ইরফান খান এবং সৌমেন হাজারী। ছবি ইনস্টাগ্রাম।
ইরফান খান এবং সৌমেন হাজারী। ছবি ইনস্টাগ্রাম।

ইরফানের সঙ্গে কাজের দিনগুলি,স্মৃতিকথায় সঙ্গীত পরিচালক সৌমেন হজারী...

'ইরফান স্যার, আপনাকে সারা জীবন সংগ্রহ করে রাখব মনের মণিকোঠায়। আমার প্রত্যেকটা সঙ্গীত সৃষ্টির মধ্যে দিয়েই অজীবন শ্রদ্ধা জানাব আপনাকে।' ইরফান খানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা HT Bangla-র সঙ্গে ভাগ করে নিলেন টলিউডের সঙ্গীত পরিচালক এবং গায়ক সৌমেন হাজারী...

প্রথমেই বলব একজন স্রষ্টার কখনও মৃত্যু হয় না। ইরফান খান একজন মহান স্রষ্টা, এবং ক্ষণজন্মা। সবার ওপরে একজন সত্যিকারের মানুষ।

সেই সময় মুম্বইয়ের বিখ্যাত বাঙালি পরিচালক প্রদীপ সরকার তাঁর একটি দীর্ঘ বিজ্ঞাপনের জন্য সারা ভারত থেকে বিভিন্ন অভিনেতাদের সংগ্রহ করছেন। বিজ্ঞাপনটিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করবেন ইরফান খান। বিষয় এই রকম, ইরফান খান ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই যাচ্ছেন, সেখানকার লোকজন এবং কালচারের সঙ্গে একাত্ম হচ্ছেন। এই সবের মধ্যে দিয়ে প্রচার হচ্ছে বিজ্ঞাপনের মূল বক্তব্য। আমি তখন ই-টিভিতে একটি ননফিকশন সঞ্চালনা করি। একদিন সকালে আমার কাছে ফোন আসে যে আমি নাকি এই অ্যাড ফিল্মটার জন্য সিলেক্ট হয়েছি। প্রথমে শুনে বিশ্বাস করিনি, ভাবলাম বন্ধুরা হয়ত মজা করে ফোন করছে! আর ভাবব নাই বা কেন? টলিউডে এত অ্যাক্টর থাকতে আমি কেন! তাও আবার ইরফান খানের সঙ্গে! ইয়ার্কি হচ্ছে!! আমি তো সখে অভিনয়, অ্যাঙ্কারিং করি। আসলে গান আমার নেশা এবং প্যাশন। মন দিয়ে কেবল গান গাইব আর কম্পোজ করব, তাই কিছু দিন আগে সেন্ট্রালের চাকরি ছেড়ে টলিউডে লড়াই শুরু করেছি। নিজের মধ্যে বেশ একটা বিপ্লবী বিপ্লবী ভাব সেই সময়। এদিকে পকেট গড়ের মাঠ! কিন্তু নিজের গানকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে লড়তে হবে। আর যাই করি, হরবোলা আর্টিস্ট হব না। নিজের গানই গাইব। ভার্জিন কম্পোজিশন তৈরি করব। নিজের স্বপ্ন এবং জেদকে বাঁচাতে গেলে রোজগার চাই। তাই জন্য বন্ধু-বান্ধব ডাকলেই অভিনয় করতে ছুটে যাই। এই ভাবেই চলছিল।

মুম্বইয়ের ফোনের ব্যপারটা প্রথমে পাত্তাই দিইনি। কয়েকদিন পর আবার ফোন আসে, তখন বুঝলাম বিষয়টার গুরুত্ব। কিছুদিন আগে টেলিভিশনে একটা ননফিকশন হত ‘আই লাফ ইউ’ বলে। ওখানে আমার অভিনয় দেখে আমাকে সিলেক্ট করা হয়েছে বলে জানতে পারি। ইরফান খান সেই সময় অলরেডি স্টার। তাঁর সঙ্গে কাজ করব এটা ভেবেই রাতের ঘুম উধাও। শুরু হল টেনশন, অত বড় মাপের একজন অভিনেতা, তাঁর সঙ্গে কীভাবে কাজ করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

অবশেষে শ্যুটিং শুরু হল। প্রথম দিন মেক-আপ করে আমরা রেডি। ইরফান খান এলেন। আলাপ হল আমাদের সঙ্গে। এরপর যেটা করলেন সেটা মনে থাকবে সারা জীবন। আমার কাছে এসে জানতে চাইলেন বিড়ি আছে কিনা? আমি একটু ইতস্তত করে জবাব দিলাম, বিড়ি তো নেই দাদা, কিন্তু সিগারেট আছে, চলবে? ইরফান মুখ ব্যাজার করে বললেন, আচ্ছা তাই দাও। তবে বিড়িই আমার ফেভারিট। আমিও উত্তর দিলাম, আগে জানলে বিড়ি নিয়ে আসতাম। এবার থেকে মনে রাখব। ব্যস, জমে উঠল আড্ডা। কত গল্প, ওঁর জীবনের নানা ওঠা-পড়ার কথা। ওঁর অভিনয় জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা, বিভিন্ন বিষয়ে আড্ডা দিতে লাগলেন। একটা সময় মনে হল যেন বহু কালের চেনা একজন মানুষ! কখন যে সম্পর্কটা জলের মতো সহজ হয়ে গিয়েছে বুঝতেই পারিনি। এরপর যখন শট দিতে গেলাম তখন মনে হল যেন বহু পরিচিত কোনও সিনিয়র দাদার সঙ্গে একই মঞ্চে অভিনয় করছি। সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম ইরফান খান কত বড় মাপের একজন মানুষ। যাতে আমি ভয় না পাই, এবং সাবলীল ভাবে অভিনয় করতে পারি তাই তিনি গল্প করে, আড্ডা মেরে আমাদের সম্পর্কটাকে সহজ করে নিয়েছিলেন।

আমাদের শুটিং লোকেশন ছিল হাওড়া ফুলবাজার। যথেষ্ট জনবহুল একটি এলাকা। ওখানে খবর রটে গিয়েছিল, ইরফান খান আসছেন শুটিং করতে। ইউনিটের সবাই বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন ক্রাউড নিয়ে। লোকেশনে ইউনিট পৌঁছোতেই একটু একটু করে লোক জমতে শুরু করে। সবাই ভাবছে এই হয়ত ইরফান এসে পড়বেন। এদিকে ইরফান ইউনিটের সাধারণ একজন মেম্বারের মতো সবার সঙ্গে মিশে এলাকায় নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। কেউ কেউ দু’একবার সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকালেও তাঁরা ভাবতেই পারেননি একজন স্টার এই ভাবে ঘুরে বেড়াবেন! তাঁরা ইরফানকে ইউনিটের সদস্য ভেবে তাঁর ওপর থেকে নজর সরিয়ে নেয়। সেদিন আমরা অবাক হয়ে দেখলাম ওঁর লাইভ পারফর্ম্যান্স। কোনটা যে ওঁর বাস্তব আর কোনটা যে ওঁর অভিনয় বুঝতে পারিনি। ইরফানের অভিনয় ক্ষমতা ঈশ্বর প্রদত্ব। আরও একটা কথা বার বার বলব, এত ভালো একজন মানুষ ছিলেন বলেই বোধহয় একজন এত বড় মাপের অভিনেতা হতে পেরেছিলেন। যদি ঈশ্বর-আল্লহদের হাতে জন্ম-মৃত্যু লেখা থাকে, তা হলে আজ তাঁদের ক্ষমা করতে পারলাম না।

বন্ধ করুন