বাংলা নিউজ > টুকিটাকি > Trams in Kolkata: ‘কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে’, এক লহমায় ফিরে দেখা কলকাতার ট্রামের ইতিহাস-ভূগোল

Trams in Kolkata: ‘কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে’, এক লহমায় ফিরে দেখা কলকাতার ট্রামের ইতিহাস-ভূগোল

কলকাতার ট্রামের ইতিহাস

Trams in Kolkata: কলকাতায় ট্রামের ইতিহাস শুধু পরিবহন ব্যবস্থার ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে জুড়ে রয়েছে সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক উত্থানপতনের একাধিক ঘটনা। সেই সব ঘটনা ফিরে দেখলেন কলকাতা গবেষক।

রজতকান্তি সুর, গবেষক এবং কলকাতার ইতিহাস বিশেষজ্ঞ

পয়লা জানুয়ারির ভোর। গড়ের মাঠে তিন ছেলেকে নিয়ে সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ ও মহড়া যুদ্ধের কীর্তিকলাপ দেখাতে নিয়ে চলেছেন এক পিতা। বড়টির বয়স নয়, তার পরেরটির ছয় এবং সবথেকে ছোটটির চার। ভোরের আলো ভালো করে ফোটেনি। রাত থাকতেই যাত্রা। মধ্যম পুত্র বর্ণনা দিচ্ছেন যে ‘হ্যারিসন রোড দিয়ে হুড়মুড় করে ছুটে গেল ভিড়ে ঠাসা একটি ট্রাম। সবাই চলেছে গড়ের মাঠে নকল যুদ্ধ আর কুচকাওয়াজ দেখতে।’ না, গড়ের মাঠে যাওয়ার জন্য সেই তিন বালকের সেই দিন ভোরের ট্রামে চাপা হয়নি। তবে তার পরেও প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মহাস্থবির জাতকে কলকাতা শহরের প্রশ্ন উঠলে কোথাও ফিরে এসেছে ট্রামের কথা। শুধু প্রেমাঙ্কুর আতর্থীই নন, উনিশ শতকের সাতের দশক থেকে কলকাতা কেন্দ্রিক যে কোনও লেখা, তা, সে উপন্যাস বা গল্পই হোক বা স্মৃতিকথা বা রম্যরচনা, ট্রামের প্রসঙ্গ এসেছে বারবার। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে কলকাতায় ট্রাম চালুর এক বছরের মাথায় বম্বেতেও (অধুনা মুম্বই) ট্রাম চলেছিল। তবে সে পাট বম্বে (মুম্বই) চুকিয়েও দিয়েছে প্রায় ষাট বছর হতে চলল। ভারতের প্রধান বাণিজ্য শহরের গতিময় জীবনে নাকি বড় প্রতিবন্ধক ছিল ট্রাম। তা বন্ধ করে দিয়ে শহরের সড়কপথের গতি কেমন বেড়েছে তা ব্যস্ত সময়ে গেলেই টের পাওয়া যাবে। তবে উৎসাহীর সন্ধানী চোখে খুঁজে দেখলে বম্বের বৈদ্যুতিক ট্রামের ইতিহাসের ঝলক দেখা যাবে অধুনা মুম্বই শহরে ‘বেস্ট’ (বম্বে ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই অ্যান্ড ট্রামওয়েজ কোম্পানি লিমিটেড) বাসগুলির নাম। তা দেখে অনেকেই হয়তো আপ্লুত হতে পারেন। তবে ইতিহাস নিয়ে বর্তমানজীবি আর কবেই বা ভেবেছে…

