বাংলা নিউজ > বায়োস্কোপ > বাঙালির মহালয়া মানেই বীরেন ভদ্র, সংসারে মন ছিল না মহিষাসুরমর্দিনীর প্রাণপুরুষের
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র (ছবি-সংগৃহীত)
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র (ছবি-সংগৃহীত)

বাঙালির মহালয়া মানেই বীরেন ভদ্র, সংসারে মন ছিল না মহিষাসুরমর্দিনীর প্রাণপুরুষের

  • আপনভোলা মানুষ ছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। সংসারে একদমই মন ছিল না দাদুর, দাবি নাতনি মন্দিরা ভদ্র চক্রবর্তীর।  

তাঁর অনুষ্ঠানের প্রথম সম্প্রচারের পরে কেটে গিয়েছে ৯০টা বছর । আজও তাঁর বিখ্যাত কণ্ঠস্বরের দৌলতে দেবীপক্ষের প্রারম্ভের সূচক এই বেতার অনুষ্ঠানকেই অনেকে ' মহালয়া ' বলে ভুল করে থাকেন । আসলে ‘মহালয়া’ একটি তিথি। পিতৃপক্ষের শেষে নব অরুণ আলোকের চাদর গায়ে জড়িয়ে আধো ঘুম থেকে জেগে ওঠা পাড়ায় আজও আবেগ নস্ট্যালজিয়া রোমাঞ্চের হিল্লোল তোলেন তিনি - বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র । বাণী কুমারের রচনায় , পঙ্কজ মল্লিকের সুরে এবং তাঁর স্তোত্রপাঠে মিথে পরিণত হওয়া মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের সৌজন্যে তাঁর চন্ডী পাঠ মানেই আপামর বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব , শারদোৎসবের ঢাকে কাঠি পড়ার সূচনা ।

কিন্তু জীবদ্দশায় কেমন ছিলেন বাঙালির গর্বের ব্যারিটোন কণ্ঠস্বরের অধিপতি ? এখন তাঁর বসত ভিটায় দিদি , নাতি নাতনি , ভাইরা বসবাস করেন । নাতনি মন্দিরা ভদ্র চক্রবর্তীর কথায় , দাদু বেঁচে থাকতে রেডিওর তথাকথিত শিল্পীদের সমাগম ঘটতো এই দিনে । জমিয়ে হতো খাওয়া দাওয়া । যতদিন না শয্যাশায়ী হয়েছেন নিজের ঘরে সকলের সাথে বসেই শুনতেন অনুষ্ঠান । কখনো বা চলে যেতেন আকাশবাণীর অফিসে । তবে এখনো তাঁর ঘরে আগের মতোই সকলে মিলে বসে শোনা না হলেও , প্রত্যেকের ঘরে স্তোত্রপাঠ শোনা হয় । তাঁর ঘরও সাজিয়ে রাখা হয়েছে ঠিক আগের মতোই । তাঁর খাট , ব্যবহৃত আসবাব , টেবিল এমনকি যে রেডিওতে তিনি নিজের সৃষ্টিকে শুনতেন , সেটাও রাখা আছে একই ভাবে । তবে কালের নিয়মে এখন অনেকেই চলে গিয়েছেন , যুগ বদলেছে । তবে অনেকেই তাঁর মূর্তিতে এই দিন মাল্যদান করতে আসেন , যদিও বাড়িতে অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ থাকায় এই বছর করোনার ভয়ে একটু বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলেই জানান মন্দিরা ।

তবে তিনি জানিয়েছেন সাধারণ দিনে ,সকালে ঘুম থেকে উঠে চা খেয়েই পড়ার টেবিলে চলে যেতেন বীরেন্দ্র । মূলত নিজের লেখা পড়া , গান , নাটক লেখালেখি নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন তিনি । বাড়িতে কি হচ্ছে না হচ্ছে সে সব দিকে বিশেষ মাথা ব্যাথা কোনোদিনই তাঁর ছিলোনা । ছোট বেলায় দাদুর কাছে গল্প শুনতেন মন্দিরা । তাঁর লেখা গল্প নাটক এগুলির অনেকাংশেই তখন না বুঝলেও ছোটদের জন্য লেখা হাসির গল্প শুনে খুব মজা পেতেন তিনি ।

