করোনা যুদ্ধে সামিল এনা সাহা
করোনা যুদ্ধে সামিল এনা সাহা

মানবিকতার এক অন্য নজির গড়লেন অভিনেত্রী এনা সাহা

  • শহরের বস্তি অঞ্চল, যেখানে নিম্নবিত্ত মানুষের বসবাস, সেখান থেকে সোজা কালীঘাটের যৌনপল্লী... করোনা সংকটে সাহায্য করতে ছুটে গেলেন অভিনেত্রী এনা সাহা। মানুষের পাশাপাশি প্রতিদিন খাবারের বন্দোবস্ত করছেন অভুক্ত পথ কুকুরদের জন্যও। সেই কাজের ফাঁকেই নিজের অভিজ্ঞতার অনুভূতি ভাগ করে নিলেন HT Bangla-র সঙ্গে...

লকডাউনের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে শুরু থেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন টলিউডের বিভিন্ন সেলেবরা। মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরম্ভ করে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দৈনিক রোজগারের ভিত্তিতে যে সকল কর্মীদের জীবন যাপন এবং দুঃস্থ শিল্পীদের জন্য আর্থিক সাহায্য করছেন টলি তারকারা। তবে এনার ভূমিকা কিছুটা ভিন্ন। শহরের ঘিঞ্জি এলাকা, মূলত বস্তি অঞ্চল, যেখানে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের বসবাস সেই সব এলাকায় প্রত্যেক দিন নিজের টিম নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন তিনি। প্রত্যেকের হাতে তুলে দিচ্ছেন চাল, ডাল, কাঁচা সবজি সহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী।

শুরুটা কী ভাবে?

এনা--- প্রথম তিন চার দিন তো বুঝতেই পারিনি লকডাউন বিষয়টা এতটা কঠিন হতে পারে! রাস্তাঘাট জনমানব শূণ্য! দোকানপাট সব বন্ধ। বাড়িতে বসেই মনে হল, দোকান বাজার সব বন্ধ তাহলে পথ কুকুররা কেমন করে খাবার পাবে? এটা মনে হতেই ছাদে গিয়ে আশপাশের বাড়ির লোকজনদের ডাকতে থাকি। আমার ডাকে তাঁরাও ছাদে আসেন। সবাইকে অনুরোধ করি নিজ নিজ সাধ্য মত কিছু খাবার তাঁরা যেন ওদেরকে প্রতিদিন খাওয়ান। আমার অনুরোধে অনেকেই সাড়া দেন। আমিও তখন থেকেই আমার কাছের কয়েক জন বন্ধুকে নিয়ে পথে নেমে পড়ি পথ পশুদের খাবার খাওয়াতে। এই ভাবেই শুরুটা হয়েছিল। এই কাজটা করতে করতেই মনে হয়েছিল আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোটা খুবই জরুরি। ব্যাস, যেমন ভাবা তেমন কাজ। নিজের কাছে যা টাকা পয়সা ছিল তাই দিয়েই খাবার সামগ্রী কিনে শহরের স্লাম এলাকা এবং রেড লাইট অঞ্চলে পৌঁছে যাই।

কোন কোন এলাকায় এখনও পর্যন্ত গিয়েছেন?

এনা - কসবা, ঢাকুরিয়া, কালীঘাট সহ শহরের বিভিন্ন এলাকার বস্তি অঞ্চল গুলিতে নিয়ম করে যাচ্ছি আমরা। এর পাশাপাশি নরেন্দ্রপুরের মূক ও বধির শিশুদের একটি সংস্থা এবং অনাথ শিশুদের একটি সংস্থার জন্য খাবার সরবারহ করছি। সমাজ কল্যাণ মূলক কাজকর্ম করে এমন কিছু সংস্থার কাছে খাবার এবং অর্থ পৌঁছে দিচ্ছি। কালীঘাটের যৌনপল্লীতে গিয়েছিলাম। সেখানেও দৈনিক রোজগারের ভিত্তিতে জীবন যাপন। খুবই বিপদের মধ্যে দিন কাটছে যৌনকর্মীদের। যতটা সম্ভব পেরেছি, তাঁদের কাছে খাবার পৌঁছে দিয়েছি। প্রত্যেকদিন ২০০/২৫০ কেজি করে চাল, ডাল, শাক সবজি লাগছে। এই সময় যাই করি না কেন সেটা যথেষ্ট নয়।


লকডাউনের সময়টা বেশ দীর্ঘ। প্রত্যেকদিন এত মানুষের জন্যে খাবার সংগ্রহ করতে অনেকটা অর্থের প্রয়োজন। আপনার নিজস্ব কোনও সংস্থা বা এনজিও রয়েছ ?

এনা - না, আমার কোনও এনজিও বা ফাউন্ডেশন নেই। যা করছি নিজের রোজগারের পয়সায়। আমাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন আমার বেশ কিছু আত্মীয় স্বজন। এগিয়ে এসেছেন আমার কাছের মানুষজন ও বন্ধুরা। অর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি তাঁরা আমার সঙ্গে পথেও নেমেছেন। তবে যেটাই করছি সেটা কিছুই না। এই সময় আরও অনেক অনেক অর্থের প্রয়োজন। খাবার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেককে একটা করে সাবান দিচ্ছি আমরা। যাতে হাইজিন সম্বন্ধেও তাঁদের সচেতন হতে হবে।


এই সময় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও একই দৃশ্য। কর্মহীন অবস্থায় চরম বিপদে দিন কাটাচ্ছেন দৈনিক রোজগারের ভিত্তিতে কাজ করা টেকনিশিয়ানরা। সেই ব্যাপারে কোনও উদ্যোগ

এনা - ওঁরা তো আমাদেরই মানুষ। সবাই একসঙ্গে রোজ কাজ করি, ওঁরা কষ্টে থাকলে আমদেরও যন্ত্রণা হয়। তাই সাহায্য না বলে সাপোর্ট শব্দটা বলব। আমি আমার তরফ থেকে এক লক্ষ টাকা দিয়েছি। এই টাকাটা আমার মা আমায় দিয়েছেন। আমি চেষ্টা করছি যাতে আরও কিছুটা আর্থিক সহযোগিতা করতে পারি। সেই বিষয়ে সানিদার (পরিচালক এবং অ্যাক্রপলিস প্রোডাকশনের কর্ণধার) সঙ্গে কথা হয়েছে। ইতিমধ্যে টলিউডের অনেক তারকাই বিপন্ন টেকনিশিয়ানদের আর্থিক সহযোগিতা করেছেন । করোনাকে হারাতে এই লড়াই আমরা চালিয়ে যাচ্ছি।

পাঠক এবং ফ্যানদের কিছু বলতে চান?

এনা - এটাই সময় মানবিক হওয়ার। সচেতনতা বজায় রেখে এগিয়ে আসুন। সাধ্য মত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। মানুষের পাশাপাশি পথ পশুদের খাবার দিন। প্রতিটা পরিবার যদি একটা করে কুকুর এবং বেড়ালের খাবার দায়িত্ব নেয় তাহলে ওরাও প্রাণ পায়। মনে রাখতে হবে পৃথিবী কেবল মানুষের নয়, ওদেরও। পৃথিবীকে দ্রুত সুস্থ করে তোলার লড়াইতে শামিল হতে পেরেছি এটাই আমার পরম পাওয়া। পথে নেমে কাজ করতে এসে বেশ কিছু কটু কথা আমায় শুনতে হয়েছে, প্রথম প্রথম একটু খারাপ লেগেছিল কিন্তু আর পাত্তা দিই না।


বন্ধ করুন