বাড়ি > বাংলার মুখ > অন্যান্য জেলা > দূরে জল আনতে যেতে কষ্ট অসুস্থ মা'র, বাড়িতে নিজেই ১৫ ফুট কুয়ো খুড়লেন বর্ধমানের মেয়ে
ববিতা সোরেন (ছবি সৌজন্য হিন্দুস্তান টাইমস)
ববিতা সোরেন (ছবি সৌজন্য হিন্দুস্তান টাইমস)

দূরে জল আনতে যেতে কষ্ট অসুস্থ মা'র, বাড়িতে নিজেই ১৫ ফুট কুয়ো খুড়লেন বর্ধমানের মেয়ে

  • রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করার পর আপাতত বি.এড করছেন।

'মাউটেন ম্যান' দশরথ মাঝির কথা জানেন কিনা, তা জানা নেই। জিজ্ঞাসা করার সাহসও হয় না। জেনেও বা কী হবে! তিনি যে কাজ করেছেন, সেটা অন্য কারোর ছায়ায় ঢাকা পড়ার নয়, বরং সেটাই এক অপরিসীম আলোর উৎস।

সেই তিনি হলেন বর্ধমানের বছরের ২৪-এর ববিতা সোরেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করার পর আপাতত বি.এড কোর্স করছেন। খুব একটা স্বচ্ছল নয় পরিবারের অবস্থা। টানাটানির সংসারে ছেলেবেলা থেকে মা'কে দেখতেন, রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে বাড়ি থেকে মিটার ২০০ দূরে জল আনতে যাচ্ছেন। কষ্ট হত। কিন্তু নিরুপায় ছিলেন। কিছু করতে পারতেন না। জল তো খেতে হবে। 

সেভাবেই চলছিল। কিন্তু মা'র শরীর ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। জল আনতে যেতে কষ্ট হচ্ছিল, পারছিলেন না। তাই ববিতা ঠিক করেন, বাড়ির চত্বরের মধ্যেই কুয়ো খুড়বেন। আর সেটা একাই। সেই জেদকে সঙ্গী করেই ১৫ ফুট লম্বা একটি কুয়ো খুড়ে ফেলেন ববিতা। তাঁর কথায়, ‘আমার মা নীনা সোরেন  রক্তাল্পতায় ভোগেন এবং অত্যন্ত দুর্বল। ছোটো থেকেই দেখেছি, জল আনতে কত কষ্ট করতে হত। প্রখর রোদের মধ্যে হেঁটে যেতে হত, তারপর লাইনে দাঁড়িয়ে জল নিয়ে আসতে হত। সেজন্য আমি একটা স্থায়ী সমাধানের উপায় হাতড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ মাথায় আসে, আমি তো কুয়ো খুড়তে পারি।’ কাজটা যে খুব একটা সহজ ছিল না, তা ববিতার শক্ত চোয়াল দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।

ছুটিতে হস্টেল থেকে বাড়িতে ফিরে গত বছরের শেষের দিকে কুয়ো  শুরু করেন। মাঝপথেই অবশ্য আবার হস্টেলে ফিরে যেতে পারে। করোনাভাইরাসের জেরে লকডাউন তাঁর কাছে নয়া সুযোগ এনে দেয়। কলেজ এবং হস্টেল বন্ধ থাকায় ফের কুয়ো খোড়ার কাজ শুরু করেন।

ববিতা বলেন, ‘আমার বাবা এবং ভাই শক্তভাবে দড়ি বেঁধে রাখত। ওটার সাহায্যে আমি রোজ নীচে নামতাম এবং ঘরের কাজের ফাঁকে যে সময়টুকু পেতাম, সেই সময়েই কুয়ো খুড়তাম। দু'তিন সপ্তাহ ধরে সেই কাজটা করার পর আমি জলের সন্ধান পাই। কখনও কখনও দিদিও মাটি বের করতে আনতে সাহায্য করত। কিন্তু ওর নিজেরও কাজ রয়েছে।’

প্রাথমিক ববিতা ভেবেছিলেন, পঞ্চায়েতের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে সাহস পাননি। ববিতার বাবা একটি স্থানীয় কারখানায় কাজ করেন। দাদা গাড়ি চালান এবং দিদি স্থানীয় একটি কাপড়ের দোকানের কাজ করে সংসার চালান। পাশাপাশি লকডাউনে কুয়োর খোড়ার শ্রমিকও মিলত না এবং শ্রমিকের জন্য অপেক্ষা করলে সময়ও লাগত। তাই যাবতীয় দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছিলেন ববিতা।

জলের সন্ধান পাওয়ার পর ববিতার কীর্তির কথা পাড়ায় জানাজানি হয়। রবিবার তাঁর বড়িতে আসেন প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিরা। আসানসোল-দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং বিধায়ক তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা কুয়ো দেখে অভিভূত হয়ে যাই। আমরা আশ্বস্ত করেছি যে প্রশাসন বাকিটা খুড়বে এবং সেটির দৈর্ঘ্য ৩০ ফুট করা হবে, যাতে পর্যাপ্ত পানীয় জল পান এবং সেটি বাঁধিয়েও দেওয়া হবে। পাশাপাশি কুয়ো খুড়তে যত টাকা পড়ে, সেটাও আমরা দেব। এই সপ্তাহের মধ্যে একটা ল্যাপটপ দেব ববিতাকে এবং আমরা একটা চাকরি দেওয়ারও চেষ্টা করছি।’  

বন্ধ করুন