বাংলা নিউজ > কর্মখালি > (মতামত) পরীক্ষা দিলেই পাসের অধিকার কবে পেল পড়ুয়ারা? রক্তের স্বাদই কি কাল হল?
উচ্চমাধ্যমিকের পাস করানোর দাবিতে বিক্ষোভ। (ফাইল ছবি)

(মতামত) পরীক্ষা দিলেই পাসের অধিকার কবে পেল পড়ুয়ারা? রক্তের স্বাদই কি কাল হল?

  • ‘প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি নিয়ে৷ পশ্চিমবঙ্গ-সহ সারা ভারতে এখন করোনার ভয়ভীতি উধাও৷ খালি পরীক্ষা এলেই তখন অনলাইনে নেওয়ার দাবি৷’

পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে চলেছে বিক্ষোভ৷ দাবি হল, ফেল করানো চলবে না, পাস করাতেই হবে৷ পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে এটাই এখন বাস্তব৷

পরীক্ষায় বসলে পাস করাতে হবে, এমন কোনও অধিকার ভারতীয় সংবিধান অন্তত ছাত্রছাত্রীদের দেয়নি৷ পশ্চিমবঙ্গের কোনও আইনেও এরকম কোনও নিয়ম করা হয়নি৷ তাহলে এই বিক্ষোভ কেন?

সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি৷ তার আগে একটা কথা বলা দরকার, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় পড়ুয়ারা ইংরেজিতে তিন নম্বর, ১০ নম্বর, ১৫ নম্বর পেয়ে বিক্ষোভে বসে পড়েছেন৷ দাবি করছেন, সবাইকে পাস করাতে হবে৷ এর থেকেই রাজ্যের শিক্ষার হাল যে কী, তা বোঝা যায়৷ এরপর হয়তো দাবি উঠবে, ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন পড়ার জন্য যারাই আবেদন করবেন, সবাইকে পড়তে দিতে হবে৷ শিক্ষার এ হেন গণতন্ত্রীকরণ আর যে বেশি দূরে নেই, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে৷

প্রদীপ জ্বালাবার আগে যেমন সলতে পাকানোর পর্ব থাকে, তেমনই সবাইকে পাস করাতেই হবে, এমন দাবির পিছনেও ওই সলতে পাকাবার একটা পর্ব আছে৷ এর পিছনেও আছে সেই করোনা এবং শিক্ষা-কর্তৃপক্ষের বোধহীন ব্যবস্থা৷ করোনায় অনলাইন পড়ানো ও পরীক্ষার ব্যবস্থা হল৷ শুরু হল, ওপেন বুক পরীক্ষা৷ অর্থাৎ পড়ুয়ারা বই খুলে এবং দেখে পরীক্ষা দিতে পারবে৷ প্রশ্নপত্র সেই আগের মতোই, নিয়মও আগের মতো৷ ফারাক শুধু বই দেখে উত্তর দাও৷ বা আগে থেকে টিউটোরিয়াল সেন্টারের সঙ্গে ব্যবস্থা থাকলে প্রশ্ন দেখে তারা জবাব লিখে দেবে, সেটা টুকে দিলেই হবে৷ সহজ ও সরল ব্যবস্থা৷

এখানেই শেষ নয়৷ তারপর যখন ফলাফল বেরোবে, তখন ‘বিশেষ’ নির্দেশে সবাইকে পাস করিয়ে দিতে হবে৷ দুই বছর ধরে অনলাইনে পরীক্ষা দিয়ে সকলে পাস হয়ে গিয়েছে৷ এখন অফলাইনে পরীক্ষা দিয়ে ফেল করিয়ে দিলে প্রতিবাদ তো হবেই৷ বাঘ একবার যদি মানুষের রক্তের স্বাদ পেয়ে যায়, তখন সে মানুষখেকো হবেই৷ 

তাই স্কুলে স্কুলে বিক্ষোভ শুরু, ফেল করানো যাবে না৷ সবাইকে পাস করাতে হবে৷ এর মধ্যে একজন টিভি সাংবাদিক পাস করানোর দাবিতে বিক্ষোভরত পড়ুয়াদের কাছে গিয়ে আমব্রেলার বানান জিজ্ঞাসা করেন৷ ফেল করে বিক্ষোভে বসা পড়ুয়া জবাব দেয়, এএমআরইএলএ৷ এই নিয়ে সামাজিক মাধ্যম উত্তাল৷ এই বানান নিয়ে, সাংবাদিকদের আচরণ নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন নেটিজেনরা৷ কিন্তু কেউ এই প্রশ্নটা তুলছেন না, ফেল করে পাস করাতে হবে, এরকম মামার বাড়ির আবদার করা হয় কী করে?

