বাংলা নিউজ > ঘরে বাইরে > বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের খরচের সিংহভাগ বহন করে বিদেশিরাই
বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের খরচ বহন করে বিদেশিরাই (AFP)

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের খরচের সিংহভাগ বহন করে বিদেশিরাই

  • রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের বাজেটে বরাদ্দ কমে আসছে৷ প্রথম বছর ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩০০ কোটি টাকা৷ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৪০০ কোটি টাকা৷ এরপর প্রতিবছরই গড়ে ৩০০-৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়৷

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য এখন যে টাকা খরচ হয় তার প্রায় পুরোটাই আসে বিদেশি দাতাদের কাছ থেকে৷ তবে যে অর্থের প্রতিশ্রুতি বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থা দেয়, তার ৭০ ভাগের বেশি কখনওই পাওয়া যায়নি৷ আর ইউএনএইচসিআর যে অর্থের চাহিদা প্রতিবছর জানায় তার প্রতিশ্রুতি মেলে অর্ধেকেরও কম৷

চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য প্রতিশ্রুত সহায়তা ২৮৫ মিলিয়ন ডলার হলেও মাত্র শতকরা ৪১ ভাগ, অর্থাৎ ১২৮.২৫ মিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে৷ জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) বলছে, চলতি বছর ইউএনএইচসিআর মোট ৮৮১ মিলিয়ন মর্কিন ডলার সহায়তা চেয়েছে রোহিঙ্গাদের জন্য৷

২০২১ সালে জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান-এর যে হিসাব তাতে দেখা যায় ১০ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গার জন্য মোট ডোনারদের সহায়তা প্রয়োজন ছিল ৯৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের, দিয়েছে ৬৭৪ মিলিয়ন ডলার, যা প্রয়োজনের তুলনায় ২৮ ভাগ কম৷ ২৬৯ মিলিয়ন ডলার সহায়তা পাওয়া যায়নি৷ ২০১৭ সালে প্রয়োজন ছিল ৪৩৪ মিলিয়ন ডলার, পাওয়া গেছে ৩১৭ মিলিয়ন ডলার৷ ২০১৮ সালে ৯৫১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে পাওয়া গেছে ৬৫৫ মিলিয়ন ডলার৷ ২০১৯ সালে ৯২০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে পাওয়া গেছে ৬৯৯ মিলিয়ন ডলার৷ ২০২০ সালে ১০৫৮ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে পাওয়া গিয়েছে ৬২৯ মিলিয়ন ডলার৷ এখানে স্পষ্ট যে, ২০২০ সালের পর থেকে প্রতিশ্রুত সহায়তা কমছে এবং প্রতিশ্রুত সহায়তার গড়ে ৭০ ভাগের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না৷

রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের বাজেটে বরাদ্দ কমে আসছে৷ প্রথম বছর ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩০০ কোটি টাকা৷ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৪০০ কোটি টাকা৷ এরপর প্রতিবছরই গড়ে ৩০০-৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়৷ এই বরাদ্দ রোহিঙ্গাদের খাদ্য, চিকিৎসা, গৃহ নির্মাণ বা শিক্ষার পিছনে ব্যয় হয় না৷ বাংলাদেশ সরকার অর্থ ব্যয় করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ-সহ অন্যান্য কাজে৷ রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের জন্য ভাসানচরে আলাদা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ সরকার সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে নিজস্ব তহবিল থেকে৷ এই প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ৩১২ কোটি টাকা৷

অর্থমন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, চলতি বাজেটে রোহিঙ্গাদের জন্য ২৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে৷ এটা মাল্টি সেক্টরাল ক্রাইসিস রেসপন্স প্রজেক্ট নামে একটি প্রজেক্টের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে৷ এটা কিছু ট্রেনিং প্রকল্প, গাছপালা লাগানো এসব খাতে ব্যয় হয় বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব৷ ব্যয়টা ইউএনএইচসিআর-এর মাধ্যমেই হয়৷

ইউএনএইচসিআর-এর হিসেবে ভাসানচরসহ কক্সবাজারের ২৭টি ক্যাম্পে এখন আশ্রয়প্রার্থী ৯ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৩ জন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ এবং শিশু রয়েছেন৷ পরিবারের সংখ্যা এক লাখ ৯৬ হাজার ২২১৷ তাদের মধ্যে শতকরা ৫২ ভাগই শিশু৷ তবে বাংলাদেশের হিসেবে এখন রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ৷ তারা মোট ৩২ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে অবস্থান করছেন৷

