বাংলা নিউজ > বায়োস্কোপ > Smaranjit Chakraborty Exclusive: যাঁকে দেখলে আরও বাঁচতে ইচ্ছা করে,সেটাই ভালোবাসা
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী।(নিজস্ব ছবি)

Smaranjit Chakraborty Exclusive: যাঁকে দেখলে আরও বাঁচতে ইচ্ছা করে,সেটাই ভালোবাসা

  • ভ্যালেন্টাইনস ডে থেকে শুরু করে ভালোবাসা, নিজের ব্যক্তিগত জীবনের এতদিনে না বলা সযত্নে মুড়ে রাখা গোপন সব স্মৃতি ঝাঁপি অকপটে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা-র কাছে খুললেন স্মরণজিৎ চক্রবর্তী।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক স্মরণজিৎ চক্রবর্তী। নয়া প্রজন্মের বাঙালি লেখকদের মধ্যে স্মরণজিতের জায়গাটা যে বেশ উঁচুতে তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতি বছর প্রকাশিত হওয়া তাঁর লেখা বইয়ের কাটতিই একথা প্রমাণ করে। ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের যুগেও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে কয়েক রাজ্য দূরে থেকেও তাঁর জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। অনেকটা যেন ওই 'ওল্ড স্কুল' ধাঁচের। ২০০৩ সালে অধুনা লুপ্ত 'উনিশ কুড়ি' পত্রিকায় লেখক হিসেবে স্মরণজিতের আত্মপ্রকাশ। আর নেমেই রীতিমতো ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন। মন জয় করে নিয়েছিলেন নয়া প্রজন্মের পাঠকদের। এরপর ধীরে ধীরে ম্যাগাজিনের গন্ডি ছাড়িয়ে প্রবেশ 'উপন্যাস'-এর ময়দানে। সেখানেও ছবিটা এক। 'পাতাঝরার মরশুম','পাল্টা হাওয়া' থেকে 'কম্পাস' ছুঁয়ে 'জোনাকিদের বাড়ি' পর্যন্ত সাহিত্যিকের জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন। অটুট। বর্তমানে নয়া প্রজন্মের কাছে মন কেমন করা প্রেমের উপন্যাস আর স্মরণজিৎ চক্রবর্তী যেন প্রায় সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ। ভ্যালেন্টাইনস ডে থেকে শুরু করে ভালোবাসা, নিজের ব্যক্তিগত জীবনের এতদিনে না বলা সযত্নে মুড়ে রাখা গোপন সব স্মৃতি ঝাঁপি অকপটে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা-র কাছে খুললেন তিনি।   

ছোটবেলা কেটেছে বাটানগরে।  তাঁদের ছোটবেলায় প্রেমের মাস, প্রেমের সপ্তাহ, এমনকি ভ্যালেনটাইনস ডে বলে যে কোনও অস্তিত্ব হয়, সেটাই জানা ছিল না। স্মরণজিৎ-এর মতে,প্রেমের দিবস বলতে আজও তাঁর কাছে প্রতিটি দিবস। ভালোবাসলে রোজই ভালবাসা যায়। বছরের ৩৬৪ দিন ভালোবাসল না, অথচ এই একটি দিনে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিল, এটা হয় না। তবু এত হানাহানির মধ্যে মানুষ ভালোবাসার দিন উদযাপন করে এটাও কিন্তু কম কিছু নয়। বেশ,ভালোই। অনেকটা যেন সারা বছর ভালোবাসার মধ্যে থাকলেও এই দিনটি যেন তা উদযাপন করা হয়। তবে, ব্যক্তিগতভাবে ভ্যালেন্টাইনস ডে-এর অন্তত লেখকের কাছে আলাদা করে কোনও গুরুত্ব নেই। কারণ ওই যে তিনি যাঁকে ভালোবাসবেন রোজ বসবেন, আলাদা করে শুধু একদিন বাসবেন না। 

