প্রয়াত এনসিপি নেতা তথা জরুরি অবস্থায় ছাত্র আন্দোলনের পুরোধা ডি পি ত্রিপাঠি।
প্রয়াত এনসিপি নেতা তথা জরুরি অবস্থায় ছাত্র আন্দোলনের পুরোধা ডি পি ত্রিপাঠি।

রুদ্ধ হল চিরপ্রতিবাদী কণ্ঠ, প্রয়াত এনসিপি নেতা ডিপি ত্রিপাঠি

  • প্রয়াত হলেন বর্ষীয়ান এনসিপি নেতা ডি পি ত্রিপাঠি। বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তিনি বেশ কিছু দিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে।

প্রয়াত হলেন বর্ষীয়ান এনসিপি নেতা ডি পি ত্রিপাঠি। বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তিনি বেশ কিছু দিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে।

জরুরি অবস্থায় ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম দিশারি হিসেবে খ্যাত ডিপি ত্রিপাঠির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে এনসিপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে বৃহস্পতিবার টুইট করেন, ‘শ্রী ডি পি ত্রিপাঠিজির প্রয়াণের সংবাদে গভীর শোকগ্রস্ত। তিনি এনসিপি-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং আমাদের সকলের পথপ্রদর্শক ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আমরা তাঁর জ্ঞানদীপ্ত পরামর্শ এবং সুচিন্তিত নির্দেশের গভীর অভাববোধ করব, যা এনসিপি গঠনের প্রথম দিন থেকে পেয়ে এসেছি। তাঁর পরিবারের সকলের প্রতি হার্দিক সমবেদনা জানাই।’

ভারতীয় রাজনীতির মঞ্চে ডিপি ত্রিপাঠির অভিষেক ঘটে সত্তরের দশকে, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দেশে জরুরি অবস্থা জারি করার পরে। আদতে উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা ত্রিপাঠি দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্বিদ্যালয়ে ভরতি হওয়ার পরে এসএফআই-এর সদস্য হন এবং কালক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছা্ত্র সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৭৫ সালের ২৫ জুন সে সময়কার কংগ্রেস সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার পরেই জেএইউ-তে হানা দেয় পুলিশ। গ্রেফতারি এড়িয়ে ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে থাকেন ত্রিপাঠি, ছাত্রমহলে যিনি ততদিনে ডিপিটি নামে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ মানেকা গান্ধি এলে, তাঁকে জরুরি অবস্থা বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার আবেদন জানান ডিপিটি। ক্ষুব্ধ মানেকার প্রতিক্রিয়ার রেশ ধরে পুলিশ ছাত্রনেতার সন্ধানে মরিয়া হয়ে ফের তল্লাশিতে নামে।

কখনও সহপাঠিদের হস্টেলের ঘরে আবার কখনও বড়াখাম্বা রোডের ধোপাদের মহল্লায় গা-ঢাকা দিয়ে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে আন্দোলন জোরদার করে তোলেন ত্রিপাঠি। শেষ পর্যন্ত নভেম্বর মাসে তাঁকে গ্রেফতার করে তিহাড় জেলে পাঠানো হয়, যেখানে তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানান তত্কালীন তরুণ বিরোধী নেতা অরুণ জেটলি। তাঁর সঙ্গে এর পর জেটলির মৃত্যু পর্যন্ত অটুট বন্ধুত্ব বজায় ছিল ডিপিটির।

জেটলির মতোই ডিপিটির সঙ্গে চার দশকজুড়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় ছিল নেপালের গণতান্ত্রিক নেতা প্রদীপ গিরির। নেপালে রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে আগাগোড়া জড়িয়ে পড়েন ডিপিটি। ১৯৮৯-৯০ সালে নেপালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে উল্লেখযোগ্য কাঠমান্ডু বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। পরে যখন মাওবাদী বিপ্লবীদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে গোটা নেপাল জ্বলছে, সেই সময় রাজনৈতিক সমাধানের সূত্র সন্ধানে নেমে পড়েন ত্রিপাঠি।

২০০৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি যখন রাজা জ্ঞানেন্দ্র সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন, সেই সময় নেপালের যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পীঠস্থান হয়ে ওঠে দিল্লি। পরিস্থিতির দাবি মেনে সেই সময় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের গুরুত্বপূর্ণ আহ্বায়কের ভূমিকা পালন করেন ডিপিটি, এবং এ ভাবেই নেপালের জনগণের প্রতি সৌভ্রাতৃত্বের বার্তা পাঠান ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রবক্তারা। দিল্লির বসন্তকুঞ্জে তাঁর বাড়িতেই নেপালের মাওবাদী নেতা প্রচণ্ড এবং বাবুরাম ভট্টরাই সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি ও অন্যান্য ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় একাধিক সমাধান সূত্রের হদিশ পাওয়া যায়।

শেষ পর্যন্ত মাওবাদী এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের যৌথ ধাক্কায় ক্ষমতাচ্যূত হন রাজা জ্ঞানেন্দ্র। নেপালে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন হলে কাঠমান্ডুতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে ডি পি ত্রিপাঠিকে সংসদের ফ্লোরে সম্মানজনক সংবর্ধনা জানায় নেপাল সরকার। আমৃত্যু নেপালের রাজনীতিকদের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা বহাল ছিল।

শুধু রাজনীতিই নয়, আজীবন জ্ঞানের পিপাসা অক্ষয় ছিল ডিপিটির। তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে চিরকাল তিনি প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও ছাত্রশক্তির উপর আস্থা রেখেছেন। বিশেষ করে জেএনইউ পড়ুয়াদের জন্য তাঁর বাড়িতে ছিল অবারিত দ্বার। এ ছাড়া বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর জ্ঞানদীপ্ত প্রবন্ধরাশি পাঠককে ঋদ্ধ করেছে। একাধিক সাহিত্য সম্মেলনে তিনি পৌরহিত্য করেছেন। তাঁর ভাষণ শুনতে ভিড় উপচে পড়েছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান আয়োজিত অগুনতি সভায়। সন্দেহ নেই, ভারতীয় রাজনীতির দিগন্তে চিরপ্রতিবাদী এই জ্ঞানতাপসের গভীর অভাব অনুভূত হবে।

বন্ধ করুন