  • সূচনাপর্ব: শুধুই লোকসান

ফিরে আসি কলকাতার ট্রামের কথায়। ১৮৬৭ সালে তদানীন্তন কলকাতা শহরের পুর-প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল জাস্টিসেস অফ পিস নামে একদল ভারতীয় গণ্যমান্য ব্যক্তির হাতে। উপনিবেশিক সরকার একটি আইন জারি করে কলকাতার ‘জাস্টিসেস অফ পিস’কে পরিবহণ পরিকাঠামোর সংস্কার করবার কথাও জানান। জাস্টিসেস অফ পিস কাজ শুরু করলেন বটে কিন্তু ‘আধুনিক পরিবহণ’ ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকার ফলে বিশেষ কিছু করে উঠতে পারলেন না। এইবার দায়িত্ব সরাসরি অর্পিত হল বাংলার তদানীন্তন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জর্জ ক্যাম্পবেল ও তার মন্ত্রী পরিষদের উপর। এই ট্রামের পরিকল্পিত উদ্দেশ্য ছিল রেলের মাধ্যমে শিয়ালদহ রেল স্টেশনে আসা মালপত্র স্টেশন থেকে কলকাতার মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা। ১৮৭০ সালের অগস্ট মাসে (২৪ গস্ট) বাংলা সরকার নিযুক্ত কমিটি এর স্বপক্ষে মতামত দিলেন। ক্যাম্পবেল সাহেব কাজে বিশ্বাসী মানুষ। দেরি তার সহ্য হয় না। কাজেই ১৮৭১ সালেই সরকার পরিকল্পনা মঞ্জুর করলেন। তবে কাজ রূপায়িত হতে গড়িয়ে গেল আরও দুই বছর।

সরকারের কাছ থেকে ট্রামলাইন পাতবার জন্য প্রথমে বরাদ্দ হয়েছিল প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। পরিকল্পনা ছিল এই যে ট্রামলাইন প্রথম পাতা হবে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত। তার কারণ আর্মেনিয়ান ঘাটে ছিল তদানীন্তন কলকাতা স্টেশনের টিকিটঘর। অর্থাৎ শিয়ালদহ থেকে হাওড়া পর্যন্ত রেলের মালপত্র পরিবহনের উদ্দেশ্যেই কলকাতা শহরে প্রথম ট্রামের পরিকল্পনা। যদিও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ উদ্ধৃত করে রাধারমণ মিত্র জানিয়েছেন, যে ‘কোথায় মালপত্র নিয়ে যাওয়া? প্রথম দিন থেকেই এ লাইন যাত্রী বহন করেছে।’ তার কারণও অবশ্য ছিল। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে শুরু হয়ে এই লাইন বৈঠকখানা রোড হয়ে বৌবাজার স্ট্রিট, ডালহৌসি হয়ে স্ট্র্যাণ্ড রোড ধরে এসে আর্মেনিয়ান ঘাটে শেষ হয়েছিল। ভালো করে খেয়াল করলেই দেখব যে এই কিছু দিন আগে পর্যন্ত কলকাতার মূল জীবিকাক্ষেত্র হিসাবে এই অঞ্চলগুলিই পরিচিত ছিল। সরকারও কলকাতার মূল বাণিজ্যকেন্দ্রে মালপত্রের পরিবহণ সহজ করতে ট্রামের ব্যবহারে উৎসাহী ছিলেন।

সে যাই হোক অবশেষে কলকাতায় প্রথম ট্রাম চলল ১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। এক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণকে উদ্ধৃত করে রাধারমণ মিত্র তার কিছুটা বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর কলিকাতা দর্পণ এ। ‘সেদিন শেয়ালদা স্টেশন থেকে পর পর দুটি ‘ট্রাম-ট্রেন’ ছাড়ে। প্রথমটিতে ছিল তিনটি গাড়ি- একটি প্রথম শ্রেণীর ও দুটি দ্বিতীয় শ্রেণীর। দ্বিতীয়টিতে ছিল দুটি গাড়ি- একটি প্রথম শ্রেণীর, আর একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর।’ ‘প্রথম গাড়িটিকে ছয়টি ঘোড়ায় টেনেছিল, দ্বিতীয়টিকে চারটি ঘোড়ায়।’ প্রথম দিনের ট্রাম-যাত্রারও কিছু বিবরণ পাওয়া যায়।

