AVATAR- এর  কারিগররা
AVATAR- এর কারিগররা

বিনোদন জগতের মেঘে ঢাকা তারারা...

ওঁরা নেপথ্যের নায়ক, নায়িকা, চরিত্র অভিনেতা, বিনোদন জগতে গুরুত্ব অপরিসীম হলেও প্রচারের আলো থেকে ওঁরা বহু দূরে। কণ্ঠ -অভিনেতাদের সংঠন AVATAR- লড়াই করেছে শিল্পীর অধিকারের। এদিকে করোনা তাণ্ডবে অক্রান্ত সারা বিশ্ব! নিজেদের স্বল্প পুঁজি থেকে AVATAR অর্থ সাহায্য তুলে দিল মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে।

টিভি খুললেই আপনার খুব চেনা এবং পছন্দের বাংলা বিজ্ঞাপন, ছোটদের বাংলা কার্টুন, বাংলায় ডাবিং করা ভিন্ন ভাষার সিনেমা, মেগা সিরিয়াল, ওয়েব সিরিজ, থেকে শুরু করে বাংলায় ডিসকভারি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, হিস্ট্রি চ্যানেল সহ বাংলায় ডাবিং করা দেশি-বিদেশি ভাষার অজস্র অনুষ্ঠান এখন দর্শক মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে টিআরপি। আরও বেশি করে ভিন ভাষার অনুষ্ঠান বাংলা ভাষায় দেখার চাহিদা বাড়ছে। মোট কথা এই মুহূর্তে বাংলা বিনোদন দুনিয়ায় ডাবিং শিল্পের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । কিন্তু এই শিল্পের যাঁরা কলাকুশলী, অর্থাত কণ্ঠ-অভিনেতা, তাঁদের সম্বন্ধে আমরা কতটুকু জানতে পারি? কণ্ঠ-অভিনয়ের মাধ্যমে একটা চরিত্রকে কেমন করে শিল্পী জনপ্রিয় করে তোলেন? কীভাবে তাঁরা কাজ করেন? তাঁদের জীবন যাপনই বা কেমন? কতটা পরিশ্রম করতে হয় রোজ? এমন হাজারো প্রশ্ন রয়েছে, কিন্তু এই কণ্ঠ অভিনেতাদের নিয়ে মানুষের তেমন আগ্রহই নেই। পর্দার কলাকুশলীদের দেখা যায়, তাঁরা বিনোদনের সফল চাঁদ-তারা, তাই তাঁদের নিয়ে জনতার কৌতুহলের শেষ নেই। অথচ কর্মক্ষেত্রে নেপথ্যের কারিগরদের গুরুত্ব সমান হলেও যেহেতু মানুষ তাঁদের দেখতে পান না, তাঁদের চেনেন না, জানেনও না, তাঁদের কোনও প্রচারও নেই, সেই জন্যই আজ তাঁদের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। সময় মত তাঁরা টাকা পাননা, তাঁদের বকেয়াও মেটানো হয় না। বিনোদন দুনিয়ায় তাঁরা অবহেলিত। শিল্পীর সম্মান বা পরিচিতি তো নেই-ই, আর্থিক দিক থেকেও তাঁরা সমান ভাবে অবহেলিত। এমনটাই মনে করেন ‘AVATAR’-এর সদস্যরা। পুরো নাম 'অ্যাসোসিয়েশন অফ ভয়েস ওভার আর্টিস্ট ট্রান্সক্রিপ্টারস অ্যান্ড সাউন্ড রি-রেকডিস্টস অফ কলকাতা'।

কলকাতার বাংলা ডাবিং আর্টিস্টরা মিলে তৈরী করেছেন ‘AVATAR’। সংগঠনের পক্ষ থেকে সেক্রেটারি অদ্রিজ চৌধুরী HT Bangla-কে জানালেন তাঁদের আগামী কাজকর্ম এবং পদক্ষেপের কথা।

