বাংলা নিউজ > বায়োস্কোপ > বাংলাদেশি সিনেমার আরেকটি ‘স্টেপিং স্টোন’ হোক- রেহানা মরিয়ম নূর
কানের লাল গালিচায় টিম রেহানা মরিয়ম নূর
কানের লাল গালিচায় টিম রেহানা মরিয়ম নূর

বাংলাদেশি সিনেমার আরেকটি ‘স্টেপিং স্টোন’ হোক- রেহানা মরিয়ম নূর

  • বাংলাদেশি সিনেমার ইতিহাসে নতুন নজির গড়ল ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। এই বাংলা ছবির ম্যাজিকে বুঁদ কান চলচ্চিত্র উত্সব।

অসাধারণ কোনও কিছু অর্জনের পরও আমরা এরপর তার চেয়ে বড় কিছু প্রত্যাশা করি৷ এটাই মানবচরিত, এই ‘আরও অর্জনের’ নেশাই মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়৷ কিন্তু এই ‘আরও বড় অর্জন’ না পাওয়াটা আগের অর্জনকে ম্লান করে না৷ বরং অন্যদের সাহস জোগায়৷

‘রেহানা মরিয়ম নূর’ চলচ্চিত্রের পরিচালক বারবারই বলছিলেন, তার চলচ্চিত্র কানে প্রথম বাংলাদেশি সিনেমা হিসেবে অফিশিয়াল সিলেকশনে এসেছে, তাতেই তিনি খুশি৷ তবে একইসঙ্গে ‘কিছু একটা পেলে ভালো লাগবে’ এটাও জানিয়ে রেখেছিলেন৷

সবারই তাই শুক্রবার ফ্রান্সের কানে পালে দে ফেস্টিভালের দেবুসি থিয়েটারে চোখ ছিল৷ শেষ পর্যন্ত হলো না৷ ‘আঁ সার্তে রিগা’ ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রায় সবকটি সিনেমার গল্পই বেশ শক্তিশালী ছিল৷ ফলে জুরি বোর্ডের যে ২০টি থেকে ছয়টিকে বেছে নিতে গলদঘর্ম হতে হয়েছে, তা স্পষ্ট৷

জুরি বোর্ডের প্রধান আন্দ্রেয়া আর্নল্ড পুরস্কার বিতরণ শেষে জানিয়েছেন, ‘‘আমাদের আলোচনায় আমরা দুটো জিনিস বারবার বলছিলাম: ‘এই সিনেমটি খুব সাহসী' এবং ‘এই সিনেমাটি হৃদয় দিয়ে তৈরি করা’৷ অনেক সিনেমা খুব যত্ন দিয়ে তৈরি করা, আবার অনেক সিনেমা এমন সব বিষয়ে কথা বলেছে যা নিয়ে কথা বলাটা কঠিন৷ আমরা সব নির্মাতাকে সাহসী ও সুন্দর কাজের জন্য অভিনন্দন জানাই৷ তাদের সিনেমাগুলো ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে৷’’

সিনেমার নির্মাণশৈলী, অভিনয়, লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন ইত্যাদি নিয়ে আর কথা বলার কিছু নেই৷ তাৎক্ষণিক রিভিউয়ে তার অনেকটা বলার চেষ্টা করেছি, বাকিটা আসলে প্রতিটি দর্শকের নিজের ওপরই দায়িত্ব হিসাবে বর্তায়৷

আজ বলতে চাই, বাংলাদেশের সিনেমার অর্জনে এই সিনেমার ভূমিকা নিয়ে৷

পুরস্কার না পেলেও কেবল অফিশিয়াল সিলেকশনে এসেই আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্টেপিং স্টোন স্থাপন করে গেলেন৷ কিভাবে? বলছি৷

বিশ্বে বাংলা সিনেমার অবস্থান অনেক আগে থেকেই শক্ত ছিল৷ ঢাকার ছেলে বিমল রায় ১৯৫৪ সালে ‘দো বিঘা জমিন’ নিয়ে প্রথম কানে গেলেও সেটি ছিল মূলত হিন্দি ভাষায় নির্মিত ছবি৷ এরপর আরও দুটি হিন্দি ছবি ‘সুজাতা’ ও ‘বিরাজ বহু’ নিয়েও কানে যান বিমল রায়৷

১৯৫৬ সালে থেকে সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’ প্রথম বাংলা ভাষায় নির্মীত ছবি হিসেবে কানে গিয়ে ‘Best human documentary’ বা ‘সেরা মানবদলিল’ স্বীকৃতি পায়৷ তারপর মৃণাল সেন, গৌতম ঘোষরাও কান দাঁপিয়ে বেড়িয়েছেন বাংলা সিনেমা নিয়ে৷

ফলে বিশ্বের বড় চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে ‘বাংলা’ নামটা পরিচতই ছিল৷ কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে থেকেই টালিউড এবং ঢালিউড আলাদা যাত্রা শুরু করে৷ এ যাত্রায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শুরু থেকেই দুই বাংলায় সাড়া জাগালেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরব উপস্থিতির জানান দিতে পারেনি৷

আমাদের এটাও ভুলে গেলে চলবে না, ‘সারেং বউ’ ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ ইত্যাদির পর ‘কাটপিস’ আর ‘এক টিকিটে দুই ছবি’র দৌরাত্ম্যও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি অধ্যায়৷ চলচ্চিত্রপ্রেমীদের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের পর বাংলাদেশি সিনেমা সেই চক্কর থেকে বের হলেও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতারা সবসময়ই ভুগে আসছেন৷ প্রোডাকশন থেকে শুরু করে ডিস্ট্রিবিউশন, পাবলিসিটি- সব জায়গাতেই পদে পদে লড়াই তাদের৷

এমন প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে সাদের এমন উত্থান নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া৷

জোরেশোরে ‘বাংলাদেশ’ নামটা ২০০২ সালে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিলেন তারেক মাসুদ৷ কানের প্যারালাল বিভাগ ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে তার ‘মাটির ময়না’ কেবল আমন্ত্রণই পায়নি, জিতেছিল সম্মানজনক ফিপ্রেসকি পুরস্কারও৷ তারপর আবার প্রায় দুই দশকের অপেক্ষা৷ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ প্রথমবারের মতো কানের অফিশিয়াল সিলেকশনে নিয়ে এলেন বাংলাদেশের সিনেমা৷

এই অর্জন যেমন ঈর্ষা জাগানোর মতো, আবার অনেকের জন্য উৎসাহব্যঞ্জকও৷ গুপী-বাঘা প্রোডাকশন্সের নির্মাতা-প্রযোজক আরিফুর রহমান বলছিলেন, ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ এর অফিশিয়াল সিলেকশনে আসাটাই তরুণ নির্মাতাদের জন্য একটা ‘কিক’ হিসাবে কাজ করছে৷ তারা অনেকে এখন নতুন কাজে উদ্যম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেন আরো বড় অর্জনের তাগিদে৷ আর এটাই আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের টিমের সাফল্য৷

করোনা মহামারি যদি আবার সব ভণ্ডুল না করে দেয়, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে ৭২তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব৷ হয়তো এবার বার্লিনালেতেই প্রতিযোগিতা বিভাগে অন্য কোনো নির্মাতা হাজির হবেন আনকোরা আইডিয়ার সিনেমা নিয়ে৷ হয়তো হবে আরো বড় কোনো অর্জন৷

আবারও ২০ বছরের অপেক্ষা চাই না৷

বন্ধ করুন