বাড়ি > ঘরে বাইরে > লাদাখে চিনা আগ্রাসনের জন্য মূলে লাল ফৌজের এই আট কমান্ডার, চিনে রাখুন
লাদাখ সীমান্তে চিনা সেনার আটজন আগ্রাসী পদক্ষেপের পুরোদমে আছেন (ছবি সৌজন্য রয়টার্স)
লাদাখ সীমান্তে চিনা সেনার আটজন আগ্রাসী পদক্ষেপের পুরোদমে আছেন (ছবি সৌজন্য রয়টার্স)

লাদাখে চিনা আগ্রাসনের জন্য মূলে লাল ফৌজের এই আট কমান্ডার, চিনে রাখুন

অধিকাংশ কমান্ডারই চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক তথা চিনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের খাস লোক।

শিশির গুপ্ত

আরবি ভাষায় কথা বলা একজন জেনারেল, চারজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এবং তিনজন ডিভিশনাল কমান্ডার। ভারতের লাদাখ এবং চিনা অধিকৃত আকসাই চিনের মাঝের ১,৫৯৭ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) আগ্রাসনের তদারকি করছেন ওই আটজন। তাঁদের মধ্যে আরবিতে কথা বলা ওই জেনারেল আবার ২০ বছরের বেশি সময় ধরে তিব্বতে জোরজবরদস্তি চিনা কমিউনিস্ট পার্টির শাসন কায়েম করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত বরাবর আপাতত যে পরিস্থিতি, তাতে শীতকালেও ভারতীয় এবং চিনা সেনার মধ্যে সংঘাত জারি থাকতে পারে। এমনকী তারপরও উত্তেজনা চলতে পারে বলে মত অনেকের। চিন যে সেনা সরিয়ে নিতে অনিচ্ছুক, তার মূলে আছেন ৬৫ বছরের জেনারেল ঝাও জঙ্গকি। যাঁর কাছে সামরিক সংঘাতের ঘটনা নতুন কোনও বিষয় নয়। এমনকী ২০১৭ সালে ৭৩ দিন ধরে চলা ডোকলাম বিবাদের সময় চিনা সেনার মূল হোতা ছিলেন তিনি।

ঝাও-সহ যে আট চিনা কমান্ডার লাদাখ সংঘাতে জড়িত আছেন, তাঁদের তথ্য তুলে ধরেছে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’। যে কমান্ডারদের মধ্যে অধিকাংশই চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক তথা চিনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের খাস লোক।

১) জেনারেল ঝাও জঙ্গকি, ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডার

বিশেষভাবে নজরদারির ক্ষেত্রে পারদর্শী জেনারেল ঝাওকে ২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চিনা সেনার ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। হেইলংজিয়াং প্রদেশের বিন কাউন্টিতে জন্মগ্রহণ করা ঝাওকে ১৯৭০ সালে চেঙ্গদুর ১৪ গ্রুপ আর্মির (এখন অবলুপ্ত) ১১৮ রেজিমেন্টের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনাম-চিন যুদ্ধের সময় চিন সেনার নজরদারি ইউনিটের সদস্য ছিলেন। তিব্বত সামরিক জেলার মাউন্টেন ব্রিগেড কমান্ডার হওয়ার আগে ১৯৮৮ সালে তানজানিয়ায় সামরিক উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

২০০৪ সালে ১৪ গ্রুপ আর্মির কমান্ডার হয়েছিলেন। তার আগে সেই দলেরই গোয়েন্দা বিভাগের শীর্ষে ছিলেন। চেঙ্গদু সামরিক এলাকার কুনমিংয়ের ১৩ গ্রুপ আর্মির শীর্ষপদে থাকার পর জিনান সামরিক জেলার চিফ অফ স্টাফ হয়েছিলেন। যে এলাকার মধ্যে আছে শ্যানডং এবং হেনান প্রদেশ। ২০০৯ সালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নতির ছ'বছর পর জিনান সামরিক জেলার কমান্ডার হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। পরের বছর জেনারেল হিসেবে ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডার হন। চিনা সেনার থিয়েটার কমান্ডাররা ৬৫ বছরে অবসর গ্রহণ করলেও গত এপ্রিলেই সেই সীমা পেরিয়ে গিয়েছেন ঝাও। যে সময়ে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর চিনা আগ্রাসন শুরু হয়।

২) লেফটেন্যান্ট জেনারেল শিউ কুইলিং, পিএলএ গ্রাউন্ড ফোর্সের কমান্ডার, ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড

বেজিং অধিকৃত আকসাই চিনে ট্যাঙ্ক এবং বড় আর্টিলারি বন্দুক মোতায়েনের দায়িত্ব ৫৭ বছরের শিউয়ের। অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান, সারফেস-টু-সারফেস মিসাইল এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও মোতায়েনের দায়িত্বে আছে চিনা সেনার গ্রাউন্ড ফোর্স। ২০১৭ সালে নর্দান থিয়েটার কমান্ডের লিয়াওলিংয়ের শেনইয়াংয়ের ৭৯ গ্রুপ আর্মির কমান্ডারের দায়িত্ব নেওয়ার আগে হেনানের ৮৩ গ্রুপ আর্মি কমান্ডার পদে ছিলেন শিউ। ২০১৮ সালে ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডে গ্রাউন্ড ফোর্স কমান্ডার হয়েছিলেন। পরে তাঁকে সম্পূর্ণ ইস্টার্ন থিয়েটারের ডেপুটি কমান্ডার পদে উন্নীত করা হয়। লাদাখ সংঘাতে চিনা সেনার অস্ত্র মোতায়েন এবং সৈন্য সমাবেশের ক্ষেত্রে তিনিই বড় মাথা।

