শ্রীলঙ্কার মিনি শান্তিনিকেতন, শ্রীপালি ইউনিভার্সিটি, ছবি ফেসবুক
শ্রীলঙ্কার মিনি শান্তিনিকেতন, শ্রীপালি ইউনিভার্সিটি, ছবি ফেসবুক

উইলমটের সিঙ্ঘলে রবীন্দ্রনাথের আশ্রম… সুদূর শ্রীলঙ্কা হতে চাঁদনি কস্তুরি

শ্রীলঙ্কায় রয়েছে মিনি শান্তিনিকেতন। সে দেশের সরকারি স্কুলে নিয়ম করে পড়ানো হয় রবীন্দ্রনাথ। গুরুদেব ক্যান্ডি ডান্সের প্রেমে পড়ে শান্তিদেবকে শ্রীলঙ্কা ঠিয়েছিলেন ক্যান্ডি ডান্স শিখতে। এমন অনেক অজানা গল্প নিয়ে শ্রীলঙ্কার নৃত্যশিল্পী চাঁদনি কস্তুরি আরাচ্চি মুখোমুখি HT Bangla-র।

সেই সময় কিন্তু সমুদ্র পথে বিদেশ যাওয়াটা এত সহজ ছিল না। তবুও গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ তিনবার শ্রীলঙ্কা এসেছিলেন, শ্রীলঙ্কার সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েই। প্রথম যখন তিনি শ্রীলঙ্কা আসেন তখন তাঁকে ঘিরে বেশ কিছু অনুষ্ঠান ও সেমিনার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অসাধারণ ভাষণ দেন। সেই সেমিনারে উইলমট এ পেরেরা উপস্থিত ছিলেন তাঁর বাবার সঙ্গে। পেরেরা ততকালীন শ্রীলঙ্কার অন্যতম ধনী পরিবারের সন্তান, বয়স মোটে ১৭। তখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি আগামী দিনে কীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। গুরুদেবের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ভারতে চলে আসেন। মূলত রবীন্দ্রনাথের কর্ম দর্শন তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। পেরেরা সামনে থেকে রবীন্দ্রনাথকে জানতে চেয়েছিলেন।

তখন আশ্রমের বিভিন্ন কাজ ও বিশ্বভারতীর নির্মান কার্জের জন্য অনেক অর্থ দরকার। গুরুদেব সেই অর্থ সংগ্রহ করছেন বিভিন্ন উপায়ে। উইলমট এ পেরেরা সেই কথা জানার পর এই বিষয়টি নিয়ে শ্রীলঙ্কার সাংস্কৃতিক জগতের মানুষদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে একটি বড় অনুষ্ঠান আয়োজন করেন শ্রীলঙ্কায়। উদ্যেশ্য, এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যে অর্থ রোজগার হবে সেই অর্থ রবীন্দ্রনাথের হাতে তুলে দেওয়া। গুরুদেব শান্তিনিকেতন থেকে নাচ গানের দল নিয়ে গুরুদেব শ্রীলঙ্কা পাড়ি দেন। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় নৃত্যনাট্য ‘তাসের দেশ’। অসম্ভব জনপ্রিয় হয় সেই তাসের দেশ। ওখানকার শিল্পী মহল তো বটেই পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার ক্ষমতাবান ধনী মানুষজনও সাধ্য অনুসারে গুরুদেবের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে সেন। এইভাবেই দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ত্বের স্পম্পর্ক। শ্রীলঙ্কা থেকে দলে দলে ছেলেমেয়ে আসতে থাকে বিশ্বভারতীতে। শুরু হয় সংস্কৃতির আদানপ্রদান। সেই ধারা কিন্তু আজও অব্যাহত।

 

রবীন্দ্রনাথ এবং উইলমট, ছবি গুগল।
রবীন্দ্রনাথ এবং উইলমট, ছবি গুগল।

১৯৮৯ সালে আমি শান্তিনিকেতনে পড়তে আসি। ছোটবেলা থেকে স্কুলে রবীন্দ্রনাথ পড়ে বড় হয়েছি। আমাদের দেশের সরকারি স্কুলে নিয়ম করে রবীন্দ্রনাথ পড়ানো হয়। বাড়িতে সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ পেয়েছিলাম বলে মনে ইচ্ছে জন্মেছিল শান্তিনিকেতনে পড়তে আসার। শান্তিনিকেতনের ছাত্রজীবনে আবার নতুন করে অনুভব করলাম গুরুদেবকে। আমার শিক্ষা জীবনে তো বটেই, আজ এবং ভবিষ্যতেও সেই মধুর অনুভূতিকে সংগ্রহ করে একটু একটু প্রতিদিন নিজেকে সমৃদ্ধ করে যাওয়া। অনেকটা ওই গানটার মতো, ‘মধুর তোমার শেষ যে না পাই……!

