বাড়ি > ঘরে বাইরে > গালওয়ানে তিন দফায় সংঘর্ষ, পরিকল্পিত হামলার জন্য অন্য সেক্টর থেকে ফৌজি এনেছিল চিন
এরকম এলাকায় সংঘর্ষে জড়িয়েছিলে ভারতীয় এবং চিনা সেনা (ফাইল ছবি, রয়টার্স)
এরকম এলাকায় সংঘর্ষে জড়িয়েছিলে ভারতীয় এবং চিনা সেনা (ফাইল ছবি, রয়টার্স)

গালওয়ানে তিন দফায় সংঘর্ষ, পরিকল্পিত হামলার জন্য অন্য সেক্টর থেকে ফৌজি এনেছিল চিন

  • দ্বিতীয় দফায় প্রতি আক্রমণে ১৬ জন চিনা ফৌজিকে খতম করা হয়। অসংখ্য চিনা ফৌজিকে পিটিয়ে এমন হাল করেন যে তাদের প্রাণহানিও হতে পারে।

রাহুল সিং

একটি নয়, গত ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় তিন দফায় সংঘর্ষ হয়েছিল। আর সেজন্য আগেভাগে পরিকল্পনা করে অন্য সেক্টর থেকে ফৌজি সরিয়ে বিতর্কিত সীমান্তে নিয়ে এসেছিল চিনা সেনা। এমনটাই জানিয়েছেন আধিকারিকরা।

বিষয়টি নিয়ে অবশ্য সরকারিভাবে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। তবে গালওয়ান সংঘর্ষে যে জওয়ানরা ছিলেন, তাঁদের থেকেই এই তথ্য পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই আধিকারিকরা। 

এক আধিকারিক জানান, সংঘর্ষের দিন সন্ধ্যা ছ'টা নাগাদ ১৬ বিহার রেজিমেন্টের কম্য়ান্ডিং অফিসার কর্নেল বি সন্তোষ বাবুর নেতৃত্বে ভারতীয় সেনার ৩০ জনের একটি দল প্যাট্রোলিং পয়েন্ট ১৪-তে গিয়েছিল। চিনা সেনা তাঁবু-সহ যে কাঠামো তৈরি করেছিল, গত ৬ জুনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেগুলি তুলে নেওয়া হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন ভারতীয় জওয়ানরা। কিন্তু চিনা সেনা পিছু হটেনি। সেখানে তাদের নজরদারি পোস্ট এবং তাঁবু ছিল। পাশাপাশি একজন কম্যান্ডিং অফিসার-সহ মোটামুটি ২০ জন চিনের ফৌজি ছিল। 

দ্বিতীয় আধিকারিক জানান, ভারতীয় জওয়ানরা সেই এলাকা ছাড়তে বললেও চিনা সেনা তা মানতে অস্বীকার করে। তার জেরে দু'পক্ষের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। ধাক্কা মারা হয় কর্নেল বাবুকে। তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে চিনা ফৌজিদের পিটিয়ে এলাকা ছাড়া করেন ভারতীয় জওয়ানরা। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার এপারে অর্থাৎ ভারতের দিকে চিনা সেনার তাঁবুতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। ভেঙে ফেলা হয় নজরদারি পোস্ট।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরই বোঝা যায়, রীতিমতো ছক কষে হামলার পরিকল্পনা করেছে চিনা সেনা। দ্বিতীয় আধিকারিক বলেন, ‘কিন্তু ভারতীয় জওয়ানদের কোথাও একটা খটকা লাগে। কারণ কয়েক মিনিট আগেই যে চিনা কর্নেল এবং ফৌজিদের সঙ্গে বিবাদ হয়েছিল, তাঁদের পুরোপুরি অপরিচিত। একই এলাকায় প্রতিপক্ষ জওয়ানরা টহল দিলে তাঁরা একে অপরকে চিনতে পারেন। কিন্তু এবার সবাই নতুন মুখ ছিল। পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হামলা চালাতে অন্য কোনও জায়গা থেকে ফৌজি পাঠিয়েছিল পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)।’ তিনি জানান, পরিচিত জওয়ানরা গালওয়ানের মতো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়বেন, সেই সম্ভাবনা অনেকটাই কমও। ওই আধিকারিকের কথায়, 'চিন জঘন্য কৌশল কাজে লাগাচ্ছিল এবং কর্নেল বাবু তা বুঝতে পেরেছিলেন।'

ইতিমধ্যে বাড়তি জওয়ান চেয়ে পাঠায় ভারতীয় দল এবং চিনা সেনারা নিজেদের দেশে ফিরে গিয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে প্যাট্রলিং পয়েন্ট ১৪ পর্যন্ত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জওয়ানরা। কর্নেল বাবুর নেতৃত্বে কয়েকজন অফিসার-সহ মোটামুটি ৮০ জন জওয়ানের একটি দল প্যাট্রোলিং পয়েন্ট ১৪-তে যায়। প্রথম আধিকারিক জানান, ততক্ষণে সেখানে অনেক চিনা ফৌজি জমায়েত হয়ে গিয়েছে। পাথর, লোহার রড, পেরেক লাগানো গদা নিয়ে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয় তারা। একেবারে সবকিছু পরিকল্পনা করে আসা ২৫০ জন চিনা ফৌজির সঙ্গে ভারতীয় জওয়ানদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়।

ওই আধিকারিক বলেন, ‘দ্বিতীয় লড়াই এখানে শুরু হয়। কর্নেল বাবু এবং আরও দুই ভারতীয় জওয়ানকে নৃশংসভাবে মারধর করে চিনা সেনা। তাঁরা নদীতে পড়ে যান। তবে চিনারা হয়তো জানত না, তারা ভারতীয় কম্যান্ডিং অফিসারকে ফেলে দিয়েছে।’ তারপরই চিনা সেনাদের পালটা পেটান ভারতীয় সেনারা। ভারতীয়দের সংখ্যা কম হলেও এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে নারাজ ছিলেন না তাঁরা। নিজেদের সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করেন। প্রতি আক্রমণে ১৬ জন চিনা ফৌজিকে খতম করা হয়। অসংখ্য চিনা ফৌজিকে পিটিয়ে এমন হাল করেন যে তাদের প্রাণহানিও হতে পারে। ভারতীয় সেনায় কম্যান্ডিং অফিসারকে পিতৃসুলভ চোখে দেখা যায়। তাঁর প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা এবং আনুগত্য থাকে জওয়ানদের। সেই দ্বিতীয় দফায় ২০ জন ভারতীয় জওয়ানের মৃত্যু হয়। 

ইতিমধ্যে লড়াই কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়লে দু'পক্ষই বাড়তি বাহিনী চেয়ে পাঠায়। ফলে তৃতীয় দফায় প্রায় ৬০০ জন জওয়ানের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। চিনের প্রায় ৪০০ জন ফৌজি ছিল বলে জানান আধিকারিক। পরদিন সকালে মৃত জওয়ানদের দেহ হাতে পায় ভারত। ১৬ বিহার রেজিমেন্ট ছাড়াও ৩ পঞ্জাব, ৩ মিডিয়াম রেজিমেন্ট এবং ৮১ ফিল্ড রেজিমেন্ট সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল।

বন্ধ করুন