বাংলা নিউজ > ঘরে বাইরে > Travel Stories: গা ছমছমে পরিবেশে লুকিয়ে অজানা ইতিহাস, কীভাবে যাবেন 'ভারতের অ্যামাজনে'?

Travel Stories: গা ছমছমে পরিবেশে লুকিয়ে অজানা ইতিহাস, কীভাবে যাবেন 'ভারতের অ্যামাজনে'?

কেউ কেউ ত্রিপুরার অমরপুরের ছবিমুড়াকে অ্যামাজনের সঙ্গে তুলনা করে বলে থাকেন 'ভারতের অ্যামাজন'। (ছবি সৌজন্যে, সোহিনী দেবরায়)

Travel Stories: ‘প্রথমবার নৌকা যেখানে থামল, সেখানে মাথা উঁচু করে নদীর খাড়া ঢালে সোজাসুজি তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে বেলে পাথরের গায়ে খোদাই করা বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। সবচেয়ে বেশি অবাক হতে হবে দেবী দুর্গার মূর্তিটি দেখলে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে দেবী দুর্গার মূর্তি মনে হলেও আদতে তা নয়।’

গত ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে হঠাৎ করেই ত্রিপুরা ঘুরতে যাওয়া ঠিক হল। প্লেনের টিকিট কাটার আগে জায়গাটা সম্পর্কে খুব ভালো করে একবার পড়ে নিলাম। কোথায় কোথায় যাওয়া যেতে পারে, কী কী খাওয়া যেতে পারে এসব খুঁটিনাটি বিষয় জানতে বসেই চোখে পড়ল 'ছবিমুড়া' নামক জায়গাটা।

কেউ কেউ ত্রিপুরার অমরপুরের ছবিমুড়াকে অ্যামাজনের সঙ্গে তুলনা করে বলে থাকেন 'ভারতের অ্যামাজন'। ভারতের অ্যামাজনের কয়েকটা ছবি দেখার পর ইউটিউবে দু'তিনটে ভিডিয়ো দেখে নেওয়ার লোভও সামলাতে পারলাম না। ভিডিয়ো দেখে, জায়গাটা দেখে রীতিমতো অবাক হলাম! ভারতে এমন জায়গা রয়েছে! এতদিন এই জায়গার ব্যাপারে শুনিনি কেন? সত্যি এটা ভেবেই খারাপ লাগে যে বেশিরভাগ পর্যটক ভারতের অন্যান্য স্থানে ঘুরতে গেলেও খুব কম পর্যটকই পূর্ব ভারতের দিকে ঘুরতে আসেন। আর আসেন না বলেই জায়গাগুলোর প্রচার ঠিক ভাবে হয় না।

যাই হোক, এই জায়গা সম্পর্কে টুকটাক পড়াশোনা শুরু করলাম। ত্রিপুরা রাজ্যের অন্যান্য অনেক ঐতিহাসিক স্থানের মতো ছবিমুড়ার প্রকৃত ইতিহাস অজানা থাকলেও বিগত বেশ কিছুদিনের পড়াশোনায় বেশ কিছু তথ্য উঠে এল। তথ্য পাওয়ার পর নিজের চোখে সবটুকু দেখার আগ্রহ আরও বাড়ল। ঠিক করলাম, আগরতলাতে পৌঁছে সে রাতটা আগরতলাতে কাটিয়ে পরেরদিন ভোর-ভোরই রওনা দেব ছবিমুড়ার উদ্দেশে।

আগরতলা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরত্বে গোমতী জেলার অন্তর্গত অমরপুর মহকুমার রাজখাং এডিসি ভিলেজে অবস্থিত অমরপুর শহর। এ শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে রাজখাং এলাকার গোমতী নদীতে ‘ছবিমুড়া’ নৌকাঘাট। আগরতলা থেকে ছবিমুড়া নৌকাঘাট পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই আমরা গাড়ি বুক করে গেলাম। তবে পরে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি যে পাবলিক ট্রান্সপোর্টও আছে। কয়েকটি বাস আগরতলা থেকে অমরপুর যায়। অমরপুর থেকে অটো বা ক্যাব বুক করে ছবিমুড়া যেতে হয়।

যাত্রা শুরু নৌকায়। (ছবি সৌজন্যে, সোহিনী দেবরায়)
যাত্রা শুরু নৌকায়। (ছবি সৌজন্যে, সোহিনী দেবরায়)

নৌকা ঘাটে ১,২০০ টাকা দিয়ে নৌকা বুক করতে হয়। মোটরচালিত নৌকা। এক একটি নৌকায় ১০-১২ জন যেতে পারেন। আমরা মাত্র দু'জন। বাকিরা সব দলবেঁধে এসেছেন। কেউই শেয়ারে যেতে রাজি হলেন না। বাধ্য হয়ে গোটা নৌকাই বুক করতে হল। শুরু হল দু'জন মাঝি ভাই ও আমাদের কর্তাগিন্নির এক দীর্ঘ জলসফর। সত্যি বলতে, একটু একটু ভয়ও হচ্ছিল।

