বাংলা নিউজ > বায়োস্কোপ > ঋষি কাপুর: দ্য স্টাইল আইকন…..
ছবি ইনস্টাগ্রাম।
ছবি ইনস্টাগ্রাম।

ঋষি কাপুর: দ্য স্টাইল আইকন…..

ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন স্টাইল আইকন খুবই কমই এসেছেন। নিজের প্যাশনকে করে তুলেছিলেন সারা দেশের ইউথ ফ্যাশন। গিটার থেকে ডাফলি, বা আকবর কাওয়াল থেকে ডিস্কো কিং মন্টি, সর্বত্রই রাজ করে গেলেন ঋষি কাপুর। গ্রেট শো ম্যানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে HT Bangla...

ডিস্কো কিং মন্টি থেকে আকবর ইলাহাবাদী কাওয়াল, প্রত্যেকটা চরিত্রে নিজেকে ভেঙেছেন বারবার। তাঁর অভিনয়, ফ্যাশন এবং স্টাইলের মেলবন্ধনে প্রতিবারই বলিউডে সৃষ্টি হয়েছে একটি করে নতুন রূপোলি স্টেটমেন্ট। সেই ৭০-এর দশক থেকে ২০২০, অসম্ভব রোম্যান্টিক লুক, শান্ত নরম দৃষ্টি, ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি অথচ কঠিন দৃঢ় চোয়াল, এই নিয়েই তাঁর ম্যাজিকাল স্ক্রিন প্রেজেন্সে একের পর এক সাফল্য। সত্তর ও আশির দশকে জেন ওয়াইয়ের হার্টথ্রব তো তিনি ছিলেনই, পাশাপাশি ছিলেন স্টাইল আইকনও। খেতে খুব ভালোবাসতেন তাই সেভাবে ডায়টিং করা সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। বরাবরই একটু মোটার দিকে তাঁর চেহারা। হিরো বা সুপার স্টার হতে গেলে মাসকুলার বডি বা সিক্স প্যাকট্যাকের প্রয়োজনীয়তাকে কোনও কালেই তেমন আমল দেননি। তার চেয়ে অনেক বেশি মন দিয়েছেন নিজের অভিনয় ক্ষমতার সৃষ্টিশীল প্রদর্শনে। নিজের লুক এবং স্টাইল নিয়ে সর্বদা সচেতন থেকেছেন তিনি। তাইতো সেই শুরু থেকে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বলিউডের দ্য মোস্ট ফ্যশনেবেল স্টার-এর তকমাটা জরিয়ে ছিল ঋষি কাপুরের সঙ্গে।

প্রথাগত ফ্যাশনে ঋষি কাপুর বিশ্বাস করতেন না। তাঁকে যেটা মানাবে, এবং তিনি যেটাতে স্বচ্ছন্দ সেটাই তাঁর স্টাইল। মুখের তুলনায় বড় মাপের ওভাল শেপ সানগ্লাস, কালো ব্লেজার, টার্টেল নেক, রাউন্ড নেক ফুল স্লিভ টি শার্ট, স্ট্রাইপ মাফলার, প্রিন্টেড ক্যাজুয়াল শার্ট, ফ্লোরাল প্রিন্ট শার্ট, স্লিম ফিট প্যান্ট এবং বেলস, এই গুলি তাঁর বিশেষ পছন্দের। আজও কর্জের রকস্টার মন্টির সেই বিখ্যাত আউটফিট সমান ভাবে জনপ্রিয়।

নিজেকে নিয়ে চলত তাঁর কাঁটাছেড়া। এমনকি, মেয়েদের বা ছেলেদের কমন ওয়্যারকেও তিনি আলাদা করে মানতে চাইতেন না। এক্সপেরিমেন্ট করতেন রঙ নিয়েও। বেবি নীল, জমকালো ফ্লোরাল প্রিন্ট, জিওম্যট্রিক প্রিন্ট, লালের বিভিন্ন শেড, সুতোর কাজ, পমপম, সব কিছুই ছিল তাঁর সৌখিনতার তালিকায়। ওয়েস্টার্ন কস্টিউমে তাঁকে মনে হত হুবুহু কোনও সাহেব। লং কোট, কালো ব্লেজার তাঁর বিশেষ পছন্দের। শোনা যায় রাউন্ডনেক ফুলস্লিভ টিশার্টের ফ্যাশন ভারতে এসেছিল কাপুর পরিবারের হাত ধরে। সাধারণ মানুষকে ফরমাল থেকে ক্যাজুয়্যাল ফ্যাশনে অভস্থ করিয়েছিল এই কাপুর পরিবারই। ‘ববি’র পর থেকে সারা দেশের কলেজের ছেলেমেয়েরা বা ইউথ ফ্যাশন প্রভাবিত ছিল ঋষি কাপুর ও ডিম্পল ক্যপাডিয়ার দ্বারা।

 

