বাংলা নিউজ > ঘরে বাইরে > 'ছেলের কিডনির রোগ, ওষুধ লাগে', লকডাউনে দুর্দশায় ঢাকার দিন-আনি-দিন-খাই মানুষরা
লকডাউন চলছে, চরম সমস্যার মুখে দিন-আনি-দিন-খাই মানুষরা। (ছবি সৌজন্য রয়টার্স)
লকডাউন চলছে, চরম সমস্যার মুখে দিন-আনি-দিন-খাই মানুষরা। (ছবি সৌজন্য রয়টার্স)

'ছেলের কিডনির রোগ, ওষুধ লাগে', লকডাউনে দুর্দশায় ঢাকার দিন-আনি-দিন-খাই মানুষরা

  • লকডাউনে বাংলাদেশে রাজধানীর দিন আন দিন খাওয়া মানুষেরা চরম বিপদে পড়েছেন৷ কাজ নেই আবার কোনো সহায়তাও পচ্ছেন না৷

লকডাউনে বাংলাদেশে রাজধানীর দিন-আনি-দিন খাওয়া মানুষেরা চরম বিপদে পড়েছেন৷ কাজ নেই, আবার কোনও সহায়তাও পচ্ছেন না৷ রিকশা চললেও যাত্রী না থাকায় চালকরা দিশেহারা। কাজহীন দিনমজুর ও নির্মাণ শ্রমিকরা৷

কঠোর লকডাউনেও রবিবার বৃষ্টি থামার পর দুপরের দিকে মৎস্য ভবনের সড়কের ফুটপাথে একটি কাঠের বাক্সের ওপর চা, বিস্কুট-সহ আরও কিছু পণ্য সাজিয়ে বসেন লাবণী বেগম৷ কথা বলতে গেলে ইতস্তত বোধ করেন৷ যেন কিছুটা ভয় পেয়েছেন৷ সব কিছু গুটিয়ে চলে যেতে চান৷ তবে সাংবাদিক পরিচয় দিলে কিছুটা আশ্বস্ত হন৷ প্রশ্ন করি, লকডাউনে তো এরকম রাস্তার পাশে দোকান দেওয়া যাবে না৷ বাইরে বের হওয়া নিষেধ৷ কেন বের হয়েছেন? জবাবে জানালেন, তাঁর স্বামী মারা গিয়েছেন৷ একটি ছেলে আছে যে কিডনি রোগে আক্রান্ত৷ সন্তানের চিকিৎসা থেকে শুরু করে সমস্ত ব্যয় তাকে একাই সামলাতে হয়৷ ‘আমার কোন উপায় নেই৷ কারণ এই চা সিগারেট বিক্রির টাকা দিয়েই বাচ্চার চিকিৎসা চলে৷ আমার ছেলের প্রতিদিন রাতে ৩৬০ টাকার ওষুধ লাগে,' বলেন লাবণী৷ তারপরও ঠিকমত বসতে পারেন না৷ পুলিশ এসে তুলে দেয়৷ মালপত্র ফেলে দেয়৷ অন্য জায়গায় গিয়ে বসেন৷ জীবন বাঁচাতে তিনি এখন চোর-পুলিশ খেলতে বাধ্য হচ্ছেন৷

বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে বৃহস্পতিবার থেকে সাত দিনের জন্য ‘কঠোর লকডাউন’ শুরু হয়েছে৷ জরুরি সেবা, শিল্প কারখানা, পণ্য পরিবহনের যানবাহন ও রিকশা ছাড়া আর সব কিছু বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে৷ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া নিষেধ৷

তবে লকডাউনের চতুর্থ দিনে রাস্তায় ব্যক্তিগত যানবাহন একটু বেশি দেখা গিয়েছে৷ লোকজনও কিছুটা বেশি৷ দুপুরে বৃষ্টি থামার পর শ্রমজীবী মানুষকে কাজের আশায় সড়কের মোড়ে মাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়৷ রিকশাচালকরা বিভিন্ন মোড়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করলেও যাত্রী তেমন মিলছে না৷ বাংলা মোটর মোড়ে কথা হয় রিকশাচালক সাদেক মিঞার সঙ্গে বিকেল তিনটার দিকে৷ তিনি আড়াই ঘণ্টা রিকশা চালিয়ে মাত্র ৫০ টাকা রোজগার করেছেন৷ কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না৷ তিনি জানান, তার চারজনের পরিবারের খাবার-সহ অন্যান্য খরচ মেটাতে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০-৬০০ টাকা লাগে৷ স্বাভাবিক সময়ে তিনি প্রতিদিন ৬০০-৭০০ টাকা আয় করতে পারেন৷ কিন্তু এখন ৩০০-৪০০ টাকার বেশি হয় না৷ এরমধ্যে মালিককে দিতে হয় ১০০ টাকা৷ 'ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও যাত্রী পাই না৷ সরকারের দিক থেকে কোনও সহায়তাও পাইনি৷ লকডাউনে কীভাবে সংসার চালাব জানি না৷ সবাইকে না খেয়ে থাকতে হবে,’ বলেন তিনি৷