সামান্য থেমে বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশের ধরণ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন তিনি। লেখকের কথায়, 'ভালোবাসায় আজকাল লোক দেখানোটাই প্রধান হয়ে উঠেছে। দেখে খুব আশ্চর্য হই। আমাদের সময় ভীষণ ব্যক্তিগত কথা, ভাবনা সবার সামনে তুলে ধরা ব্যাপারটা ছিল না, বাহবা কুড়োনোর বিষয়টিও ছিল না। আমার কাছে দু'জন মানুষের পরস্পরের প্রতি 'ভালোবাসা' নিয়ে অনুভূতির ব্যাপারটা তো তাঁদের মধ্যে সাঁকো তৈরি করে। এবং সেটাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। তা অন্য কেউ দেখল অথবা বুঝল কী না সেটি মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার ব্যক্তিগত মত, সবকিছুই যে বিজ্ঞপিত করার প্রবণতা এসেছে, এতে গোটা ব্যাপারটাই না মনে হয় কোথাও একটু তরল হয়ে যাচ্ছে। '

নিজের স্টাডিতে স্মরণজিৎ চক্রবর্তী।(নিজস্ব ছবি)
নিজের স্টাডিতে স্মরণজিৎ চক্রবর্তী।(নিজস্ব ছবি)

এরপরের স্মৃতি কৈশোরের-যৌবনের। স্মরণজিৎ বলছেন, ' সেটা ১৯৯৯ সাল। আমি যখন কলেজে পড়তাম, তখন একটি মেয়েকে দারুণ ভালোবাসতাম। তখন তো আর মোবাইল ফোনের যুগ নয়। চারুচন্দ্র কলেজে পড়তাম আমরা। তো লেক মার্কেট অঞ্চলে একটি বাড়িতে সে পড়তে যেত। আমি গল্প করতে করতে ছেড়ে দিয়ে আসতাম। তারপর ঘন্টা দু'য়েক পর ফের সেখান থেকে তাঁর সঙ্গে হেঁটে গল্প করতে করতে ফিরতাম। এত বছর পর আমার ঠিক তারিখ মনে নেই, তবে ভ্যালেনটাইনস ডে-এর আশেপাশেই হবে। শীত গুটিয়ে এসেছিল প্রায়, বসন্ত আলতো করে টোকা মারছে। একদিন সে বলল আজ মাত্র আধ ঘন্টা ক্লাস হবে। শোনামাত্রই বলে উঠেছিলাম, আমি অপেক্ষা করছি। অবশ্য দশ মিনিট পর সে টিউশন ক্লাস থেকে বেরিয়ে জানাল, প্ল্যান বাতিল। স্যার অনেকক্ষণ পড়াবেন। আমি তবুও দাঁড়িয়ে থাকতে রাজি হয়েছিলাম। মনে আছে, ক্লাসের বাইরে একটা নিমগাছ ছিল আর তার পাশেই গুলমোহর। ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, টুপটাপ পাতা ঝড়ছে, দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে নামার পরেও সেই জায়গা ছেড়ে বেশিদূর এগোইনি। প্রায় চার ঘন্টা পরে সে বেরোল এবং আমাকে ওই জায়গায় আমাকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। খুশি নিশ্চয়ই হয়েছিল কিন্তু ভারি বিব্রতও হয়েছিল। বলতে চাইছি, সেই সময়টুকু মনে পড়লে ভারি আশ্চর্য লাগে। অবাক হই ভেবে যে এই আমিই এরকম করতাম। এখন সেসব স্মৃতি আমি কিন্তু দেখি তৃতীয় পক্ষ হিসেবে। যেন অন্যের ঘটনা দেখছি, এমনভাবে। কারণ ওই ছেলেটি আর আমি তো আর এক নয়। সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। ২৩ বছর হয়ে গেল। ভ্যালেন্টাইনস ডে বললে আমার তাই আজও মনে পড়ে ওই ছেলেটির কথা। শুধু শর্তহীন ভালোবেসেছিল বলে সেদিন যে একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়েছিল।'