নদীর দু'দিকে ঘনজঙ্গল। সূর্যরশ্মি মাঝে মাঝে এসে পড়ছে নদীতে। বেশিরভাগ জায়গাই বেশ অন্ধকার। সাত কিলোমিটারের এই জলসফরে মাত্র দু'জায়গায় নৌকা থেমেছিল। নৌকার মোটরের আওয়াজে জলের প্রাণীরা সরে সরে যাচ্ছিল। এক-একবার মনে হচ্ছিল এই নৌকাটা মোটরচালিত না হলে বুঝি ভালো হতো। বলেও ফেললাম সে কথা৷

কিন্তু মাঝিভাই বললেন, এতটা পথ দাঁড় টানা নৌকায় ঘোরানো বেশ অসম্ভব হয়ে যায়৷ তাছাড়া ঝুঁকিও বেড়ে যায়। এসবের কারণেই শেষ কয়েকবছর ধরে দাঁড়চালিত নৌকার পরিবর্তে মোটরচালিত নৌকা ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথমবার নৌকা যেখানে থামল, সেখানে মাথা উঁচু করে নদীর খাড়া ঢালে সোজাসুজি তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে বেলে পাথরের গায়ে খোদাই করা বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। সবচেয়ে বেশি অবাক হতে হবে দেবী দুর্গার মূর্তিটি দেখলে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে দেবী দুর্গার মূর্তি মনে হলেও আদতে তা নয়।

কথিত আছে, প্রাচীনকাল থেকে জমাতিয়া উপজাতি সম্প্রদায়ের বসবাস এখানে। জমাতিয়া লোককথা অনুসারে ছবিমুড়া হল রুদ্রভৈরবী দেবীর স্থান। রাজা চিচিংফার প্রপিতামহর রাজত্বকালে তৈরি হয় দেবতামুড়া পাহাড়ের ধার দিয়ে বয়ে চলা গোমতী নদীতীরের খাড়া দেওয়ালের গায়ে খোদাই করা এই শিল্পকর্ম। এখানে এক-একটি দেবী প্রতিমার উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট, যা উপজাতিদের কাছে চাকরাখমা দেবী বলে পরিচিত। এই প্রতিমার মোট ১০টি হাত থাকায় দেখতে কিছুটা আমাদের মা-দুর্গার মতো। মাথায় ছিল অসংখ্য সাপ।

দেবীর পায়ের নীচে আরও একটি প্রতিমা ছিল। গবেষকরা একে দেবাদীদেব শিব বলে মনে করছেন। প্রতিমার নীচের স্তরে আছে খোদাই করা সাপের ছবি। পাশেই আছে বিশাল আকারের আরও একটি খোদাই করা তিন স্তরের প্রতিমা। প্রথম দুই স্তরে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এবং সবচেয়ে নীচের স্তরে আছে সাপের ছবি। পাশেই আছে অসংখ্য ছোটো-ছোটো প্রতিমা। এগুলো কিছুটা টেরাকোটা কাজের মতো। তবে অদ্ভুতভাবে এই প্রতিমাগুলোর সঙ্গে ত্রিপুরার বাকি দুই ভাস্কর্য পিলাক ও ঊনকোটির প্রতিমা কিংবা শিল্পকার্যের কোনও মিল নেই। বরং এই ধরনের প্রতিমার সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের মূর্তিগুলোর বেশ মিল দেখা যায়।

পাহাড়ের গায়ে অপূর্ব শিল্প। (ছবি সৌজন্যে, সোহিনী দেবরায়)
পাহাড়ের গায়ে অপূর্ব শিল্প। (ছবি সৌজন্যে, সোহিনী দেবরায়)

তবে এ কথাও ঠিক যে দক্ষিণ ভারতে কখনোই মূর্তিগুলি নদীর পাড়ে নয়, বরং দেখা যায় মন্দিরের দেওয়ালে। দক্ষিণ ভারতীয় শৈলীর প্রতিমা ত্রিপুরার গহিন অরণ্যে নদীর গায়ে এল কীভাবে..! বহু ইতিহাস ঘেঁটেও এ কথা জানতে পারিনি। অবশ্যই এ এক রহস্যের জন্ম দেয়।

নদীর আরও একটু দূরে ছিল একটি গুহা। শোনা যায়, জমাতিয়া লোকগাঁথা অনুসারে রাজা চিচিংফা তাঁর সব সম্পদ এই গুহায় রেখে গিয়েছেন। এগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে আছে নাকি বিশাল আকৃতির একটা সাপ! সাপের ভয়ে খুব কম মানুষই গুহায় প্রবেশ করেন। অবশ্য গুহার ভিতর সূর্যের আলো প্রবেশ না করায় যা অন্ধকার, বিষধর সাপ থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। গোড়ালি ডোবানো জলে হেঁটে আমরা কিছুদূর পথ এগিয়ে গুহার মুখ পর্যন্ত গেলেও গুহায় প্রবেশ করিনি।

ফিরে এলাম আবার ওই পথেই। ঘণ্টাতিনেকের জলসফর শেষ হল। আমরাও পাড়ি দিলাম পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে। আবার কখনও ছবিমুড়া যাওয়া হবে কিনা, তা জানি না। তবে গা ছমছম করা অদ্ভুত এই ভ্রমণস্মৃতি আজন্মকালের জন্য মনের মণিকোঠায় থেকে যাবে।

বন্ধ করুন