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি নিয়ে৷ পশ্চিমবঙ্গ-সহ সারা ভারতে এখন করোনার ভয়ভীতি উধাও৷ অধিকাংশ মানুষ মাস্ক পরা বন্ধ করেছে, স্যানিটাইজার দিয়ে তাঁরা আর হাত জীবাণুমুক্ত করেন না৷ সিনেমা হল হাউসফুল৷ বাসে ভর্তি মানুষ৷ সন্ধ্যার পর গড়িয়াহাট, হাতিবাগান বাজারে মেলার ভিড়৷ রেস্তোরাঁয় উপচে পড়ছে মানুষ৷ দার্জিলিংয়ে কোনও হোটেলে ঘর পাওয়া যাচ্ছে না, এত ভিড়৷ 

খালি পরীক্ষা এলেই তখন অনলাইনে নেওয়ার দাবি৷ কারণ, তাতে সবাইকে পাস করিয়ে দেবে যে৷ তখন বই দেখে লিখে নেয়া যাবে যে৷ এই পরিস্থিতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তা একটা উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে৷ পশ্চিমবঙ্গ থেকে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বড় অংশই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য দিল্লি, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, মুম্বই, চেন্নাই বা বিদেশ পাড়ি দেয়৷

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায়ই দাবি করেন, তিনি ক্ষমতায় আসার পর প্রচুর কলেজ তৈরি হয়েছে, অনেকগুলি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে৷ তা হয়েছে৷ তবে ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়েছে কটা? আইআইটি, আইআইএমের মতো গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে (যা আগে থেকেই ছিল) ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুঁজতে মাথার প্রচুর ঘাম পায়ে ফেলতে হবে, তারপরেও গুটিকয়েকের বেশি জুটবে বলে মনে হয় না৷

অধিকাংশ কলেজেই শাসক দলের ছাত্রশাখার রমরমা ও দাপট৷ ভর্তি থেকে শুরু করে সবকিছু তারাই ঠিক করে দেয়৷ তারাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অধ্যক্ষকে ঘেরাও করে রাখে, এমন সব গালিগালাজ করে যে মাথা লজ্জায় হেঁট হয়ে যায়৷ নৈরাজ্যই যেখানে নিয়ম, ন্যূনতম ইংরেজি, অঙ্ক না শিখেই যেখানে পাস করানোর দাবিটাই মুখ্য, সেখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং হচ্ছেও৷ তাই পড়ুয়ারা পাস করে যাচ্ছে, কিন্তু অধিকাংশই কিছু শিখছে না৷ সুকুমার রায়ের কবিতায় ‘খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না’-র গল্প৷

কিন্তু সরকারের সামনে হিসেব তৈরি৷ কিছুদিন আগেই যে বাজেট পেশ করা হয়েছে, সেখানে স্কুল শিক্ষাক্ষেত্রে ৩৫ হাজার ১১৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে৷ মাদ্রাসা শিক্ষায় পাঁচ হাজার চার কোটি পাঁচ লাখ ও উচ্চশিক্ষায় পাঁচ হাজার ৮১১ কোটি ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে৷ কিন্তু এই হিসেবে যা বলা নেই, তা হলো, বরাদ্দের সিংহভাগই চলে যায় শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মীদের বেতন মেটাতে৷ শিক্ষক নিয়োগের কাহিনিও বড় মনোহর৷ 

(বিশেষ দ্রষ্টব্য : মতামতধর্মী প্রতিবেদনটি ডয়চে ভেলে থেকে নেওয়া হয়েছে। সেই প্রতিবেদনই তুলে ধরা হয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমস বাংলার কোনও প্রতিনিধি এই প্রতিবেদন লেখেননি। লেখকের মত ব্যক্তিগত। তা হিন্দুস্তান টাইমস বাংলার মতামত নয়।)

বন্ধ করুন