১৮৭৩ সালের এই ট্রামযাত্রার আনন্দ কিন্তু খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সরকার ট্রাম পরিচালনার ভার দিয়েছিলেন জাস্টিসেস অফ পিসের উপরে। মূলতঃ জমিদারী মানসিকতা সম্পন্ন এই গোষ্ঠী যে শহরের সাধারণ জীবন সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহাল ছিলেন এমন অপবাদ অবশ্য কেউই দেবেনা। ফলে দৈনিক প্রায় পাঁচশো টাকা লোকসান হতে লাগল। ট্রামের চাহিদা থাকলেও চলতে লাগল অনিয়মিতভাবে। ফলে নিতান্ত বাধ্য হয়েই সরকার নয় মাসের মধ্যেই ট্রাম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলেন। কলকাতায় ট্রাম বন্ধ হল ২১ নভেম্বর ১৮৭৩ সালে। কিন্তু এত খরচ করে বসানো লাইন, গাড়ি, ঘোড়া এসবের কি হবে? ম্যাকলিস্টার (মতান্তরে ম্যাক অ্যালিস্টা্র) নামে এক সাহেব তা প্রায় কেনা দামে কিনে নিতে চাইলেন। জাস্টিসেস অফ পিস ঠিক করলেন তাকেই সব বেচে দেবেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত রূপায়নের শেষ মুহুর্তে হস্তক্ষেপ করলেন সরকার। ডিলউইন, অ্যালফ্রেড পারিস ও রবিনসন সাউদার নামে তিন ইংরেজ মিলে বিলেতে গঠন করলেন একটি কোম্পানি। সেই মেসার্স পারিস এণ্ড সাউদার নামে কোম্পানির হাতে বেশ কিছু মুনাফা রেখে ট্রামের সবকিছু বিক্রি করে দেওয়া হল। দুর্জনে বলে এতে তদানীন্তন বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্ণর ক্যাম্পবেল সাহেব ও তার পারিষদেরা কিছু মুনাফা করেছিলেন। তবে সে অন্য প্রসঙ্গ।

  • দি ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি

তবে ঘটনা হল যে ট্রাম বন্ধ হওয়া এবং মেসার্স পারিস অ্যাণ্ড সাউদার কোম্পানিকে তার সত্ত্ব বিক্রি করে দেওয়ার পাঁচ বছর বাদে ১৮৭৮ সালে কলকাতায় আবার ট্রাম চালানোর প্রস্তাব আসে। অনেকগুলি প্রস্তাব এলেও ভাগ্য শিকে ছেঁড়ে সেই মেসার্স পারিস অ্যাণ্ড সাউদার কোম্পানির। অনুমতি পেয়ে তাকে কাজে পরিণত করবার জন্য ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি নামে একটি সিন্ডিকেট গঠন করা হয়। ১৮৭৯ সালে এই ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানিই আবার মেসার্স পারিস অ্যাণ্ড সাউদার কোম্পানির কাছ থেকে মাইল পিছু হাজার পাউন্ড দামে ১৮৭৩ এ বিক্রি হওয়া ট্রামলাইন ও গাড়ি কিনে নেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার বছরকয়েক পরে ১৯৫১ সালে ট্রাম কোম্পানি জাতীয়করণ হয়। তার আগে পর্যন্ত এই ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানিই কলকাতায় ট্রাম চালানোর প্রশ্নে একচেটিয়া অধিকার ভোগ করে গেছেন। ন্যায়পরায়ণ ব্রিটিশ সরকারের এতে বিশেষ কোন আপত্তির কথা তেমন শোনা যায়নি।

সে যাই হোক, অবশেষে ২০ অক্টোবর ১৮৭৯ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের সঙ্গে ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানির চুক্তি হল। প্রথম পর্যায়ে ট্রাম কোম্পানি কলকাতার আটটি অঞ্চলে ট্রামলাইন পাতবার অনুমতি পেলেন। এই অঞ্চলগুলি হল শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বৌবাজার হয়ে ডালহৌসি স্কোয়ার, চৌরঙ্গি রোড (অধুনা জওহরলাল নেহেরু রোড), চিৎপুর রোড (অধুনা রবীন্দ্র সরণী), ধর্মতলা স্ট্রিট (অধুনা লেনিন সরণী), স্ট্রাণ্ড রোড, শ্যামবাজার, খিদিরপুর এবং ওয়েলেসলি স্ট্রিট (অধুনা রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড)। চুক্তিতে এও স্থির হল যে কোম্পানি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে ট্রামের ভাড়া নির্ধারণ করতে পারবে। কর্পোরেশন কিন্তু নিজের লভ্যাংশ ভোলেননি। ঠিক হল যে সিঙ্গল লাইনের জন্য বছরে দু হাজার ও ডবল লাইনের জন্য বছরে তিন হাজার টাকা কর্পোরেশনকে ভাড়া বাবদ দিতে হবে। কুড়ি বছর অন্তর এই ভাড়ার হার অন্তত হাজার টাকা করে বাড়াতে হবে। ভাড়া না দিতে পারলে কর্পোরেশন লাইন ও ট্রাম কিনে নিতে বা নিলামে চড়াতে পারবেন।

