বাংলা নিউজ > বায়োস্কোপ > কণ্ঠ দিয়ে নয়, গান গাইতে হয় অন্তর দিয়ে, এ কথা উনিই প্রথম বুঝিয়েছিলেন
নির্মলার প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সংগীত জগৎ।

কণ্ঠ দিয়ে নয়, গান গাইতে হয় অন্তর দিয়ে, এ কথা উনিই প্রথম বুঝিয়েছিলেন

  • নির্মলাদির মন ছিল আকাশের মতো উদার। তাই বোধ হয় শিল্পী হিসেবেও এত সফল হয়েছিলেন। গান যে আসলে কণ্ঠ থেকে না, অন্তর থেকে গাইতে হয়,তা উনিই প্রথম বুঝিয়েছিলেন।

জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়


নির্মলাদি আর নেই। ভাবতে পারছি না। ভাবতে চাইছিও না বোধ হয়। সেই শৈশব থেকে যে মানুষটিকে দেখলাম, যাঁর সান্নিধ্যে বেড়ে উঠলাম, তাঁর রেখে যাওয়া এই শূন্যতা পূরণ হবে কী করে! উত্তর হাতড়াতে গিয়েই মুখোমুখি হলাম আরও এক প্রশ্নের— নিছক মৃত্যু কি এমন শিল্পীকে কেড়ে নিতে পারে? পারে না, কখনওই পারে না!

প্রথম থেকেই ওঁকে নির্মলাদি বলে ডাকতাম। তবে সম্পর্কে উনি আমার পিসি ছিলেন। আমার বাবা দীর্ঘ দিন ওঁর সঙ্গে কাজ করেছেন। সেই সূত্রেই আমাদের আলাপ। কিন্তু সংগীতজগতে আগাগোড়াই দাদা-দিদি ডাকের চল। তাই আর ওঁকে 'পিসি' সম্বোধন করা হয়ে ওঠেনি।

মায়াভরা একটা হাসি লেগে থাকত মানুষটার মুখে। এত সারল্য, এত মাধুর্য! এ সবই তো খুব বিরল। তাই বোধ হয় নির্মলাদি সকলের থেকে আলাদা ছিলেন। সবাইকে কাছে টেনে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর। অনায়াসে ভালোবাসতে পারতেন। আমাকেও খুব স্নেহ করতেন। হাসিঠাট্টা, খুনসুটি লেগেই থাকত! সেই দিনগুলো আজ নতুন করে মনে পড়ে যাচ্ছে।

শিল্পী হিসেবে নির্মলাদি কতটা উচ্চ মানের, তা আলাদা করে বলে দিতে হয় না। ওঁকে যতই দেখেছি, অবাক হয়েছি। এত বছর পরেও 'এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না' শুনে এক অদ্ভুত মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকি। একমাত্র নির্মলাদির কণ্ঠেই হতাশাও এমন সুন্দর রূপ পেতে পারে। এমনটা শুধু তাঁর পক্ষেই সম্ভব! ওই মানুষটিই বুঝিয়েছিলেন, গান-বাজনা করলে শব্দের উচ্চারণ নিয়েও মনোযোগী হতে হয়। যে কোনও গানকে অন্য মাত্রা দেওয়ার এক বিশেষ ক্ষমতা ছিল ওঁর।

নির্মলাদির থেকে গানের 'অ-আ-ক-খ' জেনেছি। কত কিছুই না শিখিয়েছেন আমাকে! এক সময়ে ওঁর সঙ্গে রেডিয়ো এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সঙ্গত করতাম। উনি কী ভাবে গাইছেন, সুরটাকে কী ভাবে অলংকার দিচ্ছেন— সব কিছুই মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতাম। শেখার চেষ্টা করতাম। কী সুন্দর হারমোনিয়াম বাজাতেন! গান আর বাজনার মধ্যে অসাধারণ ভারসাম্য! হাত চলছে হাতের মতো। আবার তারই সঙ্গে গানও গেয়ে চলেছেন। তাঁর থেকে অনেক কিছু শেখার আছে এই প্রজন্মের।

নির্মলাদির মন ছিল আকাশের মতোই উদার। তাই বোধ হয় শিল্পী হিসেবেও এত সফল হয়েছিলেন। গান যে আসলে কণ্ঠ থেকে না, অন্তর থেকে গাইতে হয়,তা উনিই প্রথম বুঝিয়েছিলেন। তাঁর অন্তরের মায়ায় লালিত গান আগলে রাখার দায়িত্ব আমাদের।

পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে নির্মলাদি এখন অন্য সুরলোকে। সেখানে হয়তো এমন ঝিনুক খুঁজে পাবেন, যেখানে মুক্ত আছে। আর আমাদের কাছে থাকবে তাঁর স্মৃতি। থেকে যাবেন তিনিও। তাঁর সুরের মায়ায়। সৃষ্টির আলোতে।

বন্ধ করুন