বাংলা নিউজ > ঘরে বাইরে > বাংলার যুবকের কাছে জব্দ চিন, উহান ল্যাবের পর্দা ফাঁস করছেন একদল অনুসন্ধানকারী
উহান ল্যাব, ছবি সৌজন্যে রয়টার্স
উহান ল্যাব, ছবি সৌজন্যে রয়টার্স

বাংলার যুবকের কাছে জব্দ চিন, উহান ল্যাবের পর্দা ফাঁস করছেন একদল অনুসন্ধানকারী

  • করোনা ভাইরাসের খবর যখন প্রথম প্রকাশ্যে এসেছিল, তখন বহু মানুষই চিনের দাবি মেনে নিয়ে মনে করেছিলেন, এই ভাইরাস ছড়িয়ে উহানের বাজার থেকে।

একবছরেরও বেশি সময় ধরে করোনা জ্বরে আক্রান্ত বিশ্ব। এই অতিমারীর খবর যখন প্রথম প্রকাশ্যে এসেছিল, তখন বহু মানুষই চিনের দাবি মেনে নিয়ে মনে করেছিলেন, এই ভাইরাস ছড়িয়েছে উহানের বাজার থেকে। তবে ধীরে ধীরে এই অতিমারী যত ভয়ঙ্কর হয়েছে, তত এই ভআইরাসের উত্স সংক্রান্ত মত বদলেছে। এখন বহু মানুষই মনে করে থাকেন যে এই ভাইরাস ছড়িয়ে থাকতে পারে উহানের বায়ো-ল্যাব থেকে। তবে এই তত্ত্ব সামনে এলেই সবার আগে মনে হয় প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা। কারণ তিনি এই তত্ত্ব প্রথমবার দৃঢ়তার সঙ্গে স্থাপন করেছিলেন সবার সামনে। ভুল! এই তত্ত্বের প্রমাণ প্রথমবার বিশ্বের সামনে এনেছেন এক বাঙালি। যদিও তিনি কোনও বৈজ্ঞানিক নন। সেই বাঙালির সঙ্গে রয়েছেন একদল জেদি অনুসন্ধানকারী। সেই বাঙালি সম্প্রতি নিউজউইকের সঙ্গে ইমেল মারফত কথা বলেন।

করোনা যে চিনা ল্যাব থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা মানতে চাননি অনেকেই। মিডিয়াতেও প্রাথমিক ভাবে বলা হয়েছিল যে উহানের বাজার থেকেই ছড়িয়েছে এই ভাইরাস। তবে এই দাবির নেপথ্যে ছিল প্রাণী বিজ্ঞানী পিটার ডাসজাক। উল্লেখ্য, ডাসজাক নিজে উহানের ল্যাবের এই গবেষক, শি ঝেংলির সঙ্গেসঙ্গে মিলে কাজ করছিলেন সেই সময়। তখন এদিক সেদিক থেকে কথা উড়ে আসছে যে এই ভাইরাস হয়তি চিনা ল্যাবে তৈরি হয়েছিল। সেই সময় এই বিজ্ঞানী বেশ কয়েকনের সঙ্গে মিলে ল্যানসেটে একটি প্রতিবেদন লিখে দাবি করেন, যদি কেউ এই ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব সামনে আনতে চান যে করোনা ভাইরাস ল্যাবে তৈরি, তাহলে তারা ভুল এবং আমরা এর নিন্দা জানাচ্ছি। এরপর মিডিয়া আরও বেশি করে চিনের দাবি মেনে প্রচার করতে থাকে যে উহানের বাজার থেকে ছড়িয়েছে করোনা। সেই সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনৈতিক কারণে চিনকে আক্রমণ করতে ল্যাবের সেই তত্ত্ব সামনে আনলেও তাঁর মুখ্য স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ডঃ ফাউসি সেই তত্ত্বকে খারিজ করেন। যদিও, পরবর্তীতে ফাউসি নিজে পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে উহান ল্যাবকে সব তথ্য জনসমক্ষে আনতে বলেন।