এত কিছু পেরিয়ে অবশেষে কলকাতায় পাকাপাকিভাবে ট্রাম চলা শুরু হল ১৮৮০ সাল থেকে। ১৮৮০ সালের ১ নভেম্বর কলকাতায় গণপরিবহন হিসাবে ট্রাম তার পাকাপাকিভাবে তার যাত্রা শুরু করল। শিয়ালদহ-বৌবাজার-হেয়ার স্ট্রিট হয়ে ডালহৌসি পর্যন্ত প্রথম ট্রাম চলা শুরু হল। তারপর পর্যায়ে পর্যায়ে ১৮৮৪ সালের মধ্যে চুক্তিতে বলা বাকি এলাকাগুলির মধ্যে ট্রাম চালু হল। রাধারমণ মিত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ট্রামগুলির রং ছিল ধূসর। আর চালক ও টিকিট পরীক্ষকেরা মাথায় লাল পাগড়ি পরতেন। এক একটা ট্রাম টানবার জন্য ব্যবহার হত একজোড়া ওয়েলার ঘোড়া। এই ওয়েলার ঘোড়াগুলিকে (Waler Horse) নিয়ে আসা হত সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে। কলকাতার শ্যামপুকুর, চিৎপুর, শিয়ালদহ, ধর্মতলা, ভবানীপুর ও খিদিরপুরে প্রথম পর্যায়ে ট্রাম কোম্পানির ডিপো ও আস্তাবল তৈরি হয়েছিল। ঘোড়ায় টানা ট্রামগুলি সাধারণত এক কামরার হত। তার কারণ একে দুটি ঘোড়ার সাহায্যে ট্রাম টানার কিছু অসুবিধা ছিল। তা ছাড়া ট্রাম বেলাইন হলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও ছিল।

ভারী গাড়ি, কামানবাহী শকট বা মালগাড়ি বহনে ওয়েলার ঘোড়া পারদর্শী হলেও ভারতের বিশেষ করে কলকাতার গরম তাদের বিশেষ সহ্য হয়নি। ফলে প্রায় প্রতি বছরই গরমের সময়ে অতিরিক্ত খাটুনি সহ্য করতে না পেরে বেশ কিছু ঘোড়া মারা পড়ত। পরিষেবা চালু রাখতে ট্রাম কোম্পানিকেও প্রতি বছরই বিদেশ থেকে ঘোড়া আমদানি করতে হত। কর্পোরেশন থেকে কলকাতার রাস্তায় ঘোড়ার জল খাওয়ার বেশ কয়েক জায়গায় চৌবাচ্চাও করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত করেও লাভের তুলনায় খরচের বহর বাড়তে থাকায় ট্রাম কোম্পানি অন্য ভাবনাচিন্তা শুরু করেন। এ ছাড়া অন্য অসুবিধাও ছিল। ওয়েলার ঘোড়া খাটিয়ে প্রাণী হলেও তার মেজাজ মর্জি থাকবে না, এমন নয়। প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর ছেলেবেলায় দেখা ঘোড়ায় টানা ট্রামের কথায় ফিরে আসি। প্রেমাঙ্কুর লিখেছেন ‘একদিন ঠিক আমাদের ইস্কুলের সামনে ট্রামের ঘোড়াদুটো ক্ষেপে গেল। অন্য গাড়ির ঘোড়া ক্ষেপলে তারা মারত রাম-দৌড়। কিন্তু ট্রামের ঘোড়া ক্ষেপলে তারা দাঁড়িয়ে যেত। কিছুতেই নড়তে চাইত না। মারধর, টানাটানি, ঠেলাঠেলি, অন্য ঘোড়া এনে তাদের দু-পাশে জুতে দিয়ে টানবার চেষ্টা করিয়েও যখন কিছুতেই তারা স্বীকৃত হ’ত না, তখন তাদের খুলে নিয়ে অন্য একজোড়া ঘোড়া এনে জুতে দেওয়া হ’ত।’