ক্যান্ডি ডান্স। শিল্পি চাঁদনী কস্তুরি আরাচ্চি।
ক্যান্ডি ডান্স। শিল্পি চাঁদনী কস্তুরি আরাচ্চি।

শেষবার যখন শ্রীলঙ্কা এলেন রবীন্দ্রনাথ তখন এখানে শান্তিনিকেতন আশ্রমের আদর্শে তৈরি হতে চলেছে ‘শ্রীপালি’। গুরুদেব নিজে হাতে ভিত্তিস্থাপন করেন শ্রীপালির। সেই সময় শান্তিনিকেতন থেকে অনেক গুণী মানুষ শ্রীলঙ্কায় আসেন। এখানে বেশ কিছুদিন থাকেন এবং তাঁরা  শান্তিনিকেতন স্টাইলের নাচ ও গান  শেখান শ্রীলঙ্কার মানুষদের। আবার নিজেরাও শেখেন আমাদের দেশের নাচ,গান ডান্সড্রামা। সেই সময় গুরুদেব আমাদের ক্যান্ডি ডান্সের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ঠিক করেন এই নাচের স্টাইল তিনি শান্তিনিকেতনের নাচের ধারায় যুক্ত করবেন। সেই কথা মত শান্তিদেব ঘোষ মহাশয়কে শ্রীলঙ্কা পাঠান ক্যান্ডি ডান্সের প্রশিক্ষণ নিতে। শান্তিদেব ঘোষ অনেকটা সময় আমাদের দেশে থেকে এই নাচ আয়ত্ব করে ফিরে যান আশ্রমে। সেখানকার ছেলেমেয়েরা তাঁর কাছে থেকে এই নাচ শিখে তা প্রদর্শন করে আশ্রমের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে জনপ্রিয় হয় এই স্টাইল। শ্যামার কোটাল এবং চণ্ডালিকার অনুচরের নাচে ক্যান্ডি ডান্সের বিশেষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। 

শ্রীপালি তৈরি হওয়ার পর তার আশ্রম সঙ্গীত হিসেবে নির্বাচন করা হয়, 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে'। সু্র,‌ তাল,  কথা, সবই এক, কেবল ভাষাটা আমাদের দেশের। শ্রীপালি যেন শ্রীলঙ্কাতে এক মিনি শান্তিনিকেতন। ক্লাস টু থেকে একদম কলেজ পর্যন্ত পড়ানো হয় এখানে। রবীন্দ্রনাথ নিজে হাতে ডিজাইন করেছিলেন শ্রীপালির মূল বিল্ডিং। খুব সুন্দর তার গঠন শৈলী।  এখানকার লেখাপড়া সংস্কৃতি চর্চা সব কিছুতেই কিন্তু মিশে রয়েছে গুরুদেব এবং তাঁর আশ্রম। উইলমট এ পেরেরা মনে মনে যা স্বপ্ন দেখেছিলেন তাই বাস্তব করে তুলেছিলেন।  রবীন্দ্রনাথের মত গুরুরাই বোধহয় এমন আশ্চর্য শিষ্য লাভ করেন! শ্রীপালি এখন আমাদের শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি। এখানে ঘটা করে শান্তিনিকেতনের অনুষ্ঠান পালন করা হয়। ২৫শে বৈশাখ তো অবশ্যই। কত মানুষ, দেশবিদেশের টুরিস্ট দেখতে আসেন এই মিনি শান্তিনিকেতনকে। শ্রীলঙ্কা যতদিন থাকবে রবীন্দ্রনাথও ততদিন বেঁচে থাকবেন এই দেশের মানুষের চেতনায়, কারণ আমাদের দেশের স্কুলে রবীন্দ্রনাথ পড়ানো হয়। আমাদের দেশ থেকে অনেক ছেলেমেয়েরা গুরুদেবের আশ্রমে আজও পড়তে যায় ।শ্রীপালিতে  গুরুদেবের নিজে হাতে লাগানো গাছ, নিজে হাতে লেখা পাথর, আজও সবই সমান প্রাণবন্ত, শুধু একটাই দীর্ঘশ্বাস,  গুরুদেবের আদর্শে, উইলমট এ পারেরা এত পরিশ্রম করে ভালোবেসে গড়েছিলেন এই মিনি শান্তিনিকেতন, একদিন কাউকে কিছু না বলে অভিমানে স্বেচ্ছায় এই পৃথিবী ছেড়ে চলে জান তিনি। বড় অপ্রত্যাশিত এক ছেদ!  সেই মানুষটার কথা ভাবলে মন ভারাক্রন্ত হয়ে ওঠে! আজ সে কথা থাক। সে গল্প অন্য কোনও দিন…, আজ এবং প্রতিদিন,  শ্রীপালিতে ছাত্রছাত্রীরা মিলে গাইছে তাঁদের জীবনের মন্ত্র,  একলা চলো একলা চলো একলা চলো রে……!

 

 

নৃত্যশিল্পী চাঁদনী কস্তুরি আরাচ্চি। শ্রীলঙ্কা।
নৃত্যশিল্পী চাঁদনী কস্তুরি আরাচ্চি। শ্রীলঙ্কা।
উইলমট এ পেরেরা। ছবি ফেসবুক
উইলমট এ পেরেরা। ছবি ফেসবুক
বন্ধ করুন