বাড়ি > বায়োস্কোপ > 'ব্যোমকেশের হ্যাংওভারের ভয়ে মুকেশ আমাকে সুশান্তের সঙ্গে একটা ছবি তুলতে দেয়নি'
সঞ্জনা ও সুশান্তের সঙ্গে স্বস্তিকা..আজ সবটাই শুধু স্মৃতির পাতায় (ছবি-ফেসবুক)
সঞ্জনা ও সুশান্তের সঙ্গে স্বস্তিকা..আজ সবটাই শুধু স্মৃতির পাতায় (ছবি-ফেসবুক)

'ব্যোমকেশের হ্যাংওভারের ভয়ে মুকেশ আমাকে সুশান্তের সঙ্গে একটা ছবি তুলতে দেয়নি'

  • ডিটেক্টিভ ব্যোমকেশ বক্সীর অঙ্গুরীদেবীর তথা কিজির মায়ের সঙ্গে ছবি তুলতে পারবে না ম্যানি, এমনই নির্দেশ ছিল দিল বেচারার পরিচালক মুকেশ ছাবরার। দিল বেচারা এবং কো-স্টার সুশান্ত সিং রাজপুতের স্মৃতিচারণায় স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়….

পাতাল লোকের ব্যাপক সাফল্যের পর করোনা সংকটের মধ্যেই মুক্তি পেল অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের ছবি দিল বেচারা, যেটা দুর্ভাগ্যবশত সুশান্ত সিং রাজপুতের শেষ ছবি। সুশান্তের মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গিয়েছে এই ছবি মুক্তির ৪০ দিন আগে। পাশাপাশি এই বছরের শুরুতেই বাবা,সন্তু মুখোপাধ্যায়কেও হারিয়েছেন স্বস্তিকা। নায়িকার কথায়, ‘আমার কেরিয়ার নিয়ে বাবার চেয়ে বেশি এক্সাইটেড কেউ হতো না, বাবা কাজটা দেখতে পারল না সেটা অনেখানি খারাপ লাগা’। সুশান্তের চলে যাওয়ার দুঃখ, নিজের কাজ মুক্তির আনন্দ-ভালো লাগা, খারাপ লাগার এই দ্বন্দ্ব জারি রয়েছে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের মনে। এর মাঝেই দিল বেচারার মুক্তি ও সুশান্ত সিং রাজপুতের স্মৃতি নিয়ে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলার সঙ্গে আড্ডা দিলেন কিজি বসুর মা।

আপনি কীভাবে সুশান্তকে মনে রাখতে চান?

ভালো কথাগুলো মনে রাখতে চাই,ভালো লাগাগুলো মনে রাখতে চাই। চলে যাওয়ার বিষাদটা সবসময় থাকবে, কিন্তু এত নেগেটিভিটি চারিদিকে সেটাই আমি আর কিছু সংযোজন করতে চাই না। একটা মানুষের মৃত্যু সেটা সময়ে হোক বা অসময়ে হোক সেটার বোঝা সবাই বইতে হয়। কিন্তু আমি যদি সারাক্ষণ মনের মধ্যে খারাপ লাগা কিংবা অন্যের প্রতি বিদ্বেষ,কাউকে খোঁটা দেওয়া, অপমান কিংবা গালাগালাজ করা এটা যদি করি তাহলে সেটা আমার পক্ষে খারাপ। যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় এটাই নিউ নর্ম্যাল। আমার খারাপ লাগাটা আমার সঙ্গে আছে, সেটা আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি। সেই মানুষটার সঙ্গে আমি যে সুন্দর সময়টা কাটিয়েছি, সেটার মধ্যে দিয়েও আমার খারাপ লাগাটা তুলে ধরতে পারি।

আমি যেটুকু কাজ করতে পারব, সেই ছোট,অল্প কাজগুলোর মধ্য দিয়েই আমি ভালো থাকতে চাই।শারীরিকভাবেও এবং সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবেও। কারণ আমাকে আমার সংসারের ভার কাঁধে নিয়ে সব দায়িত্ব পালন করতে হয়। 

দিল বেচারায় কিজির ‘প্রোটেক্টিভ’ মা মিসেস বসুর চরিত্রে দেখা গেল আপনাকে, কেমন ছিল এই সফরটা? 