এরপরে কথা ওঠে তাঁর রচিত প্রেমের উপন্যাস নিয়ে। পাঠকমহলের বড় এক অংশের প্রশ্ন, স্মরণজিৎ-এর বেশিরভাগ উপন্যাসে কি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, অভিজ্ঞতার ছোঁয়া থাকে?  লেখক বললেন, 'আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তো থেকেই। তবে সবটুকুই নিজের নয়। নিজস্ব স্মৃতি, ঘটনা ছাড়াও  আমার পরিচিত মানুষের জীবনে যেসব ঘটনা ঘটছে এবং যা আমি কাছ থেকে জেনেছি, সেসবও কিন্তু ব্যক্তিগত ঘটনার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছে। সেইসব ঘটনার সঙ্গে প্রতক্ষ্যভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছি। আমার পরিচিত কোনও ছেলে কিংবা মেয়ে যখন তীব্র ভালোবেসেও ব্যর্থ হয়েছে, ঠকেছে, সেসব কথা আমার কাছে বলেছে এবং বলতে বলতে হাউহাউ করে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠেছে, তখন সেসব ঘটানো কিন্তু আমার ব্যক্তিগত হয়ে যায়। এবং আমার কোনও লেখায় সেই মানুষটির ওই ভাবনা, ওই আর্তিটা নানান ভাবে প্রকাশ পায়। এছাড়াও গল্পের খাতিরে জীবন থেকে কোনও ঘটনার নির্যাস নিয়ে নিজের মত কিছু বানিয়েছি। 

তবে শেষভাগেও স্রেফ ভালোবাসা নিয়ে কথা বলতেও কিন্তু এতটুকুও হোঁচট খেলেন না লেখক। বললেন, 'ভালোবাসার নির্দিষ্ট উত্তর আমি সত্যিই জানি না। তবে এটুকু বলব, ভালোবাসা অর্থাৎ এমন একজন যাঁকে আমি নির্ভর করতে পারব। যাঁকে বা নিদেনপক্ষে তাঁর ছবি দেখলেও আমার জীবনযন্ত্রণার সমস্ত ব্যাথার উপশম হয়।সেই অনুভূতিটাই ভালোবাসা। যাঁকে দেখলে অনেকটা সহনীয় হয়ে যায় এই জীবন যন্ত্রনা, আরও একটি দিন বাঁচতে ইচ্ছে করে, নতুন করে বাঁচার কথা ভাবি, আমার কাছে সেটাই ভালোবাসা।

সামান্য থেমে স্মরণজিৎ আবার বললেন, 'ভালোবাসা তো অনেক সময় যন্ত্রণারও। সবসময় সম্পর্ক সফল নাও হতে পারে, তাই বলে জীবনের প্রতি কখনওই বিমুখ হওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। মনখারাপ হবেই আবার সেটা কেটেও যায়, যাবেই! পৃথিবীর কেউ না কেউ সেই 'ব্যর্থ' মানুষটির জন্য অপেক্ষা করে থাকে, থাকবে। এটাই নিয়ম। তবে ভালোবাসার সম্পর্কে ব্যর্থ হয়ে মনখারাপের জেরে জীবন থামিয়ে দেওয়া, অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ার কোনও মানে নেই। কোনও মানেই হয় না। জীবন অনেক, অনেক বড়। মানুষের জীবন ফুলগাছের মতো। ফুলগাছ কি এক শীতে মরে যায়? সে তো আবার পরের বসন্তে দারুণভাবে ফুটে ওঠে। জীবন এক আশ্চর্য রূপকথা। ভালোবাসায় দৃঢ় বিশ্বাস রাখা উচিত, কারণ দিস ইজ দ্য ওনলি হোপ, ওনলি চার্ম ইন আওয়ার লাইফ!'

বন্ধ করুন