এদিকে ডাসজাক যখন উহানের ল্যাব থেকে করোনা ছড়িয়ে পড়ার তত্ত্বকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করছেন, সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের এক যুবক ইন্টারনেটে এই তত্ত্ব নিয়ে খোঁজ শুরু করে। বাঙালি সেই যুবকের নাম জানা না থাকলেও টুইটারে তাঁর অ্যাকাউন্টের নাম 'দ্য সিকার' (The Seeker)। তিনি নিউজউইকের সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলেন। সিকার সেই সময় থেকেই ডাসজাকের তত্ত্বকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। সেই সময় তিনি বহু বিশেষজ্ঞের সঙ্গেও এই বিষয়ে কথা বলেন। লেই সময় কানাডার এক ব্যবসায়ী ইউরি ডাইজিন একটি ভাইরাস নিয়ে পোস্ট করেন। RaTG13 নামক সেই ভাইরাসটি বিশ্বের সামনে এনেছিলেন উহান ল্যাবের গবেষক শি ঝেংলি (ডাসজাকের সহকর্মী)। RaTG13 নামক সেই ভাইরাসটির জেনেটিক চরিত্র SARS-CoV-2 (করোনা ভাইরাস)-এর খুব কাছে। নিজের প্রকাশিত গবেষণা পত্রে শি ঝেংলি এটা স্পষ্ট করে জানাননি যে RaTG13 নামক সেই ভাইরাসটির উত্স স্থল কোথায়। শি শুধু জানিয়েছিলেন, এই ভাইরাসটি দক্ষিণ চিনে এখ বাদুড়ের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল। আর তাই ডাইজিনের মনে প্রশ্ন যাগে, এই RaTG13 থেকেই কি করোনা ভাইরাস তৈরি হয়ে থাকতে পারে? এদিকে RaTG13 নিয়ে ইউরি ডাইজিনের করা পোস্টটি 'দ্য সিকার' রেডিটে পোস্ট করেন। তবে সেই পোস্টের পরই 'দ্য সিকার'-এর অ্যাকাউন্টটি স্থায়ী ভাবে সাসপেন্ড করা হয়।

এই 'সেন্সরশিপ' সিকারের কৌতুহল কেয়কগুণ বাড়িয়ে দেয়। এরপরই টুইটারে এই সংক্রান্ত আলোচনা করা মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন সিকার। প্রচুর ইঞ্জিনিয়ার এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা হয় সিকারের। পাশাপাশি ইনসব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এ কমাইক্রোবায়োলজিস্ট রোসানা সেগ্রেটোর সঙ্গেও কথা হয় সিকারের। তাঁরা সবাই এখটি ফোরাম তৈরি করেন, এর নাম দেওয়া হয় ড্রাস্টিক (DRASTIC)। বহু বিষয় খতিয়ে দেখে ড্রাস্টিক দাবি করে যে RaTG13 ভাইরাসটি দক্ষিণ হুনান প্রদেশের মোজিয়াং কাউন্টির এক খনি থেকে এসেছে। ২০২১ সালে এখানে ৬ জন খনির কর্মী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। বাদুড়ের মলসার সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁরা আক্রান্ত হন। এদের তিনজন প্রাণ হারান। উহান ল্যাবের শি দাবি করেছিলেন যে এই কর্মীরা ফাঙ্গাসের সংক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিলেন। তবে ড্রাস্টিকের সদস্যরা সেই দাবি মানতে নারাজ। তাঁরা মনে করতে থাকেন যে করোনার মতো কোনও ভাইরাসের জেরে এই লোকেরা সংক্রমিত হয়েছিলেন।