এই ছবির জন্য জানপ্রাণ দিয়ে অডিশন দিয়েছিলাম, নিজের ৫০০% উজাড় করে দিয়েছিলাম। কেউ আমাকে ফোন করে ডেকে,সুযোগ দেয়নি। আর ছবিটাতেও আমি ৫০০% দিয়েই কাজ করেছি, তবে এই চরিত্রটাকে নিজের করে তোলার জন্য আমাকে খুব বেশি পরিশ্রম করতে হয়নি। কারণ ওভার প্রোটেক্টিভ মায়ের এই ইনসটিংটা স্বভাবসিদ্ধভাবেই আমার মধ্যে রয়েছে। গত ২০ বছর ধরে আমি ব্যক্তিগত জীবনেও মায়ের ভূমিকাটা খুব ভালোভাবে পালন করে যাচ্ছি,মনে তো তাই হয় ( মুচকি হাসি)। সঞ্জনার সঙ্গেও আমার খুব ভালো একটা বন্ড তৈরি হয়ে গেছে, আমি আর সঞ্জনা তো পুরো সেঁটে থাকতাম শ্যুটিং সেটে। মানির (স্বস্তিকার মেয়ে অন্বেষা) থেকে সঞ্জনা খুব বেশি বড় নয়, প্রায় সমবয়সী-খুব মায়া পড়ে গিয়েছিল মেয়েটার প্রতি। ছবিটার শ্যুটিং বছর দেড়েক আগে শেষ হয়ে গেছে কিন্তু আজও আমার আর সঞ্জনার বন্ডিং ততটাই মজবুত। সত্যি বলতে এটা আমার কেরিয়ারের খুব গুরুত্বপূর্ন একটা সময়। পাতাল লোকে দুমাস আগে দর্শক আমাকে একরকমভাবে দেখেছে, এখন অন্যরকমভাবে দেখছে।  সেটাই তো একটা অভিনেতার ব্যাপ্তি কতটা সেটা প্রমাণ করে,তাই না?  চ্যালেঞ্জ সেটাই, কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে আমি সব ভূমিকা ফুটিয়ে তুলতে পারছি। 

কিজির মায়ের ভূমিকায় স্বস্তিকা (ছবি-ইনস্টাগ্রাম)
কিজির মায়ের ভূমিকায় স্বস্তিকা (ছবি-ইনস্টাগ্রাম)

এর আগে ডিটেক্টিভ ব্যোমকেশ বক্সীতে আপনি সুশান্তের প্রেমিকা ছিলেন, এখানে সুশান্তের প্রেমিকার মায়ের ভূমিকায়, সেই ট্রান্সফরমেশনটা আপনারা দুজনে কীভাবে হ্যান্ডেল করেছেন?

এটা খুব ফানি ব্যাপার। শ্যুটিং শুরুর আগে থেকেই যখন ফক্স স্টারের অফিসে আমার সঙ্গে সুশান্তের দেখা হয়েছে ও আমাকে অঙ্গুরীদেবী বলেই ডাকত। আর প্রচুর ডায়লগ আমাদের দুজনেরই মনে ছিল, সাধারণ তো অভিনেতাদের এত ডায়লগ মনে থাকে না। দেখা হলে সেগুলো ও আমাকে বলত। সেটা দেখে মুকেশ (ছাবরা) ভীষণ প্যানিক করত। ও রীতিমতো বলত ওই ছবির হ্যাংওভার আমি চাই না। মেয়ের উপর নজর দে, মায়ের প্রতি এত আগ্রহ কেন?  কী করছো তোমরা দুজনে?  সত্যি ভীষণ ফানি শিফট, যে চার বছর আগে আমি ছিলাম সুশান্তের লাভ ইন্টারেস্ট, আর এখন ওর লাভ ইন্টারেস্টের মা।মুকেশ তো আতঙ্কে আমার সঙ্গে সুশান্তকে একটা ছবি পর্যন্ত তুলতে দেয়নি। বলত আমি ব্যোকমেশের হ্যাংওভার চাই না। ভাবতে পারবে না, আমাদের দুজনকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দিত না। আমরা বলতাম, এ কী জ্বালাতন, আরে এখনও তো শট চলছে না।জামশেদপুরে এখানে কেউ দেখছে না আমাদের। মুকেশ পাল্টা বলত-কেউ না দেখুক,আমি নিজে তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখতে চাই না। এই সব মজার জিনিসপত্র ঘটত সেটে। সেগুলোই মনে থাকবে।

ডিটেক্টিভ ব্যোমকেশ বক্সীর একটি দৃশ্যে সুশান্ত ও স্বস্তিকা (ছবি সৌজন্যে-যশ রাজ ফিল্মস)
ডিটেক্টিভ ব্যোমকেশ বক্সীর একটি দৃশ্যে সুশান্ত ও স্বস্তিকা (ছবি সৌজন্যে-যশ রাজ ফিল্মস)

চার বছরে অভিনেতা হিসাবে সুশান্ত কতটা বদলেছিল বলে আপনার মনে হয়? 

