বাংলা নিউজ > বায়োস্কোপ > পরমব্রতর 'অভিযান'-এ উঠে এল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনছবি
অভিযান ছবির একটি দৃশ্য

পরমব্রতর 'অভিযান'-এ উঠে এল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনছবি

  • সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন কাহিনি বুনতে গিয়ে আশ্চর্য ছবি এঁকেছেন পরমব্রত। অভিনয়ে যাদের আগ্রহ আছে কিংবা পরিচালক হওয়ার ইচ্ছে আছে, তাদের অনেক কিছু শেখাবে অভিযান ছবিটি।

অরুণাভ রাহারায়

সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের 'অভিযান'। কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন নির্ভর ছবি। তাঁর অভিনয় জীবন ছাড়াও, নাট্যজীবন, কবিতাজীবন ও ব্যক্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে খুঁজে পাওয়া যায় এই ছবিতে। পরিচালক পরমব্রতর মেধাবী চিন্তার ভেতর দিয়ে ক্যানভাসে উঠে এসেছে প্রবীন অভিনেতার জীবনচিত্র। ২ ঘণ্টা ২০ মিনিটের ছবিটিতে আছেন সৌমিত্র নিজেই। আর কম বয়সি সৌমিত্র ওরফে পুলুর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন যিশু সেনগুপ্ত। মেয়ে পৌলোমী বসুর ভূমিকায় সোহিনী সেনগুপ্ত। পরিচালকও অভিনয় করেছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে।

ছবিতে দেখা যায় কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতায় আসা এক যুবকের স্ট্রাগল। পুরনো কলকাতার অলিগলি। ফ্ল্যাশব্যাকে গল্প বলেন প্রবীন অভিনেতা। তাতে ভর করেই গল্প এগিয়ে চলে আর সময় পিছিয়ে যায় চল্লিশের দশকে। দেশভাগ পূর্ববর্তী সময়ে। পুলু তখন এমএ-র ছাত্র। দুচোখে অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন। কফিহাউসে প্রায়ই আড্ডা হয় শক্তি-সুনীল-সন্দীপনদের সঙ্গে। ক্রমেই ছড়িয়ে পড়েন বাম রাজনীতির সঙ্গে। প্রথম জীবনে শিশির ভাদুড়ীর কাছে অভিনয়ের হাতেখড়ি। শিশির ভাদুড়ীর ভূমিকায় অসামান্য অভিনয় করেছেন দেবশংকর হালদার। গিরিশ চন্দ্র ঘোষের 'প্রফুল্ল' নাটকে সুরেশের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ। যুবক পুলুর মন যেন গঠন করে দিয়েছিলেন শিশির ভাদুড়ী। এরপর নিজেদের নাট্যদল 'ছায়ানট' গড়ে ওঠে।

এরইমধ্যে বন্ধু নিত্যান্দর হাত ধরে একদিন সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে যাওয়া। সত্যজিৎ তখন লিখছিলেন। এমন সময় মুখোমুখি সৌমিত্র। তাঁকে দেখে সত্যজিতের প্রথম বাক্য-- 'এহে! আপনি তো একটু লম্বা হয়ে গেলেন!' এটাই বোধ হয় এই ছবির সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দৃশ্য! তখনই অবশ্য ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ল না পুলুর। মুক্তি পেল অপরাজিত। অন্যদিকে প্রেমে পড়েছেন সৌমিত্র। ছবিতে তাঁর প্রেমিকা তথা স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়। একদিন ময়দানের গাছতলায় শক্তি-সুনীল-সন্দীপনদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় মানিকদার তলব। তিনি বাড়িতে ডেকে বললেন তাঁর পরবর্তী ছবি অপুর সংসারের জন্য সৌমিত্রকেই ভাবছেন তিনি।

শুটিংয়ের সেটে ছবি বিশ্বাসের (দুলাল লাহিড়ী) সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন সত্যজিৎ। শুরু হল নতুন যাত্রা। বদলে যেতে থাকল সৌমিত্রর জীবন। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সত্যজিৎ রায় ছাড়াও নানা পরিচালকের ছবিতে কাজ পেলেন সৌমিত্র। এরপর একে একে মুক্তি পেল যদি জানতেম, চারুলতা, আকাশ কুসুম, তিন কন্যা ইত্যাদি। মুহূর্তের ফ্ল্যাশব্যেকে সাদাকালো পর্দায় ফিরে যেতে হয় দর্শককে। যিশু সেনগুপ্তর অভিনয়ে উঠে আসেন কম বয়সের সৌমিত্র। বিশেষ করে অরণ্যের দিনরাত্রি ছবির মেমরি গেম খেলার দৃশ্য এবং সোনার কেল্লায় জটায়ুর সঙ্গে ট্রেনে ফেলুদার সাক্ষাতের দৃশ্য দুটি অভূতপূর্ব। পরিচালকের মুন্সিয়ানা এখানে লক্ষ্য করার মতো।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন কাহিনি বুনতে গিয়ে আশ্চর্য ছবি এঁকেছেন পরমব্রত। অভিনয়ে যাদের আগ্রহ আছে কিংবা পরিচালক হওয়ার ইচ্ছে আছে তাদের অনেক কিছু শেখাবে অভিযান ছবিটি। যেমন ধূর্ত চরিত্রে অভিনয়ের শেষে একটা ধূর্ত হাসির দরকার নেই। হাসিটা আড়ালের মধ্যেই দিয়েই যেন প্রকাশ পাবে ধূর্ত স্বাভাব। প্রিয় মানিকদার কাছ থেকে এই শিক্ষাই পেয়েছিলেন সৌমিত্র, যা তিনি শিখিয়ে গিয়েছেন উত্তরাধিকারকে। কিংবা শুটিংয়ের সময় যে মনোযোগ রক্ষার জন্য কলো কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে রাখতেন সত্যজিৎ-- এ ছবিতে সেটাও সূক্ষ্ম ভাবে তুলে ধরা আছে।

উত্তমকুমার থেকে সুচিত্রা সেন, রবীন মজুমদার থেকে রবি ঘোষ, শর্মিলা ঠাকুর থেকে অপর্ণা সেন-- এক জীবনে যেন অনেক জীবনের সঙ্গ পেয়েছেন অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোয়াপধ্যায়। একসময় কম বয়সের প্রেম কবিতা লেখায় মন দেন। সাহিত্য পত্রিকা এক্ষণ প্রাকাশ পায়। লেটারিং করে দেন সত্যজিৎ রায় স্বয়ং। সব মিলিয়ে প্রশংসাযোগ্য ছবি অভিযান। পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের কাছে আগামী দিনে দর্শকের আশা বেড়ে গেল।

বন্ধ করুন