  • ট্রামের ‘ঘোড়া-রোগ’ ও মুক্তির উপায়

বোধকরি এত অসুবিধা দেখেই ট্রাম কোম্পানির কর্তারা অন্য রকম ভাবনাচিন্তা শুরু করেছিলেন। ১৮৮২ সালে কর্পোরেশন ট্রাম কোম্পানিকে পরীক্ষামূলকভাবে বাষ্পীয় ইঞ্জিন ব্যবহার করে ট্রাম চালানোর অনুমতি দেন। ট্রামের চৌরঙ্গী লাইনে এই ট্রাম চলেছিল ১৮৮২ সালের মে মাস থেকে ১৮৮৩ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত। এর মধ্যেই রাস্তায় ট্রামের জন্য ছয়টি পথ দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায়। হতাহতের কোন খবর না থাকলেও হয়ত এতটা গতির সঙ্গে শহরবাসী অভ্যস্ত নন বলেই সরকার শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে এসেছিলেন। সিদ্ধার্থ ঘোষের লেখা থেকে জানা যায় যে ১৮৯৭ সালে ব্রিটেনের হিট্‌লি অ্যান্ড গ্রেশাম কোম্পানি কলকাতা কর্পোরেশনকে বিনামূল্যে তিন মাসের জন্য গ্যাস-চালিত ইঞ্জিন ব্যবহার করে ট্রাম চালানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সম্ভবত ট্রাম কোম্পানির আপত্তিতে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। মনে রাখতে হবে যে চুক্তি অনুযায়ী ট্রামলাইনের মালিকানাও ছিল ট্রাম কোম্পানিরই। কর্পোরেশন শুধু রাস্তার ভাড়া পেতেন।

গ্যাসের ট্রাম চালাবার অনুমতি না পাওয়ায় এবং বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ইঞ্জিনের গতির সঙ্গে সঙ্গে তাল রাখতে না পেরে এগারো মাসের মধ্যে ছয়টি দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ায় ট্রামের ঘোড়াদের চাকরি বজায় রইল বিশ শতকের গোড়া পর্যন্ত। যদিও ১৮৯৬ সালে কিলবার্ণ অ্যান্ড কোম্পানি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ট্রাম চালানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ট্রাম কোম্পানির সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু লাভের অংশ নিয়ে বিবাদ দেখা দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত কিলবার্ণ কোম্পানি ও কর্পোরেশনের সম্মতি সত্ত্বেও ট্রাম কোম্পানি এই বোঝাপড়াতে রাজি হলেন না। কিলবার্ণ কোম্পানিকে প্রস্তাবের খসড়ায় বেশ কিছুটা বদল করে ট্রাম কোম্পানির কাছে আবার নিয়ে আসতে হয় ১৮৯৯ সালে। ট্রাম কোম্পানির কর্তারা অবশেষে সম্মত হলেন। লাইনে বদল আনা, ট্রাম চালাবার জন্য বিদ্যুতের খুঁটি বসানো ইত্যাদি ঝামেলা মিটিয়ে প্রথম বিদ্যুৎ চালিত ট্রাম চলল ১৯০২ সালের ২৭ মার্চ। ট্রাম কোম্পানির খিদিরপুর রুটে চলল এই ট্রাম। কোম্পানির বাকি রুটগুলিতে তখনও ঘোড়াদের চাকরি যায়নি। সেটা যেতে যেতে আরও আট মাস গড়িয়ে গেল। ১৯০২ সালের ১৯ শে নভেম্বর থেকে পাকাপাকিভাবে কলকাতা শহরের রাস্তায় বৈদ্যুতিক ট্রাম তার মৌরসীপাট্টা জমিয়ে বসল।

  • উপসংহার: ট্রাম কোম্পানির একচেটিয়া মুনাফা ও তার বিকল্পের সন্ধান

১৯০২ পরবর্তী সময় ট্রাম কোম্পানির ইতিহাসে শুধুই মুনাফার যুগ। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে ১৯০৩ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে টালিগঞ্জ, আলিপুর, হ্যারিসন রোড (অধুনা মহাত্মা গান্ধী রোড), আলিপুর, বেহালার মত অনেকগুলি জায়গায় ট্রামলাইন পেতে ট্রাম চালাবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। ট্রাম কোম্পানির উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত গতির গণপরিবহনের পরিষেবা দিয়ে যতখানি সম্ভব মুনাফা অর্জন করে নেওয়া।