দেখুন, এটাতো স্বাভাবিক উত্তরণ মানুষের। পাঁচ বছর আগে আমি যেমন অভিনয় করতাম আমি চাইব সেটা যেন এখন আরও ভালো হয়। নিজের শিল্পটাকে সবসময়ই অভিনেতারা বদলাতে থাকেন। পাঁচ বছর ধরে একরকম অভিনয় করলে, মানুষ আমাকে দেখবে কেন? নতুন ছবি বা অফার করবে কেন? সেই স্বার্থেই আমাদের বদলাতে হয়। ২০১৪ সালে যখন আমি সুশান্তের সঙ্গে ব্যোমকেশে কাজ করেছিলাম, ওটা ছিল ওর কেরিয়ারের তিন নম্বর ছবি। তারপর কত কঠিন,কঠিন কাজ করেছে সুশান্ত। অন্যরকম এবং ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ চরিত্রে কাজ করেছে। ধোনির বায়োপিক করেছে। যাঁকে আমরা রোজ চোখের সামনে খেলতে দেখছি..রোজদিন যাঁকে নিয়ে আলোচনা যাচ্ছে, তাঁর বায়োপিকে অভিনয় করে সেটাকে ততটাই বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাটাই তো প্রমাণ করে অভিনেতা হিসাবে কতখানি দক্ষ সুশান্ত সিং রাজপুত। ভেবে দেখুন তো সোনচিড়িয়ার মতো ছবিতে কাজ করেছে ও,একজন মেনস্ট্রিম বলিউড হিরো হওয়া সত্ত্বেও। সুশান্তের সম্পর্কে আমার সবচেয়ে যে জিনিসটা অসাধারণ লাগে- বলিউডের প্রথম সারির অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও ও রিস্ক নিতে ভয় পেত না, এবং সেই জন্যই সবধরণের ছবি ও করেছে। এবং যথার্থভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ওঁর অভিনয় দক্ষতা নিয়ে তো কেউ কোনও প্রশ্ন করতে পারবে না। সেটার জন্য ওকে বাহবা দিতেই হবে, সবাই বাধ্য। পাল্টে ছিল বলতে, দিল বেচারার সময় অভিনেতা হিসাবে অনেক বেশি কনফিডেন্ট, স্বচ্ছল-সেটা তো স্বাভাবিক। আমার তিননম্বর ছবি আর পঞ্চাশ নম্বর ছবিতে আমি এক থাকব না। সেটাই ওর সঙ্গেও হয়েছিল। 

শ্যুটিংয়ের ফাঁকে সুশান্ত ক্রিকেট খেলত, আর জামশেদপুরে তো টেলিস্কোপও নিয়ে গিয়েছিল শ্যুটিংয়ের সময়। আপনি কোনদিন সঙ্গ দিয়েছিলেন ক্রিকেট খেলায়?

ও ক্রিকেট খেলত সকাল পাঁচটায়, রোজই খেলত। সেই সময়টা আমি ঘুমোতাম। আমি  এমনি ক্রিকেটের তেমন বড় ফ্যান নয়। তাই খেলার সুযোগ হয়নি। আমি তো ব্যাটও ধরতে পারিনা। ওই ফানি এপিসোডটা সবার সামনে হোক আমি চাইতাম না। হ্যাঁ, এটা ঠিক জামশেদপুরে সুশান্ত ওর টেলিস্কোপ নিয়ে গিয়েছিল। হোটেলে ওর রুমের ব্যালকনিতে সেটা রাখাছিল। তার দিন কয়েক আগেই টেলিস্কোপটা ও কিনেছিল। খুব ফ্যাসিনেটেড ছিল ওটা নিয়ে। আমরা অনেক কথা বলতাম। আসলে অ্যাট্রোনমি নিয়ে আমাদের রোজের জীবনে আলোচনা হয় না। নাসা,ইসরো কিছু করলে হয়ত আমারা কিছু কথা বলি-কিন্তু সুশান্তের দৈনন্দিন জীবনের ওটা অংশ ছিল, ওর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ-তাই বলতে পারি ওর কাছে থেকে আমার অনেক জ্ঞান অর্জন হয়েছে। 

দিল বেচারার একটি দৃশ্যে সুশান্ত-সঞ্জনা এবং স্বস্তিকা (ছবি সৌজন্যে-ইউটিউব)
দিল বেচারার একটি দৃশ্যে সুশান্ত-সঞ্জনা এবং স্বস্তিকা (ছবি সৌজন্যে-ইউটিউব)

বিশ্বের সবচেয়ে ‘লাভড’ ফিল্ম  ট্রেলার দিল বেচারা, ইতিমধ্যেই IMDb-তে সবচেয়ে বেশি রেটিং পাওয়া ছবি,দর্শকদের সবশেষে কিছু বলবেন?

এই ছবিটা নিয়ে সত্যি বলছি আলাদা করে কিছু বলবার নেই। সোশ্যাল মিডিয়াতেও আমরা ইতিমধ্যেই অনেক কথা বলেছি। অনেকেই ইতিমধ্যেই দেখে ফেলেছেন, অনেকে দেখবেন। এই ছবিটা এই কারণে দেখুন বা ওই কারণে দেখুন সেটা না বললেও চলবে। কারণ আমি যদি নাও বলি তাহলেও সবাই দেখবে দিল বেচরা,এটা আমার বিশ্বাস। এই ছবিটার সঙ্গে এতটা ইমোশন জড়িয়ে আছে যে, এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে অনুভূতিগুলো এতটা বাড়াবাড়ির লেভেলে চলে গেছে। জার্নিটা ইমোশ্যানাল, গল্পটা ইমোশ্যানালাল সঙ্গে সুশান্তের চলে যাওয়া-সবাই ভালোবাসুক এই দিল বেচারা এইটুকুই চাওয়া। 

বন্ধ করুন