বাংলা নিউজ > ঘরে বাইরে > Chittagong University Sexual Harassment: ১ বছরে ৮ ছাত্রীকে যৌন হেনস্থা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, ধৃত ছাত্রলিগ 'ঘনিষ্ঠ' ৪
এক বছরে ৮ ছাত্রীকে যৌন হেনস্থা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, ধৃত ছাত্রলিগ 'ঘনিষ্ঠ' ৪। (ছবিটি প্রতীকী, সৌজন্যে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর/ডয়চে ভেলে)

Chittagong University Sexual Harassment: ১ বছরে ৮ ছাত্রীকে যৌন হেনস্থা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, ধৃত ছাত্রলিগ 'ঘনিষ্ঠ' ৪

  • গত এক বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮ জন ছাত্রী হেনস্থার শিকার হয়েছেন৷ এর আগের ঘটনাগুলিতে একজনও গ্রেফতার হয়নি৷ এবার এক ছাত্রীকে বিবস্ত্র করে ভিডিয়ো তোলার চেষ্টার পর আন্দোলনে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা৷ অবশেষে এই যৌন নিপীড়নের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব৷

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নের সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত চারজনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব৷ অভিযুক্ত দুই ছাত্রকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে৷

গত এক বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮ জন ছাত্রী হেনস্থার শিকার হয়েছেন৷ এর আগের ঘটনাগুলিতে একজনও গ্রেফতার হয়নি৷ এবার এক ছাত্রীকে বিবস্ত্র করে ভিডিয়ো তোলার চেষ্টার পর আন্দোলনে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা৷ অবশেষে এই যৌন নিপীড়নের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব৷ ধৃতরা সবাই ছাত্রলিগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গিয়েছে৷

র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ ইউসুফ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘ঘটনার হোতা আজিম হোসাইন নিজের মোবাইল দিয়ে ভিডিয়ো ধারণের কথা স্বীকার করেছে৷ এই ঘটনাটির সঙ্গে ছয়জনের সম্পৃক্ততার কথা তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে৷ এর মধ্যে তিনজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং তিনজন স্থানীয় বহিরাগত৷ আটক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হল ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের আজিম হোসাইন, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের নুর হোসেন শাওন ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের নুরুল আবছার বাবু৷ বহিরাগতরা হল মো. সাইফুল, হাটহাজারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মাসুদ রানা ও মো. সাইফুল৷ তাদের মধ্যে দুই সাইফুল ছাড়া বাকিরা গ্রেফতার হয়েছে৷'

আরও পড়ুন: Bangladesh Power crisis- লোডশেডিং কি বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে?

র‌্যাব কর্মকর্তা এম এ ইউসুফ বলেন, ‘শুক্রবার ঘটনার মূল অভিযুক্ত আজিমকে গ্রেফতার করা হয়৷ সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই তার বাড়ি৷ তার নেতৃত্বে পুরো ঘটনা ঘটেছে৷ তাকে গ্রেফতারের পর আমরা বাকিদের নাম পাই৷ আজিম এর আগেও ছাত্রীদের ইভটিজিং করেছে বলে আমাদের কাছে স্বীকার করেছে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বাড়ি হওয়ার সুবাদে নিজেকে অনেক ক্ষমতাধর মনে করত সে৷'

সেদিন যা ঘটেছিল

র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক জানান, অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি, সেদিন রাত ১০টা-সাড়ে ১০টার দিকে ওই ছাত্রী তার এক বন্ধু-সহ হলের দিকে ফিরছিলেন৷ আজিম ও তার গ্রুপটি মোটরসাইকেল নিয়ে রাতে ঘোরাঘুরি ও আড্ডা দিতে থাকে৷ ঘোরাঘুরির সময় হঠাৎ তাদের নজরে আসে, একটি ছেলে ও একটি মেয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনের দিক থেকে হেঁটে আসছে, জায়গাটি একটু নির্জন৷ শুরুতে তারা গিয়ে ভুক্তভোগীদের চার্জ করে৷ ছাত্রীর সঙ্গে থাকা ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন না৷ অভিযুক্তরা তাদের কাছে গিয়ে এত রাতে বাইরে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করে৷ ছেলেটির কাছে দাবি করা হয় চাঁদা৷ একপর্যায়ে তাদের মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়৷

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আরও জানান, এরপরই তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়৷ পরে ছয়জন তাদের ওপর চড়াও হয়৷ ছেলেটিকে আটকে রেখে মেয়েটিকে তারা নির্যাতন করে৷ প্রথমে চড়-থাপ্পড় মারে, তারপর বিবস্ত্র করে ভিডিয়ো তোলার চেষ্টা করে৷ ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, ভ্যানিটি ব্যাগ ও টাকা পয়সা নিয়ে নেওয়ার পর তারা (জড়িতরা) ঘটনাস্থল ত্যাগ করে৷ তখন ভুক্তভোগীরা একটি হলে গিয়ে এক ছাত্রের মোবাইল থেকে ফোন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অভিযোগ জানায়৷

শনিবার সকালে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিযুক্ত সবাই বলছে তারা ছাত্রলিগ সমর্থন করে৷' চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলিগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘এরা বগিভিত্তিক সংগঠন সিএফসির সদস্য৷ এর দায় ছাত্রলিগ নেবে না৷ বিশ্ববিদ্যালয় আইনি ব্যবস্থা নেবে৷ ঘটনার পরপরই আমরা চেষ্টা করেছি অভিযুক্তদের খুঁজে বের করে র‌্যাবের হাতে ধরিয়ে দিতে৷ কোনও ব্যক্তির অপরাধের দায় তো সংগঠন নেবে না৷ এখন আসলে কিছু হলেই সবাই ছাত্রলিগকে অভিযুক্ত করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়৷'

বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তে যা এসেছে

ছাত্রীর কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর রবিউল হাসান ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়৷ ওই কমিটি রিপোর্টও দিয়েছে৷ সেখানে তারা দুই জনের নাম পাওয়ার কথা জানিয়েছিল৷ তাদের একজন মূল অভিযুক্ত মোহাম্মদ আজিম হোসাইন ও ইংরেজি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র মেহেদি হাসান হৃদয় (বান্টি)৷ প্রক্টর রবিউল হাসান ভূঁইয়া জানিয়েছেন, ‘র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে হৃদয়ের সম্পৃক্ততার তথ্য আসেনি৷ র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, ভুল করে হয়ত হৃদয়ের নাম তদন্ত কমিটি বলে থাকতে পারে৷

এবার কেন আন্দোলন?

১৭ জুলাই ওই ছাত্রী নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর ক্যাম্পাস এমনিতেই থমথমে ছিল৷ তারপর আবার গত ১৯ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের আবাসিক হলে রাত ১০টার মধ্যে প্রবেশের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ৷ এতে আরও ক্ষুব্ধ হন ছাত্রীরা৷ 

আরও পড়ুন: নড়াইলের হামলাকারীরা অধরা, আকাশ আদৌ ধর্ম অবমাননা করেছিল কিনা, অনিশ্চিত পুলিশ

এরপর ছাত্রীদের রাত ১০টার মধ্যে হলে প্রবেশের বাধ্যবাধকতা বাতিল এবং নিরাপদ ক্যাম্পাসসহ চার দফা দাবিতে উপাচার্যের (ভিসি) বাসভবনের সামনে ২০ জুলাই অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ছাত্রীরা৷ রাত ১০টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তারা সেখানেই অবস্থান করছিলেন৷ 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সেখানে গিয়ে বলেন, ‘চার কার্যদিবসের মধ্যে শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, না হলে আমি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াব৷' তার এই আশ্বাসে ছাত্রীরা আশ্বস্ত হয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করে হলে ফিরে যায়৷ পরদিন থেকে আবারও ক্যাম্পাসে আন্দোলন শুরু করে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো৷

আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক আশরাফি নিতু ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই বারবার ছাত্রীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে৷ এখন চার জন গ্রেফতার হলেও আমাদের আন্দোলন চলবে৷ চার দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন বন্ধ করা হবে না৷ আমরা দেখেছি, সবগুলো ঘটনার সঙ্গেই ছাত্রলিগের কোনও না কোনওভাবে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়৷ ফলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কখনই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি৷ ফলে দিন দিন ক্যাম্পাস ছাত্রীদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে৷ এ কারণেই আমাদের আন্দোলন৷'

এক বছরে আট ছাত্রীকে হেনস্থা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও শাটল ট্রেনে গত এক বছরে ছাত্রী যৌন হয়রানি ও হেনস্থার অন্তত আটটি ঘটনা ঘটেছে৷ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগও গিয়েছে৷ কোনও কোনও ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে৷ কিন্তু ভুক্তভোগীরা বলছেন, আজ পর্যন্ত একটিও ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হয়নি৷ আলোর মুখ দেখেনি তদন্ত রিপোর্ট৷

উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছর আগে গঠিত হয় ‘যৌন হয়রানি নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্র'৷ কমিটির আহ্বায়ক হচ্ছেন উপাচার্য শিরীন আখতার৷ এ কমিটির কাছে তিনটি ঘটনার অভিযোগ জমা পড়লেও এখন পর্যন্ত একটিরও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি৷ কমিটির মেয়াদ পার হয়ে গেলেও নতুন করে আর কমিটি হয়নি৷

গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে হেনস্থার শিকার হন দুই ছাত্রী৷ জড়িত চার জনই শাখা ছাত্রলিগের উপগ্রুপ সিএফসির কর্মী৷ এর বিচারও ছিল তদন্ত কমিটি গঠন পর্যন্তই৷ এরপর গত ১১ অক্টোবর এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে এক নির্মাণ শ্রমিককে আটক করেন শিক্ষার্থীরা৷ তাকে প্রক্টর অফিসে নিয়ে গেলে বিষয়টি স্বীকার করে সে৷ পরে তাকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়৷ 

গত ৩০ জুন ক্যাম্পাসের গোলচত্বর এলাকায় দুই ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করে এক অটোরিকশা চালক৷ এ ঘটনায় প্রক্টরিয়াল বডি একটি মুচলেকা নিয়ে চালককে ছেড়ে দেয়৷ একই দিন এক ছাত্রীকে হেনস্থার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলিগের একজন কর্মীর বিরুদ্ধে৷ওই ছাত্রী প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন৷ তবে কোনও প্রতিকার পাননি৷ এর আগে গত ১৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ে শাটল ট্রেনে ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হন এক ছাত্রী৷ অজ্ঞাতনামা দুই যুবকের বিরুদ্ধে ঐ অভিযোগ ওঠে, সাড়ে তিন মাস হতে চললেও এখনও কাউকে শনাক্তই করা যায়নি৷ সর্বশেষ, গত ১৭ জুলাই প্রীতিলতা হল এলাকায় যৌন নিপীড়নের শিকার হন এক ছাত্রী৷ এ সময় তাকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণও করা হয়৷

(বিশেষ দ্রষ্টব্য : প্রতিবেদনটি ডয়চে ভেলে থেকে নেওয়া হয়েছে। সেই প্রতিবেদনই তুলে ধরা হয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমস বাংলার কোনও প্রতিনিধি এই প্রতিবেদন লেখেননি।)

বন্ধ করুন