তবে ট্রামের একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব করবার চেষ্টা বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকেই শুরু হয়েছিল বললে বাড়াবাড়ি হবেনা। সিদ্ধার্থ ঘোষ দেখিয়েছেন যে ১৯২৪ সালে ‘ওয়েলফেয়ার’ পত্রিকার একটি সংবাদকে উদ্ধৃত করে সিদ্ধার্থ ঘোষ জানাচ্ছেন যে ট্রামের সবথেকে বড় সমালোচনা ছিল নির্দিষ্ট সংখ্যায় যাত্রী বহনের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও প্রায় “কৌটোয় ভরা সার্ডিন মাছের মতো" লোক ঠাসা হচ্ছে ট্রামে। আর পুরোটাই হচ্ছে ট্রাম কোম্পানির বেশি মুনাফার লোভে। পত্রিকাটির আরও অভিযোগ ছিল যে অনেকসময়তেই যাত্রীদের বেশি দামের টি্কিট কাটতে বাধ্য করা হচ্ছে, কারণ ট্রামের টিকিট পরীক্ষকদের কাছে খুচরো পয়সা পাওয়া যাচ্ছেনা। প্রবন্ধের শেষে লেখক সুপারিশ করছেন কলকাতায় মোটরবাস চালানোর। তাতে ট্রাম কোম্পানির মৌরসীপাট্টা অনেকটাই কমবে। কিন্তু বাস্তবে কি হল? সিদ্ধার্থ লিখেছেন যে ১৯২৪ সালে কলকাতা শহরে মোট দশটি নথিভুক্ত বাস ছিল। তার দুটির মালিক ছিলেন ওয়ালফোর্ড কোম্পানি (এরাই কলকাতায় প্রথম দোতলা বাস নিয়ে আসেন) আর বাকি আটটির মালিক ছিলেন ক্যালকাটা ট্রাম কোম্পানি। অর্থাৎ গণপরিবহন ব্যাবসা থেকে মুনাফা অর্জনের একচেটিয়া অধিকার ট্রাম কোম্পানি ছাড়তে চাননি। আর এই মুনাফার লোভই ট্রাম কোম্পানিকে একের পর এক অন্যায় করতে বাধ্য করেছে। তবে সে অন্য প্রসঙ্গ।

  • ঋণ স্বীকার:

১/ রাধারমণ মিত্র। কলিকাতা দর্পণ (প্রথম খণ্ড), কলকাতা: সুবর্ণরেখা, ১৯৮০।

২/ সিদ্ধার্থ ঘোষ। কলের শহর কলকাতা, কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৯১।

৩/ শ্রীপান্থ (নিখিল সরকার) । কলকাতা, কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ২০১৪।

(লেখক মহানির্বাণ ক্যালকাটা রিসার্চ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত)

টুকিটাকি খবর

Latest News

অনুমতি না নিয়েই কাজের 'অপরাধে শাস্তি' পাচ্ছেন রাহুল, গর্জে উঠলেন সোমক সাদা চেকের হ্যান্ডলুম শাড়ি, 'বহি-খাতা' ট্যাব নিয়ে নির্মলার বাজেট-লুক একনজরে ‘আমি মরে গেলে যেন মাকে জানানো হয়’ হোটেল থেকে উদ্ধার IT বিশেষজ্ঞের দেহ কেঁদেই ফেললেন লিয়েন্ডার পেজ ও বিজয় অমৃতরাজ! টেনিসের ‘হল অফ ফেম’-এ দুই তারকা জমি দখলের কথা জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন মুখ্যমন্ত্রীকে, তাকেই গ্রেফতার করল পুলিশ প্রতিযোগীদের 'জীবন বদলাতে' প্রস্তুত কৌন বনেগা ক্রোড়পতি ১৬, কবে থেকে শুরু হচ্ছে? 'এটা এখন যুদ্ধ', হাসিনার অফিসের ওয়েবসাইট হ্যাক, উঠল 'স্বাধীনতার' দাবি ২০৪৭-তে ভারতের মাথাপিছু আয় হবে ১৪.২ লাখ টাকা, বাড়বে ৭ গুণ! পূর্বাভাস কেন্দ্রের সারেগামাপায় কালিকাপ্রসাদের স্মরণে হাজির পৌষালি-তুলিকারা, কী বললেন শান্তনু মৈত্র এই জিনিস ভগবান শিবের ভীষণ প্রিয়, যা দিয়ে অভিষেক করলে পূর্ণ হয় যে কোনও মনস্কামনা

Copyright © 2024 HT Digital Streams Limited. All RightsReserved.