সোয়টার নিয়ে তাঁর অবসেশনের কথা সকলের জানা। ৯০ এর দশকে ‘দিওয়ানা’ সুপার ডুপার হিট ফিল্ম। ছবি এবং ছবির প্রতিটা গান ঝড় তুলেছে দর্শকের হৃদয়ে। ঋষি কাপুরের সঙ্গ দুই কো-স্টার দিব্যা ভারতী ও শহরুখ খান তাঁর চেয়ে বয়েসে অনেক ছোট । স্বভাবতই সিনেমা বিশেষজ্ঞদের মনে হয়েছিল ঋষি কাপুর, দিব্যা ভারতীর তুলনায় শাহরুখ, দিব্যার ওপর দৃশ্যায়িত গান গুলি বেশি হিট করবে। এই ধারণা ভুল প্রমাণ হতে বেশি সময় লাগেনি। ছবি রিলিজের পর দেখা যায়, পায়েলিয়া, তেরি উম্মিদ, সোচেঙ্গে তুমহে পেয়ার... সব কটাই সুপার ডুপার হিট। এই প্রত্যেকটা গানের দৃশ্যে ঋষি কাপুর তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে গানের ছন্দে পা মেলাচ্ছেন সোয়টার পরা ক্যাজুয়াল লুকে। মেঘ ভেসে বেড়ানো সবুজ পাহাড়ের ভ্যালিতে, কাঁচা হলুদ রঙ্গা কস্টিউমের প্রায় শ’খানেক ডান্সারের মধ্যে দিয়ে তিনি হেটে আসছেন, পরনে সাদার ওপর সমুদ্র-সবুজ রঙের ডিজাইন করা ফুলহাতা সোয়টার। হিরোর এন্ট্রি। যেন স্বপ্ন দৃশ্য! অপেরা হাউস ফেটে পড়েছে দর্শকের হাততালিতে। এই ভাবেই তিনি স্বাক্ষর রেখে গেলেন ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে।

ঋষি কাপুর বিভিন্ন ইন্টারভিউতে কথা প্রসঙ্গে তাঁর সোয়টার প্রেমের কথা অনেকবারই বলেছেন। কালোর ওপর ম্যাজেন্ডা, তুতে-নীল এবং বেইজ ও গাঢ গোলাপীর কম্বিনেশন। কোথাও রয়েছে খাকি, চকোলেট ব্রাউন এবং চাপা হলুদের টুইস্ট! লালের ওপর বিভিন্ন চেকস ও ডিজাইন তো অবশ্যই। প্রতিটা কলেকশন এক্সক্লিউসিভ। তবে সব ক’টি ক্ষেত্রে সোয়টার অবশ্যই ফুল হাতা। সিনেমা হোক বা বাস্তবে, একটা সোয়টার কিন্তু রিপিট হয়নি। একটা সময়ের পর থেকে এমনই হয়েছিল যে, গানের দৃশ্যে তো বটেই, প্রায় সম্পূর্ণ ছবিতেই তিনি বিভিন্ন স্টাইলের সোয়টার পরে অভিনয় করে গেছেন। সারা ভারতও মজেছে তাঁর ফ্যাশনের ধারায়। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে সোয়টারের বাজার তখন রমরমা তাঁর জন্যই।

সোয়াটারের পাশাপাশি মাফলার নিয়েও চলেছে প্রচুর এক্সপেরিমেন্ট, ট্রেনের ওপর সেই বিখ্যাত দৃশ্য, ‘হোগা তুমসে পেয়ারা কওন’, সাদা কালো সোয়াটারের সঙ্গে ম্যাচ করা সাদা কালো মাফলার। সেই সময় ইয়ং স্টারদের কাছে হট ফেভারিট হয়ে উঠেছিল। ‘আর হাম তুম এক কামরে মে বন্দ হো’ দৃশ্যে কালোর ওপর ডার্ক ম্যাজেন্ডা স্ট্রাইপ মাফলার তাঁকে সেই সময়কার জেন ওয়াইদের কাছে স্টাইল আইকন করে তুলেছিল। এছাড়া লেদার জ্যাকেট তাঁর অন্যতম পছন্দের। তাঁর ব্যক্তিগত সঙ্গগ্রহে রয়েছে দেশ বিদেশের অসাধারণ সব ক্যাজুয়াল ও ডিজাইনার জ্যাকেট।

পছন্দ করতেন একটু বড় মাপের চশমা বা সানগ্লাস। এবং সেটাকেই করেছিলেন তাঁর ফ্যাশন। সিনেমাতেও সেই একই এক্সপেরিমেন্ট, বলাই বাহুল্য অবশ্যই সফল তাঁর সেই স্টাইল স্টেট্মেন্ট। এই সবের পাশাপাশি ডাফলি, গিটার, মাইক, যাই হাতে নিয়েছেন সেটাই যেন হয়ে উঠেছে স্টাইল এক্সেসারিজ। ভারতীয় সিনেমায় ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন তো বটেই, অমর হয়ে থাকবে একটা যুগ, যা কেবল ঋষি কাপুর নামক জমকালো আনন্দে ও ইউথ রোম্যান্টিক ইমেজে ভরা।

 

পাঁচ দশক দীর্ঘ ফিল্মি কেরিয়ার ঋষি কাপুরের, স্টাইল স্টেটমেন্টটা বরবারই আলাদা করে তাঁকে
পাঁচ দশক দীর্ঘ ফিল্মি কেরিয়ার ঋষি কাপুরের, স্টাইল স্টেটমেন্টটা বরবারই আলাদা করে তাঁকে
বন্ধ করুন