বাংলা নিউজ > ঘরে বাইরে > বাইডেনের ওপর বেশি প্রত্যাশা না রাখাই ভাল
নবনির্বাচিত মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন।  (AP)
নবনির্বাচিত মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন।  (AP)

বাইডেনের ওপর বেশি প্রত্যাশা না রাখাই ভাল

  • সৌদি আরব বাদে প্রায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যেই গণতন্ত্র পাচার বা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষকে যখন ওবামা আমেরিকান অত্যাধুনিক ড্রোন আর এফ ১৬ বিমান থেকে ফেলা বোমার স্বাদ দিচ্ছেন তখন এই বাইডেনই ছিলেন তার নম্বর টু, অর্থাৎ উপরাষ্ট্রপতি।

বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য

বাইডেন ঠিক যেন ওবামার মতোই । বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন , ওবামাও এসেছিলেন । এসেই শান্তির জন্য নোবেল পেয়েছিলেন। অথচ বিদায় বেলায় তার মুকুটে জুড়েছিল যুদ্ধবাজের তকমা কারন সাত বছরে ওবামা করেছিলেন সাত দেশের বিরুদ্ধে সাত যুদ্ধ । 

জুনিয়র বুশের পরে ওবামা আসায় সকলে ভেবেছিলেন এবার হয়ত পৃথিবী জুড়ে মার্কিন সন্ত্রাস ও আগ্রাসনে লাগাম পরবে কিন্তু হয়েছিল উল্টো। ঠিক এবারেও বাইডেন আসায় সকলেই সেরকম ভাবছেন কিন্তু সেটা আদৌ হবে কিনা বলা মুশকিল। একথা ঠিক যে , ট্রাম্প ছিলেন যেমন নিজের দেশের গণতন্ত্রের পক্ষে বিপদজনক তেমনি গোটা দুনিয়ার গণতান্ত্রিক ধ্যান ধারনার পক্ষেও অশনি সংকেত। তাই ট্রাম্প হারায় যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে আমেরিকা সহ গোটা দুনিয়ার গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ। কিন্তু বাইডেন যে দ্বিতীয় ওবামা হবেন না তার কোনও গ্যারান্টি নেই।

সৌদি আরব বাদে প্রায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যেই গণতন্ত্র পাচার বা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষকে যখন ওবামা আমেরিকান অত্যাধুনিক ড্রোন আর এফ ১৬ বিমান থেকে ফেলা বোমার স্বাদ দিচ্ছেন তখন এই বাইডেনই ছিলেন তার নম্বর টু, অর্থাৎ উপরাষ্ট্রপতি। তাই সেই বাইডেনই আজ হঠাৎ করে শান্তির দূত হয়ে উঠবেন এরকম ভাবা ঠিক হবে না। 

আসলে পুঁজিবাদের দ্বারা পরিচালিত আমেরিকার দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাটা এরকমই যে দু'টো খারাপের মধ্যে থেকেই বারবার আমেরিকানদের বেছে নিতে হয়। গত পাঁচ বছরে শুধু আমেরিকাই নয়, গোটা বিশ্বের একনায়ক ও ফ্যাসিস্ত সুলভ শাসকদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে গেছেন ট্রাম্প। ন্যূনতম যেটুকু গণতন্ত্র আমেরিকা-সহ পৃথিবীতে আছে , সেটুকুই চরম হুমকির মুখে পড়েছিল। বস্তুত গোটা পৃথিবীর বৃহৎ ও শক্তিশালী দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠই আজ এই সমস্যায় জর্জরিত – অর্থাৎ গণতন্ত্রের ব্যপক সঙ্কোচন। রাশিয়া , তুর্কি , ইজরায়েল , ব্রাজিল , ভারত – এদের দিকে লক্ষ্য করলেই ব্যাপারটা ভালো বোঝা যাবে। গণতন্ত্রের পরিস্ফুটনে অপরিহার্য রাষ্ট্রীয় স্তম্ভগুলোর বেশিরভাগই আজ চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত , যেমন – স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসন , কার্যকারী পার্লামেন্ট , সর্বোপরি দেশের সংবিধান। 

ট্রাম্পের চার বছরের শাসনকালে তিনি যা ইচ্ছে করেছে বলেছেন , টুইট ঠুকেছেন । অজস্র মিথ্যে কথা বলেছেন। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার ফ্যাক্ট চেক হিসাব অনুযায়ী, চার বছরে ট্রাম্প ৩০,৫৭৩টি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর কথা বলেছেন। সংবিধানকে কোনরকম তোয়াক্কা করেননি। ছিলেন একেবারেই চূড়ান্ত বেপরোয়া। কফিনে সর্বশেষ পেরেকটি ঠুকেছেন তার উগ্র সমর্থকদের দিয়ে মার্কিন ক্যাপিটল ভবনে বেপরোয়া হামলা চালিয়ে যেটা ১৯৩৩-এর উগ্র নাজিদের আচরণের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্প এর এই একনায়ক ও বর্ণবাদী শাসনের ফলেই বাইডেনের মতো যুদ্ধানুরাগী মানুষেরও বৈধতা পেতে বিশেষ অসুবিধে হয়নি। নিজের দেশে শান্তি ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বারংবার বলে বাইডেন সফল।