তাদের জন্য মূল সেবাগুলো হল খাদ্য, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, সেনিটেশন, আবাসন, নিরাপত্তা, অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, দুর্যোগ মোকাবেলা প্রভৃতি৷ সহায়তা করে ২৪টি দেশ ও প্রতিষ্ঠান৷ বিভিন্ন দেশের মানুষ ব্যক্তিগতভাবেও ইউএনএইচসিআরের মাধ্যমে সহায়তা করেন৷ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ৯২টি দেশি-বিদেশি এনজিও কাজ করছে ইউএনএইচসিআর-এর অর্থ সহায়তায়৷ তারা অর্থ খরচের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে জবাবদিহি করে না৷ তাদের কাজ করার কথা বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের সমন্বয়ে৷ ক্যাম্পে এখন রোহিঙ্গাদের সেবাদানের ২৫ ধরনের প্রকল্প চালু আছে৷

বাংলাদেশের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য সরকারিভাবে আমাদের কোনও খরচ নেই৷ তাদের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, জ্বালানি, বাসস্থান এগুলো দেখে ইউএনএইচসিআর, আইওএম এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম৷ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেখে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গ্যানাইজেশন৷ শিক্ষা দেখে ইউনিসেফ৷ তাদের সঙ্গে দেশি ও বিদেশি এনজিও কাজ করে৷ তবে প্রতিবছরই বাংলাদেশ সরকারের ৫০০ কোটি টাকা করে বাজেট থাকে৷ সেটা প্রয়োজন হলে খরচ করা হয়৷ কিন্তু প্রয়োজন হয় না৷ আর কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়৷ ভাসানচরের প্রজেক্টটা শেষ করতে সরকারের দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে৷ কিন্তু এখন সেখানে আমাদের আর কোনও খরচ নেই৷’’ ভাসানচরে এখন ২০ হাজার ১৬০ জন রোহিঙ্গা আছেন এখন৷

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)-র চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিক বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য আমাদের ওপর এখন আর্থিক চাপ নেই৷ কিন্তু চাপটা হলো তারা আমার দেশের মাটিতে আছেন৷ আমার ভূমিতে আছেন৷ তাদের সার্বিক দেখভাল আমাদের করতে হয়৷ তারা তো আমাদের নাগরিক নয়৷ তাদের এখানে রাখা তাদের ম্যানেজ করা সেটা আমাদের সমস্যা৷ বাইরের রাষ্ট্রগুলোর রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যে দায়িত্ব পালনের কথা, তারা তা করছে না৷ তারা এখন যেভাবে এটাকে দেখছে, তাতে এই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানেরও কোনও সম্ভাবনা দেখছি না৷’’

তার কথা, ‘ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ডোনাররা ফান্ড কমিয়ে দিচ্ছে৷ তাদের মনযোগ এখন ইউরোপের শরণার্থীদের দিকে৷ সাদা চামড়ার শরণার্থীদের জন্য মনে হয় তাদের দরদ বেশি৷’ রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের পরিবেশ, প্রতিবেশের ক্ষতি হচ্ছে৷ গাছপালা ও বন উজার হচ্ছে৷ কক্সবাজার অঞ্চল নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছে৷ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা মানবিক কারণে এখানে আছেন৷ এর সঙ্গে পরিবেশের যোগ খোঁজা ঠিক নয়৷ সারা দেশে বন উজাড় করা হচ্ছে, গাছপালা কাটা হচ্ছে, সেদিকে আমাদের নজর নেই৷ আর নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বাড়িয়ে বলে আসলে আইন-শৃঙ্খলায় নিয়োজিতদের জন্য বাজেট বাড়ানো হয়৷ তারা ক্যাম্পের মধ্যে থাকেন৷ সেখানে যে পরিবেশে থাকেন, তাতে সামাজিক অপরাধ হতেই পারে৷’

ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে যাতে কোনও সংকট না হয় তাই রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও খাদ্য সহায়তাসহ নানা ধরনের প্রকল্প চালু আছে৷ তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহে দাতাদের সঙ্গে কক্সবাজারে আমার বৈঠক হয়েছে৷ তারা রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছে৷’ ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর আট লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়৷ তাদের সংখ্যা এখন ১২ লাখে দাঁড়িয়েছে৷ এ পর্যন্ত নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার৷ বাংলাদেশ এ পর্যন্ত আট লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জনের তালিকা দিয়েছে মায়ানমারকে৷

বন্ধ করুন