প্রথমেই বলব, এই সময় যে সামান্য অর্থ সাহায্য আমরা মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে তুলে দিতে পেরেছি সেটা আমাদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ জেতার মত। সারা পৃথিবী জুড়ে প্রায় সমস্ত দেশে একসঙ্গে এমন হাহাকার বোধহয় এই প্রথম । আমরা কেউ জানিনা কবে কোভিড-১৯ এর হাত থেকে আমাদের সম্পূর্ণ মুক্তি ঘটবে! এই ভাইরাস যুদ্ধে জয়লাভের একমাত্র উপায় নিজেকে গৃহবন্দী করে রাখা। কিন্তু বেশির মানুষই তো দিন আনা, দিন খাওয়াদের দলে। কাজকর্ম সব বন্ধ, রোজগার নেই, মানুষ খেতে পাচ্ছেনা, তবুও লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এবং আমরা জিতবই। আমাদের ভয়েজ ওভার শিল্পীদের রোজগার এতটাই কম যে এই পরিস্থিতিতে চরম অর্থ সঙ্কটে পড়েছেন অনেক শিল্পী। তার মধ্যেও অভাবী মানুষদের জন্য যা পেরেছি আমরা সাহায্য করেছি। ভবিষ্যতেও করব সাধ্য মত। এটাই আমাদের টিম স্পিরিট।

মূলত বিজ্ঞাপন এবং টেলিভিশনে ভয়েজ ওভার, রেডিওতে কণ্ঠ দান এবং ট্রান্সক্রিপশনের কাজ এই সব কটা বিভাগের শিল্পীদের নিয়েই আমাদের সংগঠন। আমাদের কোনও প্রচার নেই, কোনও দল বা সংগঠন আমাদের সঙ্গে নেই, তাই নিজেদের জন্য বাঁধ বাঁধার কাজটা নিজেরাই শুরু করেছি। আমরা চাই মানুষ আমাদের কাজ সম্বন্ধে জানুক এবং শিল্পীরা যেন তাঁদের যোগ্য সম্মান পায় সেটাই আমাদের প্রয়াস। 'AVATAR' এর পক্ষ থেকে একটি আর্টিস্ট রিলিফ ফান্ড গঠন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, দুস্থ শিল্পীদের সাহায্য করা, সময় অসময় তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং পারিশ্রমিকের দিকটাও যাতে উন্নত হয় সে বিষয়ে নজর রাখবে সংগঠন। শুধুমাত্র এই কাজকে ভালোবেসে বহু অভাবী শিল্পী দূরদূরান্ত থেকে কাজে আসেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই কাজের পারিশ্রমিক ১০০দিনের কাজের পারিশ্রমিকের চেয়েও কম। এপিসোড প্রতি ২০০টাকা। এহেন রোজগারে স্বাভাবিক সময়তেই সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, আর এই পরিস্থিতিতে তো বেঁচে থাকাটাই অনিশ্চিত!

এই ভয়েজ ডাবিং-এর কাজ মূলত বাইরে থেকে আমাদের এখানে আসে। যাঁদের মাধ্যমে কাজ আসে বা যেই সব চ্যানেলে এই অনুষ্ঠান গুলি দেখানো হয় সেখানে কিন্তু পেমেন্ট ঠিকঠাকই হয়। অথচ যখনই এপিসোড বা সিনেমাটির ডাবিং হয় তখনই টাকার পরিমান ডাবিং আর্টিস্টদের ক্ষেত্রে অনেকটা কমে যায়। আসলে কাজটা এত গুলি মাধ্যম ঘুরে আসে যে স্বভাবতই আমাদের পেমেন্টটা কমে যায়। সোজাসুজি কাজ এলে সবাই সমানভাবে লাভবান হতেন। মাত্র ২০০টাকায় তো চলতে পারে না, তাই একজন কণ্ঠ-অভিনেতাকে সারা দিন বিভিন্ন স্টুডিওতে ঘুরে ঘুরে অনেক গুলি ডাবিং-এর কাজ করতে হয়। ফলত গলার ওপর সাঙ্ঘাতিক প্রেসার পড়ে, অত্যাধিক যাতায়াতের ফলে শরীর দূর্বল হয়ে পড়ে। অর্থ রোজগার করতে গিয়ে আমার মূল সম্পদ এই কণ্ঠই যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তো সব কিছু শেষ!

আমাদের এই সংগঠনের শিল্পীরা এখন ট্রেড উনিয়ানের আওতায় পড়ছে। এটা আমাদের সাফল্য। ভয়েজ ওভার আর্টিস্টদের যোগ্য পারিশ্রমিক, যোগ্য সম্মান, বিনোদন জগতের শিল্পী হিসেবে তাঁদের নাম সকলে জানুক। এর পাশাপাশি দুঃস্থ শিল্পীদের আর্থিক সাহায্য করা। এই নিয়েই লড়াই চলবে।

HT Bangla-র পক্ষ থেকে সাধুবাদ জানাই ‘AVATAR’-এর এই প্রয়াসকে।

ডাবিং চলছে।
ডাবিং চলছে।
বন্ধ করুন