বাংলা নিউজ > বায়োস্কোপ > তোমার বৌকে নিয়ে ভেগে যাওয়ার তাল করছি! প্রিয় বন্ধু শীর্ষেন্দুকে বলেছিলেন বুদ্ধদেব
বুদ্ধদেব গুহ এবং শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। (ছবি সৌজন্যে - হিন্দুস্তান টাইমস)
বুদ্ধদেব গুহ এবং শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। (ছবি সৌজন্যে - হিন্দুস্তান টাইমস)

তোমার বৌকে নিয়ে ভেগে যাওয়ার তাল করছি! প্রিয় বন্ধু শীর্ষেন্দুকে বলেছিলেন বুদ্ধদেব

  • রবিবার রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ বেলভিউ হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছেন সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ।প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুতে স্মৃতি হাতড়ালেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। 

রবিবার রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ বেলভিউ হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছেন সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ। বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। গত এপ্রিলে করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বুদ্ধদেব। সেবারও রটেছিল মৃত্যুর গুজব। সেসব ফুৎকারে উড়িয়ে সংবাদমাধ্যমকে মজা করে জানিয়েছিলেন, তিনি এখনও শেষ হননি। অনেকদিন বাঁচবেন। তবে করোনা জয় করে ফিরলেও পুরোপুরি সুস্থতা যেভাবে কখনও ফিরে আসেনি। বয়সজনিত নানান সমস্যার মধ্যে দেখা দিয়েছিল শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা ও মূত্রনালীতে সংক্ৰমণ। কিছুদিন আগে ফের ভর্তি হয়েছিলেন হাসপাতালে। রবিবার রাতে থামল লড়াই। না ফেরার দেশে পা বাড়ালেন 'ঋজুদা'-র স্রষ্টা।

বুদ্ধদেববাবুর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বাংলার সাহিত্যমহল। প্রবীণ থেকে নবীন বাংলার প্রায় সব সাহিত্যিকেরই পছন্দের লেখকের তালিকায় একেবারে উঁচুর দিকেই তাঁর অবস্থান। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মতো যশস্বী সাহিত্যিকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধুই সাহিত্য বন্ধুর ছিল না। ছিল আত্মিক। দু'জনে প্রায় সমবয়সী। শীর্ষেন্দুবাবুর কথায়, 'লালা আমার থেকে মাস সাতেকের ছোট ছিল'। রবিবার রাতে প্রায় ৬০ বছরের বন্ধুত্বে দাঁড়ি পড়ার পর হিন্দুস্তান টাইমসকে ফোনের ওপার থেকে নিজের মনোভাব জানালেন 'দূরবীন', 'মানবজমিন'-এর স্রষ্টা। মনোভাব না বলে একে বন্ধুর স্মৃতিচারণ করাই ভালো। বুদ্ধদেব বাবুর কথা বলতে বলতে লেখকের গলা থেকে কখনও হাসি কখনও বা মনখারাপ ভেসে এল ফোনের এপারে।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ' আমি ওকে লালা বলেই ডাকতাম। ৬০ বছরের ওপর ওঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক। আমার বন্ধুদের মধ্যে সবথেকে উজ্জ্বল ছিল ও। অত্যন্ত সুপুরুষ। চেহারা বললে চেহারা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, গুণ। তার ওপর দুর্দান্ত স্পোর্টসম্যান, ভালো শিকারি আবার সফল চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। ভুলে চলবে না তাঁর গানের কথাও। কী দারুণ গাইত। আর কী সেন্স অফ হিউমার! অনবদ্য! আমাদের বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে দাঁড়ালে পরে আমরা সবাই ঘাবড়ে যেতাম। সামাজিক ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান ছিল আমার থেকে কয়েক ধাপ উঁচুতে। তবে সেসব সে একদিনের জন্যেও বুঝতে দেয়নি। দিলখোলা ভাবে মিশতো। আড্ডা দিত খুব, হা হা করে হাসতে পারত। কোনওদিনও ওঁর মধ্যে এক ফোঁটা অহংকার দেখিনি'

সামান্য থেমে আরও বললেন বুদ্ধদেববাবু খুব খেতে ভালোবাসতেন। যাকে বলে অসম্ভব ফুডি। মাঝেমধ্যেই আমার কাছে বায়না করত, 'তোমার বাড়ির পিঠে খাবো। পাটিসাপ্টা খাবো'। 'যাও পাখি'-র লেখকের কথায়, 'কতবার লালাকে বলেছি শরীরে মেদ জমছে। খাওয়াটা একটু কমাও। এত সুন্দর টানটান চেহারা তোমার। তা সেসব শোনেনি কোনওদিন। শুধু বলতো খেতে খুব ভালোবাসি আর কী করা যাবে। ছাড়ো তো! তো আমার বাড়িতে বার চারেক এসে জমিয়ে পিঠে খেয়েছে। হাঁফাতে হাঁফাতে আসত। মোটা মানুষ তো। এসেই ফ্যান চালিয়ে দিত। ওই পৌষ মাসের ঠান্ডা তার ওপর ফ্যান। আমরা তো ঠকঠক করে কাঁপছি। ওইরকম ছিল ও। নিজের মতো '।

সামান্য থেমে বললেন বুদ্ধদেব গুহ-র রসবোধের কথা। সে লেখায় হোক কিংবা ব্যক্তিগত আড্ডায়। ওঁর শিকার এবং ছোট ছোট মজার গল্প শীর্ষেন্দুবাবুর যে খুবই প্রিয় তাও জানালেন। 'বৈঠকি মেজাজ, হৈ হুল্লোড় সেসব আর..... যেখানে যেত জমিয়ে দিত। এত ভালো কথা বলতে পারত। আমি তো বলতাম তোমার সিকিভাগ গুণ পেলে বর্তে যেতাম। তা একবার হয়েছে কী প্রথমবার যেবার আনন্দ পুরস্কার পেলাম সেবার পার্ক হোটেলে অনুষ্ঠান। আমি তো চলে গেলাম অন্য জায়গা থেকে। আমার স্ত্রীকে বাড়ি থেকে গাড়িতে করে নিয়ে সেখানে আসার কথা একজন বন্ধুর। এদিকে অনুষ্ঠান শেষে মঞ্চ থেকে নেমে দেখি সামনের সারির আসনে আমার স্ত্রীয়ের পাশে বসে রয়েছে লালা। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম তোমরা এখানে কী করে ? অত লোকের মাঝে লালা এক গাল হেসে ওরকম জোরালো গলায় বলে উঠল, 'তোমার বৌকে নিয়ে ভেগে যাওয়ার তাল করছি!' এইরকম ছিল ও'।

কথা শেষে সামান্য থেমে থেমে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বললেন,'কাছের মানুষগুলো সব একে একে চলে যাচ্ছে। লালা।..লালাকে মিস করব। জানি না আর কী বলব। বলা উচিত'। কথা শেষে লেখকের গলা থেকে তখন চুইয়ে পড়ছে আক্ষেপ, টুকরো টুকরো দুঃখ।

বন্ধ করুন