শোনা যায় তিনি নাকি স্তোত্রপাঠ করার সময় পট্ট বস্ত্র পরে ধুপ দীপ জেলে তবেই বসতেন । বাড়িতে পুজো হলে মন্ত্রোচ্চারণের দায়িত্ব নিতেন । যদিও মন্দিরা জানিয়েছেন দাদু কোনো দিনই পুজো পার্বনের দিকে বা ঠাকুরঘরের ছায়াও মাড়াতেন না । সেখানে ধুপ দীপ জ্বালিয়ে আরাধনায় বসা তো অসম্ভব ব্যাপার ।

১৯৭৬ সালে মহালয়ার ভোরে উত্তম কুমারের স্তোত্র পাঠে দূর্গা দুর্গতিহারিনী সম্প্রচারিত হয়েছিল , বীরেন বাবুর অনুষ্ঠানের পরিবর্তে । সেই নিয়ে বীরেনবাবুর প্রতিক্রিয়া কি ছিল জানতে চাওয়া হলে , নাতনি জানান দাদু বরাবরই খুব শান্ত , ঠান্ডা মাথার মানুষ ছিলেন । এক্ষেত্রেও তিনি রেগে যাননি , বা উত্তেজিত হননি । শুধু জানিয়েছিলেন , ভালো তো , নতুন কিছু হলে , মানুষের পছন্দ হলে তো ভালোই । এমনকি স্বয়ং উত্তম কুমার নিজে এসে দাদুকে অনুষ্ঠান শোনার জন্য অনুরোধ করে গিয়েছিলেন । যদিও মানুষ মেনে নেন নি , তুমুল বিক্ষোভ প্রতিবাদের ফলে সেই বছর মহা ষষ্ঠীর দিন সকাল বেলায় পুনরায় সম্প্রচারিত হয়েছিল মহিষাসুরমর্দিনী ।

'আমায় ভুলে গেলেও বছরে এই দিনটিতে আমায় স্বরণ করবেই করবে,তাতেই আমার তৃপ্তি ', চলে যাওয়ার আগে জানিয়েছিলেন বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র। 

আচ্ছা বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র নামটার সাথে আপনার কেমন স্মৃতি জড়িয়ে আছে ? এ প্রসঙ্গে মন্দিরার অভিমত , যখন থেকে দাদুকে দেখছি , ততদিনে উনি পৌঁছে গেছেন বার্ধক্যের সীমায় । বাড়িতেই থাকতেন । অনুষ্ঠান কম করতেন । তবে লেখালেখিতে ছেদ পড়েনি কোনোদিন । আমাদের কখনো পরেও শোনাতেন । আমি ওঁনার নাতনি জেনে অনেকেই আমায় অবাক হয়ে ওনার কথা জিজ্ঞেস করতেন । শয্যাশায়ী হয়ে পড়ার পরে শেষ বয়সে নিজে হাতে ওনার মুখে জল দিয়েছি । এক সময় চিনতেও পারতেন না কাছের মানুষ গুলোকে ।

১৯৯১ সালের ৪ নভেম্বর বাঙালির বীরেন্দ্র অমৃতলোকে যাত্রা করেন । বেতারে আক্ষরিক অর্থে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত করেছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। কিন্তু বেতার কি তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান দিতে পেরেছে? তখন স্টাফ আর্টিস্টদের পেনশন-গ্র্যাচুয়িটির ব্যবস্থা ছিল না। প্রভিডেন্ট ফান্ডের সামান্য কয়েকটি টাকা নিয়ে অবসর নিয়েছিলেন । রবীন্দ্র ভারতীতে বেতার-নাটক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন কিছু দিন। শিল্পী রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে কলকাতা ও অন্যত্র শ্রীরামকৃষ্ণ ও মহাভারত বিষয়ে পাঠ-গান করতেন। সামান্য অর্থের বিনিময়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হতেন, এমনকি প্রতিমার আবরণ উন্মোচনও করতেন !

শেষ বয়সের একাধিক সাক্ষাৎকারে ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে অভিমান , হতাশা | বার বার বলতেন ‘ভাবতেই পারিনি সবাই আমাকে ভুলে যাবে...' তবে নিজেই বলে গিয়েছেন, ‘আমাকে ভুলে গেলেও বছরে এক বার সেই দিনটিতে স্মরণ করবেই করবে। তাতেই আমার তৃপ্তি।’

সত্যিই তাই , বেতার তাঁকে ভুলেছে , বাঙালি নয় ।

 

বন্ধ করুন