেই প্রথম দেখা হয়েছিল প্রাণবন্ত ছেলেটার সঙ্গে। কয়েকদিনের মধ্যেই গড়ে উঠেছিল বন্ধুত্বপূর্ণ মধুর একটা সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক কিন্তু বজায় রেখেছিল সুশান্ত সিং রাজপুত। মাঝেমধ্যেই ফোনে কথা হতো, চলত কাজ সংক্রান্ত আলোচনা। সুশান্ত আমার কিছু কাজ দেখেছিল, ওঁ বারবার আমায় মুম্বাইতে এসে কাজ করতে বলত। বলত ‘ আমি তোমায় হেল্প করব, তুমি চলে তো এস অশ্বিনী বাবু ’ (ব্যোমকেশে ওটাই আমার চরিত্রের নাম)। শেষবার যখন মুম্বই যাই তখন সুশান্ত দিল্লিতে, তাই দেখা হয়নি। গত তিন মাস আগেও কথা হয়েছিল ফোনে। শেষ কথা অনুযায়ী, লকডাইনের পর সব স্বাভাবিক হলে আবার আমার মুম্বই যাওয়ার কথা, তখন ওঁর সঙ্গে দেখা হবে, সে কথা কথাই রয়ে গেলো, আর কোনও দিন দেখা হবে না ওঁর সঙ্গে!

অসম্ভব ভালো সুইচ অন-অফ করতে পারত সুশান্ত

বয়েসে অনেকটা ছোট তাই ‘তুমি’ করেই সম্বোধন করতাম। আর ওঁ আমায় অশ্বিনী বাবু বলে ডাকত। অসম্ভব ভালো সুইচ অন-অফ করতে পারত সুশান্ত। ফ্লোরের বাইরে হাসি, ঠাট্টা, মজা করে আড্ডা দিয়ে মেতে থাকত  ইউনিটের সঙ্গে, যেন পাশের বাড়ির ছেলেটা! দেখে বোঝার উপায় নেই  যে একটু আগে একটা মারাত্মক শট দিয়ে এসেছে! আবার যেই অ্যকশন বললেন ডিরেক্টর, সঙ্গে সঙ্গে সব পালটে গিয়ে একেবারে সোজা চরিত্রে, একদম অন্য একটা মানুষ, যেন সত্যিকারের ব্যোমকেশ বক্সীকেই দেখছি! 

সুশান্ত সিং রাজপুত একজন জিনিয়াস তা আমার বলার অপেক্ষা রাখে না। অভিনয়, লেখাপড়া, খেলাধুলো যাই করেছে  তাতেই চূড়ান্ত সফল। ওঁর মধ্যে ছিল সাঙ্ঘাতিক একটা শেখার নেশা। যতক্ষন না হতো ততক্ষন প্র্যাক্টিস চলত। আমাদের পার্টের শ্যুটিংয়ের বেশ খানিকটা হয়েছে মুম্বইয়ের মীরা রোডের কাছে নাইগাঁও বলে একটা জায়গায়। সেখানে বিশাল বড় সেট তৈরি হয়েছিল ব্যোমকেশের। তখন কলকাতার কিছু জায়গায় শুটিং করার অনুমতি পাওয়া যাচ্ছিল না। পুরনো বাড়ি ভেঙে পড়তে পারে সেইসব নিয়ে ঝামেলা। মুম্বইয়ের সেটটা দেখলে মনে হবে একেবারে সাবেক কলকাতা, সেই কাঠের ট্রাম, দোতালা বাস, নর্থ ক্যালকাটার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, হুবহু কলকাতা। সবই তৈরি করা হয়েছিল। টানা ১৯ দিন শ্যুটিং হয়েছিল। সুশান্তের সঙ্গে থাকত একটা ইয়া বড় মেক-আপ ভ্যান। শ্যুটিংয়ে  ব্রেক হলেই ওঁ ওই ভ্যানে ডাকত আমায়। বিভিন্ন রকম বাঙালি ম্যানারিজম শেখার চেষ্টা করত। আমায় বলত বাংলায় কথা বলতে। একটা মজার কথা বলি, আমরা যেভাবে মুড়ি খাই, ওই বাটি থেকে তুলে হাতের তালুতে নিয়ে একটু নেড়েচেড়ে মুখে ছুঁড়ে দিই, ঠিক সেই স্টাইলটা অ্যাডপ্ট করতে চেষ্টা করত। অনেকবার করে আমাকে ওই মুখে ছোঁড়াটা দেখাতে হতো, প্রথম প্রথম খেতে গিয়ে সব মুড়ি মাটিতে পড়ে যেত ওঁর। কিন্তু দমবার পাত্র নয় সে, হেলিকপ্টার শট হোক বা বাঙালি স্টাইলে মুড়ি খাওয়া, চ্যালেঞ্জ জেতাটা একজন পার্ফেক্টশনিস্টের নেশা।

বাঙালি বাবু সুশান্ত…
বাঙালি বাবু সুশান্ত…
ছবির প্রিমিয়ারে পরিচালক  দিবাকর ব্যানার্জির সঙ্গে অরিন্দোল
ছবির প্রিমিয়ারে পরিচালক  দিবাকর ব্যানার্জির সঙ্গে অরিন্দোল

কোনও ঔদ্ধত্য দেখিনি কোনও দিন 

আমার টাক নিয়ে ওঁর কৌতুহলের শেষ ছিল না! এত কম বয়সে কারও টাক পড়তে পারে সেটাই ওঁর কাছে ছিল বিস্ময়! এই নিয়ে অনেক মজার ঘটনা রয়েছে। সেই সবই বারবার মনে পড়ছে আজ। বাংলা,হিন্দি মিলিয়ে আমি সাতটা ব্যোমকেশে অভিনয় করেছি। ব্যোমকেশ বক্সীর শ্যুটিং শুরুর আগে পরিচালক দিবাকর ব্যানার্জি সুশান্তকে সব কটা দেখিয়েছিলেন। সুশান্ত মজা করে বলত, ‘ অশ্বিনী বাবু তোমায় ছাড়া ব্যোমকেশ হবে না, এবার তামিল তেলেগু ভাষায় ব্যোমকেশ হলেও তাতে তুমি অ্যাক্টিং করবে’। আজ সবই স্মৃতি! খুব অল্প বয়সে এতটা খ্যাতি কিন্তু ওঁকে সংযতই রেখেছিল। কোনও ঔদ্ধত্য দেখিনি ওঁর মধ্যে।

ছবির প্রিমিয়ারে ব্যোমকেশের অপর এক অভিনেতা নীরজ কাবির সঙ্গে অরিন্দোল
ছবির প্রিমিয়ারে ব্যোমকেশের অপর এক অভিনেতা নীরজ কাবির সঙ্গে অরিন্দোল

ওঁ আত্মহত্যা করতে পারে না

রাত জেগে আকাশ দেখলেও আসলে মাটির খুব কাছের মানুষ ছিল সুশান্ত সিং রাজপুত। মন উজাড় করে ভালোবাসত সবাইকে। কারও জন্য কিছু করে সেটা ফলাও করে বলেনি কখনও। করোনা মোকাবিলায় কোটি টাকা দান করেছে অথচ কেউ জানতে পারে নি। ঝকঝকে, উদ্দাম, সফল, সাহসি ছেলে সে, যে ছেলেটা জীবনটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে চাইত প্রতি মুহূর্তে, সে এইভাবে  আত্মহত্যা করতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না। সত্যিটা সামনে আসুক। 

বন্ধ করুন