বাড়ি > বায়োস্কোপ > লেখক ও পরিচালকের মধ্যে কোনও কোয়ার্ডিনেশন নেই…! অকপট পরিচালক অনিন্দ্য সরকার
পরিচালক অনিন্দ্য সরকার।
পরিচালক অনিন্দ্য সরকার।

লেখক ও পরিচালকের মধ্যে কোনও কোয়ার্ডিনেশন নেই…! অকপট পরিচালক অনিন্দ্য সরকার

‘এখন তো রাইটাররা এলিয়েন হয়ে যাচ্ছেন। বাড়িতে বসে একসঙ্গে তিনটে চারটে সিরিয়াল লিখছেন একজন লেখক। তাঁরা সেট পর্যন্ত দেখেন না,কিন্তু প্রচুর ক্রিয়েটিভ সিন লেখেন। আর তার ফুটেজ তুলতে পরিচালকের নাজেহাল দশা! এদিকে ইপি প্রোডিউসারকে বলছেন, 'ডিরেক্টর কাজ তুলে দিতে পারছেন না!’ মুখ খুললেন পরিচালক অনিন্দ্য সরকার। 

লেখক এবং পরিচালকের মধ্যে কোয়ার্ডিনেশনের অভাবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত মেগা সিরিয়াল?

এখন যাঁরা লেখেন তাঁরা বাড়িতে বসে লেখেন। তাঁরা সেট পর্যন্ত দেখেন না, কোনটা সিংহ দুয়ার, কোনটা খিড়কি দরজা, কোনটা বেডরুম, কোনটা দালান, ঘরের রঙ কেমন, তাঁরা কিছুই জানেন না, এবং নিজের উদ্যোগে সেটা জানার চেষ্টাও করেন না। যদি কেউ ফ্লোরটাই না দেখেন তাহলে চিত্রনাট্য , সংলাপ, ওয়ানলাইনার ইত্যাদি লিখবেন কেমন করে? সিন গুলোর কম্পোজিশন করবেন কেমন করে? এখন লেখক এবং পরিচালকের তো দেখাই হয় না, কোনও কোয়ার্ডিনেশনই নেই! সবই তো ফোনে ফোনে হচ্ছে!

এদিকে লেখক তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে প্রচুর শিল্পকর্ম দেখাচ্ছেন, ক্রিয়েটিভিটি দেখাচ্ছেন, এক্সিলেন্স দেখাচ্ছেন। নায়ক গাড়ি থেকে পড়ে গেল, রক্ত ঝরছে, অমুক হচ্ছে তমুক হচ্ছে ইত্যাদি। এদিকে সেই সিন আমাকে আজকেই শুট করে, এডিট করে, সম্পূর্ণ বানিয়ে আগামিকালের টেলিকাস্টের জন্য পাঠাতে হবে। আর এই ধরণের দৃশ্য গুলোশুট করতে এবং এডিট করতে অনেকটা সময় লাগে, যা বাঁধাধরা সময়ে শেষ করা সম্ভব নয়। লেখক যদি ফ্লোরে থাকতেন সেক্ষেত্রে তিনি বুঝতেন। এই সিনগুলো একটু অন্যভাবে লিখে টাইম ম্যানেজমেন্ট করে আর একটু সহজ করে নিয়ে শুট করা সম্ভব হতো। কিন্তু ওই যে বললাম কোনও কোয়ার্ডিনেশন নেই। আগে যখন ফ্লোরে বসে লেখা হতো তখন লেখক জানতেন কোন সিন কেমন ভাবে লিখলে ফুটেজ তাড়াতাড়ি ওঠানো সম্ভব। পরিস্থিতিটা সহজ ও শান্তিপূর্ণ ছিল সেই সময়। এখন সেই তালমেলটাই নেই।

এখন তো রাইটাররা এলিয়েন হয়ে যাচ্ছেন। এক সঙ্গে তিনটে চারটে করে সিরিয়াল লিখছেন একেকজন লেখক। কোনওটার সংলাপ, কোনওটার ওয়ান লাইনার, কোনওটার ব্রডার স্টোরি তিনি লিখছেন। ফলত তাঁর ব্যস্ততা চূড়ান্ত। এবার দেখা যাচ্ছে আগামিকাল যেই মেগার টেলিকাস্ট রয়েছে সেই মেগার সিন লেখা তখন সেই লেখকের কাছে প্রায়োরিটি। এদিকে আমি আমার সিন শেষ করে ফ্লোরে অপেক্ষা করছি অথচ আমার পরের সিন এসে পৌঁছোয়নি। কারণ কোয়ার্ডিনেশনের অভাব এবং এত গুলো গল্প একা সামলাতে পারছেন না লেখক। অথচ তিনি ছাড়বেনও না। এই সব কিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত ঘাঁটা পরিবেশ টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে।

আপন খেয়ালে। ছবি পরিচালকের প্রফাইল থেকে।
আপন খেয়ালে। ছবি পরিচালকের প্রফাইল থেকে।

সেক্ষেত্রে ইপি বা প্রোডাকশনের দায়িত্বে যাঁরা রয়েছেন তাঁরা কী করছেন?