মার্কিন রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো মানুষজন এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ট্রাম্প এবং বাইডেন এই দু'জনের কাজকর্মের ব্যাপারে এখনও ধোঁয়াশায় আছেন। ট্রাম্প ক্ষমতাচ্যূত হলেও ট্রাম্পজিম কতটা দূর হবে সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে ক্যাপিটলে হামলার ঘটনায় এই সংশয় বেশ জোরালোই হয়েছে । মনে রাখতে হবে, ভোটের শতাংশের হিসেবেও ৪৭ শতাংশ মানুষ কিন্তু ট্রাম্পের পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন। চার বছর ধরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যে বিষোদ্‌গার করা হয়েছে, ট্রাম্পের উগ্র সমর্থকদের মধ্যে যে ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে চারদিকে তাঁদের বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তাঁদের যেভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলা হয়েছে এবং সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি পদদলিত করে যেভাবে সাদা আর কালো মানুষদের মধ্যে বিভক্তির মানসিকতা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কিন্তু পূর্ণমাত্রায় বজায় রয়েছে ।

 সর্বোপরি, ট্রাম্প ভোটের ফল এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বাইডেনের বিজয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির ভয়ানক ক্ষতি করেছেন। তিনি ভোটের ফল মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি হয়নি; সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্বাচিত সরকারের হাতে মসৃণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করার বিষয়টিও চূড়ান্তভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। মার্কিন সমাজকর্মী ও সমাজবিদরা বিপদ দেখছেন এইসব ঘটনায়। তাঁদের মতে যে ফ্যাসিবাদের ভিত ট্রাম্প গেঁথে দিয়ে গেছেন সেটা সহজে দূর হবে না। ট্রাম্প হয়তো ফ্যাসিস্ত হয়ে ওঠার সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারেননি কিন্তু আগামী দিনে তার দেখানো এই পথে শক্তিশালি কেউ এসে ফ্যাসিস্ত একনায়ক হয়ে যেতেই পারেন।

উল্টোদিকে বাইডেন শুরুতে এসে ট্রাম্পের বাতিল করে যাওয়া কিছু কর্মকাণ্ডকে ফিরিয়ে আনতে চলেছেন। যেমন প্যারিস জলবায়ু চুক্তি হোক অথবা স্বল্প পরিসরে ইরান চুক্তি ফিরিয়ে আনা আর কিছু মুসলিমদেশের থেকে আগত মানুষের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া ইত্যাদি। কিন্তু এর সাথে সাথেই মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় যুদ্ধের মেঘও ঘনাতে পারে। ওয়াশিংটনে ইতিমধ্যেই যুদ্ধের কারবারি তথা অস্ত্র ব্যবসায়ীরা বেশ উৎফুল্ল। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে বাইডেনের নীতি তার পূর্বসূরি ডেমোক্র্যাট রাষ্ট্রপতিদের মতোই পরিষ্কার - গণতন্ত্র, মানবাধিকার কিংবা নারী স্বাধীনতা নয়, বরং ধর্ম, ভাষা এবং শিয়া-সুন্নি বিরোধকে উসকে দিয়ে সংঘর্ষ জারি রাখা আর সেই সুযোগে গণতন্ত্র স্থাপনে এগিয়ে গিয়ে তেল , গ্যাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের দখল নেওয়া। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি কমবেশি এটাই। উল্লেখ্য , মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সমন্বয়ক হিসেবে বাইডেন ইতিমধ্যেই ব্রেট ম্যাকগার্ককে নিয়োগ করেছেন। সিরিয়া ভেঙে যে তিন-চারটি নতুন রাষ্ট্রের চিত্র অঙ্কন করা হয়েছিল, তা অনেকটাই ছিল এই ম্যাকগার্কের চিন্তাপ্রসূত যা সিরিয়াকে পরিণত করেছে শ্মশানে। তাই মার্কিন প্রশাসনে ব্রেট ম্যাকগার্কের ফিরে আসা এটাই প্রমাণ করছে যে বাইডেনের আমলে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সমাধান তো মিলবেই না বরং যুদ্ধের পরিধি বিস্তৃত হতে পারে। লিবিয়ার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে, বিভক্ত করা হতে পারে তেল সমৃদ্ধ এই দেশকে। 

এছাড়াও বাইডেনের নতুন বিদেশমন্ত্রী ব্লিংকেন হলেন ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের এবং বর্তমান ইয়েমেন যুদ্ধের মূল মাথা। তিনি ইতিমধ্যেই বলেছেন জেরুজালেমেই থাকবে মার্কিন দুতাবাস আর ভেনেজুয়েলার মাদুরোকে শিক্ষা দিতেও তারা বদ্ধপরিকর। ছেড়ে কথা বলা হবে না রাশিয়া আর চিনকেও। ফলে শুরুতেই কিন্তু বাইডেন প্রশাসনের লক্ষ্য স্থির।  

তাই ট্রাম্পের হারে আমেরিকা তথা বিশ্বের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষজন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও সেটা দীর্ঘস্থায়ী হবে কিনা বলা মুশকিল। কারণ, একদিকে আবার আমেরিকার ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র ভয়, অন্যদিকে নব্য ফ্যাসিস্টদের উত্থান – দুটোই চিন্তায় রাখবে। এই মুহূর্তে নব উদার অর্থনীতির থাবায় আমেরিকা সহ গোটা বিশ্বে কাজ হারিয়েছেন কোটি কোটি মানুষ , তাদের আশু সমস্যা সমাধানের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্পও দেখাননি, পুঁজিবাদের পরম মিত্র বাইডেনেরও তা অগ্রাধিকারে নেই।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। 

 

বন্ধ করুন