অসমের গোয়ালপাড়ার মাটিয়াতে ৪৬ কোটি টাকা খরচ করে তৈরি হয়েছে দেশের বৃহত্তম ডিটেনশন ক্যাম্প।
অসমের গোয়ালপাড়ার মাটিয়াতে ৪৬ কোটি টাকা খরচ করে তৈরি হয়েছে দেশের বৃহত্তম ডিটেনশন ক্যাম্প।

মোদী জল্পনা ওড়ালেও অসমে প্রায় সম্পূর্ণ বৃহত্তম ডিটেনশন ক্যাম্প

  • ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকছে চার তলা আবাসন, কর্মীদের থাকার কোয়ার্টার, শৌচাগার, হাসপাতাল, স্কুল, অফিস কমপ্লেক্স, রান্নাঘর, খাওয়া ও মেলামেশার জায়গা। গোটা শিবির ঘিরে রেখেছে ২০-২২ ফিট উচ্চতার কংক্রিট পাঁচিল।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আশ্বাসের মাঝেই অসমে দেশের বৃহত্তম ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরির কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছেন নির্মাণকর্মীরা।

সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের নজরে চিহ্নিত অবৈধ মুসলিম বাসিন্দাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক রাখার কেন্দ্রীয় সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধীদের জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গত ২২ ডিসেম্বর তাঁর ভাষণে মোদী অভিযোগ করেন, ‘কংগ্রেস, তার সঙ্গীরা এবং কিছু শহুরে নকশালরা বলে বেড়াচ্ছে যে সমস্ত মুসলিমকে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক রাখা হবে।’

বিরোধীদের আশঙ্কা যে খুব অমূলক নয় তার কিছু আভাস পাওয়া গিয়েছে অসমের গোয়ালপাড়ার মাটিয়াতে ৪৬ কোটি টাকা খরচ করে তৈরি ডিটেনশন ক্যাম্পের আয়তনে। রাজধানী গুয়াহাটি থেকে ১২৯ কিমি দূরে ২৫ বিঘে জমির উপর তৈরি এই ক্যাম্পে ৩,০০০ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

নির্মীয়মান ডিটেনশন ক্যাম্পের এক নির্মাণকর্মী মুকেশ কসুমাতারি জানিয়েছেন, ‘এই মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করার কথা ছিল, কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছে। যত তাড়াতাড়ি কাঁচামাল পাওয়া যায়, ততই দ্রুত কাজ শেষ হবে।’

বিশাল এই ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকছে চার তলা আবাসন, যার প্রতিটিতে ২০০ মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া থাকছে কর্মীদের থাকার কোয়ার্টার, শৌচাগার, হাসপাতাল, স্কুল, একটি অফিস কমপ্লেক্স, রান্নাঘর, খাওয়া ও মেলামেশার জায়গা। গোটা শিবির ঘিরে রেখেছে ২০-২২ ফিট উচ্চতার কংক্রিট পাঁচিল।

নির্মীয়মান ডিটেনশন ক্যাম্পের বাইর রাতারাতি গজিয়ে উঠেছে বেশ কিছু চায়ের দোকান। সেখানে বসে স্থানীয় বাসিন্দা বিপুল কলিতা বললেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার যে হেতু আমাদের গ্রামের কাছাকাছি এই ক্যাম্প তৈরি করেছে, আমাদের আশা গ্রামের অনেকে এখানে চতুর্থ শ্রেণির কর্মী হিসেবে চাকরি পাবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রকীয় সরকারি আধিকারিকরা জানিয়েছেন, আগামী মার্চ মাসের মধ্যে ডিটেনশন সেন্টার তৈরির কাজ শেষ হয়ে যাবে। রাজ্যের অন্যত্র তৈরি হওয়া ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর আগে অবৈধ বাসিন্দাদের আগে এই শিবিরে নিয়ে আসা হবে।

অসমজুড়ে এমনই ১০টি ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করেছে কেন্দ্র, যেখানে চলতি বছরে চালু করা এনআরসি বাবদ রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৬% অর্থাত্ প্রায় ১৯ লাখ মানুষকে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের রাখার জন্য গুয়াহাটি হাইকোর্টের নির্দেশে গোয়ালপাড়া, কোকড়াঝাড়, যোরহাট, ডিব্রুগড়, তেজপুর ও শিলচরের জেলের ভিতরে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি অসমের মুখ্যমন্ত্রী তথা বিডেপি নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দাবি, ‘গুয়াহাটি হাইকোর্টের নির্দেশে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার কোনও ডিটেনশন ক্যাম্প বানায়নি বলে তাই প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন।’

যদিও কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈয়ের যুক্তি, ২০১৮ সালে গোয়ালপাড়ার মাটিয়ায় দেশের বৃহত্তম ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরির জন্য ৪৬ কোটি টাকা মঞ্জুর করে কেন্দ্রীয় সরকার। হঠাত্ প্রধানমন্ত্রী বলে দিলেন, কোনও ডিটেনশন সেন্টার নেই।

সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালে অসম অ্যাকর্ড সই করার সময় থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত প্রায় ১,২৯,০০০ মানুষকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করেছে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল। তাঁদের মধ্যে ৭৩,০০০ মানুষকে ফেরত অথবা ডিটেনশন ক্যাম্পে না পাঠালেও তাঁরা নিখোঁজ হয়েছেন।

অসম সরকারের নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত রাজ্যের ঝছয়টি ডিটেনশন ক্যাম্পে মোট ৯৮৮ জন অবৈধ বাসিন্দাকে রাখা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৯৫৭ জনকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ৩১ টি শিশু মায়ের সঙ্গে এই সমস্ত ক্যাম্পে থাকছে। এ পর্যন্ত মোট ২৩৮ জন আটকের মৃত্যু হয়েছে।

এনআরসি চূড়ান্ত তালিকায় নাম না থাকলেও ১৯ লাখ মানুষকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়নি। তাঁদের ফেরনার্স ট্রাইব্যুনালের কাছে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে, অন্যথায় তাঁদের ডিটেনশন ক্যাম্পে ঠাঁই হবে।

বন্ধ করুন