কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (ছবি-সংগৃহীত) 
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (ছবি-সংগৃহীত) 

কবি পক্ষ…গুরু রবীন্দ্রনাথ, শিষ্য হরিচরণ, সৃষ্টির নাম বঙ্গীয় শব্দকোষ

দ্বিজেন ঠাকুর তো মজা করে ছড়াই বেধে ফেলেছিলেন। ' কোথা গো মেরে রয়েছো তলে / হরিচরণ, কোন গরতে? বুঝেছি , শব্ দ - অবধি জলে / মুঠাচ্ছ খুব অরথো।' হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, তিনি বাংলা ভাষার অহঙ্কার এবং রবীন্দ্রনাথের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই কথায় আজ রবীন্দ্র অনুরাগী ইন্দিরা চক্রবর্তী।

হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়ের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা 'বঙ্গীয় শব্দকোষ'। হরিচরণের জ্ঞানচর্চায় আগ্রহ লক্ষ্য করে রবীন্দ্রনাথ তাকে শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয়ে সংস্কৃতের শিক্ষক নিয়োগ করেন। 

কোনও বৈশাখে শান্তিনিকেতনের আকাশ, মেঘের পরে মেঘ জমে ঘন অন্ধকার দুপুরবেলাতেই। বৃষ্টি নেই,শুধু ঘন ঘন ব্জ্রপাত। রবীন্দ্র নাথ জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে, সেখান থেকেই দেখা যাচ্ছে একটি খড়ের চালের কুঁড়েঘড়। বাজ পড়ল সেই খড়ের চালে। জ্বলে উঠল আগুন। আতঙ্কে রবীন্দ্রনাথ চিৎকার করে উঠলেন, ওরে তোরা ছুটে যা,হরিচরণের বাড়ীতে বাজ পড়েছে। দ্যাখ,তাঁর কিছু হল কিনা!

অচিরেই খবর এল রবীন্দ্রনাথের কাছে - হরিচরণ লিখছেন। কোন ক্ষতি হয়নি। অবাক কান্ড, হরিচরণ খেয়ালও করেন নি তার বাড়ীতে আগুন লেগেছে! আশ্রমের ছেলেরাই সেই আগুন নেভাল। তারপর তো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। এই মগ্ন সাধকের সময় নষ্ট করবার কোন সময় নেই। একা পেরিয়েছেন আলোকবর্ষ দূরের পথ।

হরিচরণকে একদিন ডেকে পাঠালেন রবীন্দ্রনাথ।

--' শোন হরিচরণ। আমার একটি নির্দেশ পালন করতে হবে তোমাকে। তুমি একটি 'সংস্কৃত' প্রবেশ রচনা করো। আমি তোমাকে একটি পাণ্ডুলিপি দেব। সেই পাণ্ডু লিপির প্রণালী অনুসারেই তুমি 'সংস্কৃত প্রবেশ লিখবে। হরিচরণ তা-ই করতে লাগলেন। কাজ যখন এগিয়ে গিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ বললেন, হরিচরণ তুমি বাংলাভাষায় একটি অভিধান লেখো - যেমন অভিধান কেউ লেখেননি।

'সংস্কৃত প্রবেশ তিন খন্ডে শেষ করেন হরিচরণ। শুরু করলেন বঙ্গীয় শব্দকোষ। এই কাজে নেই কোনও অর্থ সাহায্য। নেই কোন সহকারী। তাঁকে একাই এই মহাসমুদ্র লঙ্ঘন করতেই হবে!

অমূল্য পত্র (সৌজন্য-গুগল)
অমূল্য পত্র (সৌজন্য-গুগল)

 সুনীতি কুমারের স্মৃতিতে এই 'ক্ষীণপ্রায় ব্রাহ্মণের ' মেধার ছবিটা এই রকম---

যখনই হরিচরণের বাড়ীতে যাইতাম, দেখিতাম লন্ঠনের আলোয় খড়ের চালাঘরে তক্তপোষের উপর ডাই করে রাখা উর্দু,পার্সি, ইংরেজি, ওড়িয়া, মারাঠি সহ বিভিন্ন ভাষার অভিধানের মাঝে তিনি মাথা নীচু করে কাজ করে চলেছেন। তাকে প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। নিদারুণ অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কাজ।

হরিচরণ কে দেবার মত অর্থ তখন রবীন্দ্রনাথের কাছে ছিলনা। তিনি গেলেন কাশিমবাজারের মহারাজ মনীন্দ্রচন্দ্রের কাছে। রাজা মনীন্দ্রচন্দ্র হরিচরণ কে জিজ্ঞেস করলেন -কতদিন লাগবে এই অভিধান শেষ করতে?

-- অন্তত ন'বছর

-- কাজ চালিয়ে যান।আমি মাসে পঞ্চাশ টাকা বৃত্তি দিতে প্রতিশ্রুত হলাম।

অভিধান তৈরির সময় হরিচরণের শ্রম, নিষ্ঠার কাহিনী যে কি বিচিত্র সুরঞ্জন ঘোষ একটি লেখায় তার বর্ণনা দিয়েছেন। 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' গুরু দক্ষিণা হিসাবে রবীন্দ্রনাথ কে অর্পণ করেছিলেন।

প্রায় চল্লিশ বছরের সাধনা, পাঁচ খন্ডে সম্পূর্ণ হয়ে প্রকাশিত হল 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' বিশ্বভারতী থেকে।।

হরিচরণের মনে কোনও আনন্দ নেই -- মনের মধ্যে ডুব দিলেন হরিচরণ মনে পড়ে গেল বৃত্তি মেলার পর আবেগে রবীন্দ্রনাথের পা জড়িয়ে ধরেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের মৃদু প্রতিক্রিয়া স্থির হও, আমি কেবল কর্তব্যই করেছি।।

আজ শুধুই বুকের ভেতর হাহাকার। সিদ্ধি লাভের শেষে সব ফাঁকা! নেই রবীন্দ্রনাথ, কাকে প্রণাম করে হাতে তুলে দেবেন তার বহু সাধনার ধন। যেদিন শেষ হল 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' সেদিন ছিল তাঁর কান্নার দিন।

ওগো আমার প্রাণের ঠাকুর আমার এই দুর্বল চোখ দুটি আপনাকেই খুঁজে চলেছে। স্মৃতিতে জ্বল জ্বল করে উঠল, রবীন্দ্র নাথ অভিনীত 'বাল্মীকি প্রতিভা' আজ এই বুড়ো বয়েস পর্যন্ত হরিচরণ ভুলতে পারেন নি দস্যুবেশী সেই ছবিটা। বয়েস যত বেড়েছে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য তাকে মধুর শান্তি দিয়েছে.. বিষাদেও শান্তি আছে আছে প্রশান্তি।

ইন্দিরা চক্রবর্তী
ইন্দিরা চক্রবর্তী
বন্ধ করুন