নির্মাণ শ্রমিক-সহ আরও যাঁরা দিনমজুরের কাজ করেন, তাঁরাও পড়েছেন চরম বিপাকে৷ সোনারগাঁও রোডে এরকম কয়েকজন দুপুরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাজের আশায়৷ তাঁদেরই একজন মফিজুর রাহমান বলেন, ‘লকডাউনেও বের হচ্ছি কাজের আশায়৷ কিন্তু কাজ পাচ্ছি না৷ পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে থাকতে হচ্ছে৷’

লকডাউনের সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ৩৩৩-এ ফোন করলে সহায়তা পাওয়ার কথা৷ কিন্তু তাদের কেউই এই খবর জানেন না, ফোন করা তো দূরের কথা৷ তাঁরা বলেন, এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছেও গিয়েছিলেন। কোনও সহায়তা পাননি৷

হোটেল খোলা আছে৷ কিন্তু সেখান থেকে খাবার নেওয়া যাবে, বসে খাওয়া যাবে না৷ বাংলা মোটরের আমজাদ হোটেলের মালিক আমজাদ মিঞা জানান, ‘সবকিছু বন্ধ থাকায় ক্রেতা নেই৷ যা বিক্রি হয় তা দিয়ে কর্মচারীদের বেতন দেওয়া সম্ভব নয়৷ আবার সামনে কোরবানি৷ বোনাস দেব কীভাবে বুঝতে পারছি না৷’ কষ্টে আছেন পরিবহন শ্রমিকরাও৷

বাংলাদেশে করোনার সময় দারিদ্র্য বেড়ে গেছে৷ এখন কমপক্ষে সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করছেন৷ নতুন দরিদ্রদের অধিকাংশই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী , হোটেল কর্মচারী, রিকশা চালক ও ভাসমান শ্রমিক৷ এই লকডাউনে তারাই সবচেয়ে বিপদে আছেন৷ অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘তাদের খাদ্য সহায়তা খুবই জরুরি৷ নগদ সহায়তাও প্রয়োজন৷ তা নাহলে এই লকডাউনে তারা বিপন্ন হয়ে পড়বেন৷’

তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানান, করোনার সময়ে এই লকডাউনে জরুরি সহায়তা অব্যাহত আছে৷ ৩৩৩-এ ফোন করে করোনার শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১৪ লাখেরও বেশি মানুষকে খাদ্য সহায়তা পেয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘যাঁরা লজ্জায় হাত পাততে পারেন না, তাঁরা এখানে ফোন করলে সহায়তা পান৷ তাঁদের বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়৷ চাল, ডাল, বাচ্চার দুধ যে যেরকম সহায়তা প্রয়োজন সেরকম সহায়তা দেওয়া হয়৷ আর প্রচলিত যে সহায়তা জেলা উপজেলা পর্যায়ে তা অব্যাহত আছে৷’

তিনি জানান, ৩৩৩-এর জন্য রবিবার ১৪ হাজার ১০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে৷ আর প্রত্যেক জেলায় দু'লাখ ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে৷ ইদের জন্য সারাদেশে এক লাখ ১৭৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে এক কোটি ১০ হাজার ৬৫১ পরিবারের জন্য৷ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে ৫০ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে৷ চাল দেওয়া হয়েছে ১০০ টন করে৷ অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনকে ২৫ লাখ টাকা ও ৫০ টন করে চাল দেওয়া হয়েছে৷ ৩২৮ পুরসভার প্রত্যেকটিতে ১০ মেট্রিক টন চাল ও এক লাখ করে টাকা দেওয়া হয়েছে৷

এই সহায়তা সরকারের বিভন্ন সহায়তা কর্মসূচির আওতায় যাঁরা তালিকাভুক্ত, তাঁরাই পাবেন৷ কিন্তু যাঁরা নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন, যাঁরা ভাসমান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, তাঁরা পাচ্ছেন না৷ শহুরে দরিদ্র রিকশা চালক, দিনমজুর, বস্তিবাসীরাও হচ্ছেন বঞ্চিত৷

বন্ধ করুন