বাড়ি > ময়দান > পিকের ভোকাল টনিক চিরতরে হারাল ময়দান
প্রদীপ কুমার (পি কে) বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩৬-২০২০)
প্রদীপ কুমার (পি কে) বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩৬-২০২০)

পিকের ভোকাল টনিক চিরতরে হারাল ময়দান

ময়দানের দুই প্রধানের হয়ে খেলেলনি কোনও দিন। তবু তাঁর কোচিংয়ের সুবাদে দুই শিবিরেই একাধিক শিরোপা ও সম্মান আনার কাণ্ডারি তিনি।

বিরল কৃতিত্বের নজির রেখে গেলেন একদা মাঠ-কাঁপানো উইঙ্গার, পরবর্তীকালে দেশের অন্যতম সফল ফুটবল কোচ প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। ময়দান তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে পি কে নামে।

ময়দানের দুই প্রধানের হয়ে খেলেলনি কোনও দিন। তবু তাঁর কোচিংয়ের সুবাদে দুই শিবিরেই একাধিক শিরোপা ও সম্মান আনার কাণ্ডারি তিনি।

কেরিয়ারের শুরুতে বিহারের হয়ে যুব ফুটবল খেলেছেন পি কে। ১৫ বছর বয়সে বিহারের হয়ে সন্তোষ ট্রফিতে প্রতিনিধিত্ব করেন। তখন তাঁর ভূমিকা ছিল রাইট উইঙ্গারের। ১৯৫৪ সালে কলকাতায় আসেন, যোগ দেন এরিয়ান ক্লাবে। পরে ইস্টার্ন রেলওয়ের হয়ে মাঠে নামেন তিনি। ১৯৫৮ সালে কলকাতা লিগ জয়ী ইস্টার্ন রেলওয়ে দলের সদস্য ছিলেন পি কে।

আদতে উত্তরবঙ্গের ছেলে পি কের জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৩ জুন জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়িতে। দেশভাগের পরে তাঁর পরিবার তৎকালীন বিহারের জামশেদপুরে এসে বসবাস শুরু করেন।

কলকাতা ময়দানের কোনও বড় ক্লাবে কখনও খেলেননি। তা সত্বেও জাতীয় দলের হয়ে দুরন্ত খেলার সুবাদে ভারতীয় ফুটবলের কিংবদন্তীতে পরিণত হন পি কে। ১৯৫৫ সালে ঢাকায় চারদেশীয় টুর্নামেন্টে ভারতের জার্সিতে প্রথমবার আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। দীর্ঘ ১২ বছর জাতীয় দলের হয়ে চুটিয়ে ফুলবল খেলা পি কে ভারতের হয়ে অংশ নিয়েছেন ১৯৫৬ মেলবোর্ন ও ১৯৬০ রোম অলিম্পিকে। জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচে তিনি মোট ৬৫টি গোল করেন।

এছাড়া দেশের হয়ে তিনটি এশিয়ান গেমসেও মাঠে নেমেছেন তিনি। ১৯৫৮ টোকিও ও ১৯৬২ জাকার্তা এবং ১৯৬৬ ব্যাংকক এশিয়ান গেমসে খেলতে নামা ভারতীয় ফুটবল দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন পি কে। যার মধ্যে ৬২ এশিয়ান গেমসের ফুটবলে সোনা জেতে ভারতীয় দল। ফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে দুরন্ত গোল করেন পি কে। টুর্নামেন্টে মোট চারটি গোল করেছিলেন তিনি। এছাড়া রোম অলিম্পিকে পি কে’র গোলেই ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ম্যাচ ড্র করে ভারত।

কুয়ালা লামপুরে অনুষ্ঠিত মারডেকা কাপে তিনবার ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন প্রদীপ কুমার। ১৯৫৯ ও ১৯৬৪ সালে মারডেকায় রুপো জেতে ভারত। ১৯৬৫ সালে জেতে ব্রোঞ্জ পদক। চোটের জন্য জাতীয় দল থেকে ছিটকে গেলে ১৯৬৭ সালে একপ্রকার বাধ্য হয়েই অবসর নেন তিনি।

খেলা ছাড়ার পর পি কে ১৯৭২ থেকে ১৯৮৬ পর্যন্ত দু’দফায় কোচিং করিয়েছেন জাতীয় দলকে। কোচ হিসেবে ময়দানের দুই প্রধান ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানকেও প্রভূত সাফল্য এনে দিয়েছেন তিনি। তাঁর কোচিংয়ে মোহনবাগান একই মরশুমে আইএফএ শিল্ড, রোভার্স কাপ ও ডুরান্ড চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৯১-১৯৯৭ পর্যন্ত জামসেদপুরে টাটা ফুটবল অ্যাকাডেমির টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ছিলেন তিনি। ১৯৯৯ সালে পুনরায় ভারতীয় ফুটবল দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর নিযুক্ত হয়েছিলেন পি কে।

১৯৬১ সালে অর্জুন পুরস্কারে ভূষিত হন প্রবাদপ্রতীম এই ফুটবলার তথা কোচ। ১৯৯০ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ ফুটবল হিস্ট্রি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্সের বিচারে বিংশ শতকের সেরা ভারতীয় ফুটবলার নির্বাচিত হন পিকে। ২০০৪ সালে ফিফা তাদের সর্বোচ্চ সম্মান সেন্টেনিয়াল অর্ডার অফ মেরিট প্রদান করে প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তিনিই এশিয়ার একমাত্র ফুটবলার, যাঁকে ইন্টারন্যাশনাল ফেয়ার প্লে পুরস্কার সম্মানিত করে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক সংস্থা।

প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণে ময়দানে এক দীর্ঘ যুগের অবসান ঘটল। কোচ পি কের বিখ্যাত ভোকাল টনিকে উজ্জীবিত খেলোয়াড়দের স্মৃতিতে রয়ে গেল প্রবাদপ্রতিম প্রশিক্ষকের শেখানো প্রাণোচ্ছ্বল ফুটবল স্ট্র্যাটেজি। পাশাপাশি, আড্ডাপ্রিয় সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালি হারাল তার এক ভুবনবিখ্যাত চির-ডানপিটে সদস্যকে।

বন্ধ করুন