এই সময়ে সিকার ইন্টারনেটে চিনা শিক্ষাবিদদের এক ডেটাবেস থেকে জার্নাল খুঁজে বের করেন। গুগল ট্রান্সলেটের সাহায্যে সেসব নথি থেকে মোজিয়াং সংক্রান্ত একটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েটের থিসিস পেপার খুঁজে বের করেন সিকার। সেখানে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা হয়, মোজিয়াংয়ের সেই নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গ সার্সের মতো ভাইরাসের সংক্রমণের কারণেই হয়েছে। এরপর চিনা সিডিসি-র আরও একটি গবেষণা পত্র খুঁজে পান সিকার। সে ড্রাস্টিকের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে সেই নথি শেয়ার করেন। তবে এরপরই চিন তাদের ডেটাবেসের অ্যাক্সেস বদলে দেয়। এরপর আর কেউ তা খুঁজে পায়নি।

এরপর মোজিয়াংয়ের কো-অর্ডিনেট খুঁজে বের করেন ড্রাস্টিকের সদস্যরা। তবে তাঁরা মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেননি। তবে এরপরে ২০২০ সালের শেষের দিকে বিবিসি, এনবিসি, এপি, সিবিএস মোজিয়াংয়ে যেতে চাইলে তাদের আটকানো হয় চিনা কর্তৃপক্ষের তরফে। শেষ পর্যন্ত ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের এক রিপোর্টার বাইকে করে মোজিয়াংয়ের সেই খনিতে পৌঁছান। তবে সেই রিপোর্টারকে আটক করে পাঁচ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ চালায় চিনা গোয়েন্দারা।

এই সময়ে ড্রাস্টিকের এক সদস্য ফ্র্যান্সিস্কো দে আসিস দে রিবেরা। তিনি মাদ্রিদের এক ডেটা সায়েন্টিস্ট। এরপর থেকে সিকার নতুন নতুন তথ্য খুঁজে বের করতে থাকলেন। এবং রিবেরা সেই তথ্যগুলোকে একে একে ছকে সাজাতে থাকলেন। এরপরই প্রশ্ন ওঠে, চিনের উহান ল্যাব কি RaTG13 নিয়ে গবেষণা করছিল? যদিও ডাসজাক দাবি করেন RaTG13 সার্স-এর মতো ভাইরাস ছিল না। তাই এই সংক্রান্ত গবেষণা করা হয়নি। যদিও এই দাবি পুরো মিথ্যে। কারণ আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে RaTG13-এর জেনেটিক সিকুয়েন্স আপলোড করেছিল উহানের ল্যাব। এটি তখনই করা হয়, যখন এই সংক্রান্ত কোনও গবেষণা পত্র প্রকাশ করা হয়। এবং উহানে ডাসজাকের সহকর্মী শি এই সংক্রান্ত নথি প্রকাশ করেছিলেন। ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে উহানের ল্যাব সক্রিয়ভাবে RaTG13 নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছিল। এরপরই আরও খোঁজাখুঁজির পর রিবেরা জানতে পারেন, মোজিয়াংয়ের খনি থেকে সার্সের মতো একটি নয়, বরং মোট ৯টি ভাইরাস পেয়েছিল চিন। তবে এই সংক্রান্ত তথ্য চিন তাদের ডেটাবেস থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হলে, শি বলেন যে করোনার পরিস্থিতিতে সাইবার হামলার আশঙ্কায় সেই তথ্য অফলাইনে সংরক্ষিত করা হয়েছে। যদিও ড্রাস্টিক জানতে পারে, ২০১৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বরেই এই সংক্রান্ত তথ্য অনলাইন থেকে সরিয়ে দেয় চিন। অতিমারী শুরু হওয়ার সঙ্গে এই তথ্য অফলাইন করে দেওয়ার সময়কাল আশ্চর্যভাবে মিলে যাচ্ছে।

২০২১ সাল আসতে আসতে ড্রাস্টিক এত তথ্য সংগ্রহ করে ফেলে যে তাদের একটি ওয়েবসাইট লঞ্চ করতে হয়। অবশ্যই ড্রাস্টিকের এই তথ্য এটা প্রমাণ করে না যে উহান ল্যাব থেকেই করোনা ছড়িয়েছে। তবে এই তথ্যগুলি সেই দাবিকো আরও জোরদার করেছে। এবং এই কারণে আরও বেশি করে উহান নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত।

বন্ধ করুন