কোনও পরিচালক তো আর ম্যাজিশিয়ান নন, তাকে তো তাঁর সময়টা দিতে হবে। লেখক তাঁর এক্সিলেন্স বজায় রাখতে গিয়ে অনেকটা সময় ধরে লিখে যখন সিন পাঠাচ্ছেন তখন অলরেডি দেরি হয়ে গিয়েছে, তার মধ্যে হাতে রয়েছে দেড় ঘন্টা সময় তাহলে কেন ডিরেক্টর সিনটা শেষ করতে পারছেন না? ইপি বা প্রোডাকশনের দায়িত্বে যিনি রয়েছেন তাঁরা চ্যানেলকে বললেন, একটা ঘরেই তো ছোট  সিন, তাহলে বেশি সময় লাগবে না। এই ভুল বার্তায় তৈরি হচ্ছে অশান্তি। এই ভুল বার্তাটা যাঁরা দিচ্ছেন তাঁরা কাজ সম্পর্কে কিছুই জানেন না, অথচ বড় বড় সব পদ তৈরি হয়েছে তাঁদের জন্য। এবার বলি ভুলটা কোথায়?

হ্যাঁ একটা ঘরেই দুলাইনের ছোট সিন। ঘরটা অন্ধকার। একজন চরিত্র সেই অন্ধকার ঘরে ঢুকছে। এখানে অন্ধকারটা কিন্তু আলো দিয়েই তৈরি করতে হচ্ছে। কারণ আলোর কারসাজিতেই অন্ধকার এসটাবলিশ হয়। দুই নম্বর, চরিত্র একটা দেশলাই কাঠি জ্বালছে, সঙ্গে সঙ্গে আলো বদলে গেল। তিন নম্বর, আর একজন চরিত্র এসে একটা টর্চ জ্বালল, আবার আলোর টেক্সচার বদলে গেল। চার নম্বর, এরপর কারেন্ট ঠিক হতেই ঘরের বড় আলো জ্বলে উঠল। এই চার বার চার রকম আলো তৈরি করতে একেক বারের বিরতিতে ২০ মিনিট করে সময় লাগলে এখানেই তো এক ঘন্টা সময় লেগে যাচ্ছে। তাহলে বাকি সময়টুকুতে পুরো সিনটা শুট করা প্রায় অসম্ভব! এটা কে বুঝবে? লেখক তো দু'লাইনে তাঁর সমস্ত সৃজনশীল ভাবনা দিয়ে আলো আধাঁরির সিন লিখে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এই সিনের ব্যাপারে পরিচালকের সঙ্গে কোনও আলোচনাই তাঁর হয় নি। এবার? শুটটা তো তিনি করবেন না, তাই সব দোষ পরিচালকের!

কাজের মাঝে আনন্দ
কাজের মাঝে আনন্দ

এক্সিকিউশনের দায়িত্বে যাঁরা রয়েছেন তাঁরা যদি সামলাতে না পেরে ভুল বার্তা দেন তাহলে তো পরিচালকের জন্য তা মারাত্মক ক্ষতিকর!

এই গন্ডগোলগুলো তৈরি হচ্ছে সব জায়গায়। কিন্তু যাঁরা মাথার ওপর বসে রয়েছেন তাঁরা বুঝতেই চাইছেন না ডিরেক্টরের অসুবিধাটা কোথায়। চ্যানেল বুঝতে চাইছে না, লেখক পরিচালকের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ না করেই লিখে যাচ্ছেন। আর যাঁরা এক্সিকিউশনের দায়িত্বে রয়েছেন অর্থাৎ সংস্থার এক্সিকিউটিভ প্রডিউসাররা নিজের জায়গা সঠিক রাখার জন্য প্রডিউসারকে বলছেন যে ডিরেক্টর কাজ তুলে দিতে পারছেন না, ফুটেজ বাকি রয়েছে, লেফট ওভার থেকে গেল আজ! কিন্তু কেন লেফট ওভার থেকে গেল সেটা কেউ জানতে চাইছেন না!

ধরা যাক আমার কলটাইম সকাল ৬ বা ৭টায়। সেখানে আর্টিস্ট মেকআপ রুমে বসল সাড়ে আটটা বা পৌনে নটার সময়। কারণ ঘরটা স্যানিটাইজ করা হয় নি। তাই সে মেকআপে বসতে পারে নি, আর আমি তাঁকে প্রেসার দিতে পারি না কারণ সেফটি সিকিউরিটির ব্যাপার রয়েছে। এর ফলে দিনের শুরুতেই আড়াই তিন ঘন্টা চলে গেল, সেই টাইমটা কিন্তু দিনের শেষে পরিচালককে কেউ ফেরত দিতে পারে না। তখন পরিচালকের মাথায় হাত পড়ে যায়! কীভাবে শেষ করবেন আজকের কাজ? ফুটেজ তুলবেন কেমন করে? তার ওপর সেদিনের স্ক্রিপ্ট বা গল্পটা যেহেতু তাঁর হাতে থাকে না, তাই কিছু করার থাকে না। আগে থেকে গল্পটা জানলে প্ল্যান করা যায়, সেক্ষেত্রে কিছুটা টাইম ম্যানেজমেন্ট করা যায়, এখানে সেটাও অসম্ভব। এই ধরণের প্রচুর সমস্যা রোজ তৈরি হচ্ছে। এই অস্থিরতার মধ্যে আর যাই হোক শিল্প হয় না।

বন্ধ করুন