৩) লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াং কিয়াং, ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের পিএলএ এয়ার ফোর্সের কমান্ডার

চারটি ফাইটার ডিভিশন, একটি ট্রান্সফার ডিভিশন এবং একটি বোম্বার ডিভিশনের মাধ্যমে চিনা সেনাকে আকাশপথে সহায়তা প্রদানের দায়িত্বে আছেন ওয়াং। তিনি একাধিক উঁচু পদে ছিলেন। জিনান সামরিক জেলার এয়ার ফোর্স অ্যাভিয়েশন ডিভিশনের কমান্ডারের দায়িত্ব সামলেছিলেন। ২০১৬ সাল থেকে ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন তিনি। তার মধ্যে আছে বায়ুসেনার ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ, চিফ অফ স্টাফ এবং ডেপুটি কমান্ডার। গত বছর ডিসেম্বর থেকে ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের পিএলএ এয়ার ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

চিনা সেনার আট কমান্ডার (ছবি সৌজন্য হিন্দুস্তান টাইমস)
চিনা সেনার আট কমান্ডার (ছবি সৌজন্য হিন্দুস্তান টাইমস)

৪) লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাইজিয়াং ওয়াং, কমান্ডার, তিব্বত সামরিক জেলা

গত বছরের ১০ ডিসেম্বর থেকে অতি সংবেদনশীল তিব্বত সামরিক জেলার প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন ৫৭ বছরের হাইজিয়াং। ১৯৭৭ সালে সেনায় যোগ দেওয়ার পর ভিয়েতনাম-চিন যুদ্ধে তাঁকে ‘ফার্স্ট ক্লাস মেরিট’-এ ভূষিত করা হয়েছিল। সেই যুদ্ধে হেরেছিল চিন। একটা সময় দক্ষিণ শিনজিয়াং সামরিক জেলার ডেপুটি কমান্ডার পদে ছিলেন। যার অধীনে রয়েছে অধিকৃত আকসাই চিনের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত দায়িত্ব। ২০১৬ সালে তিব্বত সামরিক জেলার ডেপুটি কমান্ডার হয়েছিলেন তিনি। লেফটেন্যান্ট জেনারেল হওয়ার পর সেই সামরিক জেলার কমান্ডার পদে নিযুক্ত হয়েছেন।

পার্বত্য এলাকায় প্রশিক্ষণের শারীরিক ও কৌশলগত দিক এবং তিব্বতে প্রতিরক্ষা কাঠামোর গুরুত্ব নিয়ে একাধিক লেখা প্রকাশ করেছেন। টহলদারি এবং নজরদারি অভিযানে তিনি পারদর্শী।

৫) লেফটেন্যান্ট জেনারেল লিউ ওয়াংলং, কমান্ডার, শিনজিয়াং সামরিক জেলা

উইঘুর মুসলিম প্রধান এবং প্রায়শই অস্থির শিংজিয়াং প্রদেশের প্রধান তিনি। ২০০৮ সাল থেকে ওই এলাকায় আছেন ৫৮ বছরের লেফটেন্যান্ট জেনারেল। ২০১৬ সালে গ্যানলু সামরিক জেলার কমান্ডার হয়েছিলেন। পরের বছরই শিংজিয়াংয়ের কমান্ডার পদে বসেছিলেন। ২০১৮ সালে জুলাইয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হন তিনি। লিউয়ের মূল্যায়ন ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডার ঝাওয়ের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

৬) মেজর জেনারেল লিউ লিন, কমান্ডার, দক্ষিণ শিনজিয়াং সামরিক জেলা

মলডো এবং চুশুলের একাধিক ম্যারাথন বৈঠকে ভারতীয় সেনার ১৪ কর্পের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল হরিন্দর সিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন লিউ। লাদাখে উত্তেজনা প্রশমনের পাশাপাশি সেনা সরানোর আলোচনায় রয়েছেন তিনি। ২০১৫ সালে মেজর জেনারেল হওয়ার আগে ৮ শিনজিয়াং সামরিক ডিভিশনের কমান্ডার ছিলেন লিউ। ‘চিফ অফ স্টাফ’-এর দায়িত্ব পালনের পর গত বছর শিনজিয়াং সামরিক জেলার শীর্ষে বসেন তিনি। কুগরাঙ্গ নদী, গোগরা এবং প্যাংগং সো লেকে ভারতীয় সেনার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে লিউয়ের বাহিনী।

৭) মেজর জেনারেল লিউ জেপিং, কমান্ডার, কুইংহাই সামরিক জেলা

২০১৭ সালের জুলাইয়ে পদোন্নতির পর চলতি বছর এপ্রিল লিউতে কুইংহাই সামরিক জেলা কমান্ডার করা হয়েছে। গারি সামরিক উপ-জেলার হয়ে কাজ করেছেন তিনি। যে জেলার মুখোমুখি রয়েছে ভারতের লাদাখ সেক্টরের ডেমচক। ২০১৭ সালে উৎপাদন এবং নির্মাণ সংক্রান্ত সামরিক বিভাগের কমান্ডার ছিলেন লিউ।

৮) মেজর জেনারেল কিউ শিনইয়ং, কমান্ডার, সিচুয়ান সামরিক জেলা

গত ২১ এপ্রিলেই সিচুয়ান সামরিক জেলার কমান্ডার পদে নিযুক্ত হয়েছেন। শ্যাংডঙে জন্মেছিলেন। ২০১৩ সালে ৩১ ইনফ্র্যান্ট ডিভিশনের প্রধান ছিলেন। পরের বছরই ইউনান সামরিক জেলার ডেপুটি কমান্ডার হয়েছিলেন। তিন বছর পরে কুইনঘাই সামরিক জেলার কমান্ডারের দায়িত্বও সামলেছিলেন ৫৯ বছরের কিউ।

বন্ধ করুন