বাড়ি > বায়োস্কোপ > মা হওয়ার পর টলিউডে কনীনিকার দ্বিতীয় ইনিংস, আজ এক্সক্লুসিভ আড্ডায় অভিনেত্রী
কিয়া ও কনি
কিয়া ও কনি

মা হওয়ার পর টলিউডে কনীনিকার দ্বিতীয় ইনিংস, আজ এক্সক্লুসিভ আড্ডায় অভিনেত্রী

‘আমি অলরাউন্ডার। খেলতে ভালোবাসি, কিন্তু খেলার জন্য আমায় মাঠ দেওয়া হয় না। টুয়েলভ ম্যান হয়ে বসে থাকি, যেটুকু সুযোগ পাই তাতে রান তুলে বেরিয়ে আসি। খেলতে নামলে মাঠ আমার। নেপোটিজম, স্বজনপোষণ ইত্যাদির ঊর্ধ্বে গিয়ে একটাই কথা বলব, ফ্লোরই আমার ঠিকানা। এখানেই আমার মুক্তি।’ HT Banglar সঙ্গে আড্ডায় কনীনিকা। 

‘নেপোটিজম’, দু'মাসে সবচেয়ে বেশি চর্চিত শব্দ। কী বলবেন?

রাজার ছেলে রাজাই হয়। ইতিহাস বলে, সেই অনেক যুগ আগে নাকি  নিচু জাতের কোনও ছেলে যদি ট্যালেন্টেড হত তবে তাঁকে ব্রাক্ষ্মণত্ব দেওয়া হত। কিন্তু সেটা বিরল। তাই অ্যাক্টরের ছেলে যে অ্যাক্টর হবে এবং অন্যদের চেয়ে একটু  বেশি প্রিভিলেজ পাবে সেটাই স্বাভাবিক। এটাই তো সিস্টেম। 

আমার মতে ভাগ্য, ট্যালেন্ট ও ধৈর্য্যের ওপর নির্ভর করে কারও সাফল্য। এই নেপোটিজম বিষয়টা শুরু হয়েছিল সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যার পর থেকে। আমার মনে হয়েছিল ওঁ একজন যোদ্ধা। আমি ওঁর কত বড় ফ্যান ছিলাম জানি না, কিন্তু এই মৃত্যুটা হজম করতে পারিনি। আমার এখনও বিশ্বাস এর পেছনে অন্য কোনও রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। একজন ফাইটার সুইসাইড করতে পারে না।

যদি আমার কথা বলো তাহলে আমি মনে করি আমিও একজন ফাইটার। সেই প্রথম থেকে লড়াই করে টলিউডে নিজের জন্য একটা জায়গা তৈরি করেছি। এবং আজও লড়াই করছি কাজের জন্য। আমি জানি না আমার ভবিষ্যত কী! জানি না ক'টা কাজ পাবো, বা আবার নিজেকে প্রমাণ করতে পারব কিনা! আমার ক্ষেত্রেও যদি কোনও ক্রাইসিস তৈরি হয় তাহলে আমি কোনও দিন সুইসাইড করব না। পরিস্থিতির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব। কারণ, যাই হয়ে যাক না কেন, আমি ময়াদান ছেড়ে পালাবার মানুষ নই। 

ছুটির মজায়
ছুটির মজায়

কাজ জেনেও কাজ পাননি দিনের পর দিন, ডিপ্রেশন হয়নি?

দেখো সব মানুষ তো আলাদা তাই সকলের চাপ নেওয়ার ক্ষমতা সমান নয়। ‘ডিপ্রেশন’ একটা ছোট্ট শব্দ, কিন্তু তার ব্যাপ্তি বিশাল! আসলে তো মনখারাপ থেকেই এই সবের শুরু, আর মন খারাপ কার না হয়? আমার একটা ছবি যদি না চলে, বা খুব ভালো অডিশন দিয়েও সুযোগ পেলাম না, বা আমার প্রায় কনফার্ম হয়ে যাওয়া কাজ শেষ মুহূর্তে শুনলাম আমার বদলে অন্য কাউকে সিলেক্ট করা হয়েছে! তখন আমারও সাঙ্ঘাতিক মন খারাপ হয়। আমি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে দেখছি  সেই মেয়েটি বারবার নিজের ছবি পোস্ট করে কাজটার ব্যাপারে, তাঁর চরিত্রটির বিষয়ে বিভিন্ন কথা লিখছে, সেই সব দেখে আমার মন খারাপ হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। আমি জানি আমিও যোগ্য ছিলাম কিন্তু আমার ভাগ্য বিমুখ তাই কাজটা হলো না। এতে মনখারাপ হবেই, আর যদি তা না হয় তাহলে তো আমি মানুষই নই!

 এই নেপোটিজম, স্বজন পোষণ ইত্যাদির  ঊর্ধ্বে গিয়ে একটাই কথা বলব, একজন অ্যক্টর যখন জন্ম নেয় তখন তাঁর সঙ্গে সহজাত ভাবেই আসে তাঁর পেশেন্স, বুদ্ধিমত্তা এবং ধৈর্য্য। তাঁকে অপেক্ষা করতে হয় সেই মোক্ষম সময়টার জন্য, সেটাকেই পেশেন্স বলে। নিজেকে প্রমাণ করার জন্য শেষ অবদি লড়ে যেতে হবে। এবং এটাও খুব সত্যি যে সে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেই বা তাঁর সফলতা আসবেই সেটাও কিন্তু শেষ কথা নয়।  সবাই তো অমিতাভ বচ্চন, ট্ম হ্যাঙ্কস বা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় হয় না, তাঁরা প্রচুর লড়াই করে আজ এই জায়গায় দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের ভাগ্যও তাঁদের সঙ্গ দিয়েছে তাই আজও  নিজেদের ক্ষ্যাতির শীর্ষে বসিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সব মানুষ সেটা পারেন না। অনেক মানুষকে পারমুটেশন কম্বিনেশন করতে করতে এগোতে হয়। তাই নেপোটিজম, ফেভারিটজম, এই সব নিয়ে কথা বলে কোনও লাভ নেই। এরকম অনেক নেপোটিজমের  হিরো হিরোইনদের কথা আমরা জানি যাঁদের সিনেমা বারবার ফ্লপ হয়েছে। বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফিল্মি কেরিয়ার তৈরিই হয় নি। ওই অনেকটা ইঞ্জিনিয়ারিং ডাক্তারিতে চান্স পাওয়ার পর সেটা পাশ করেও যদি অন্য পেশায় চলে যায় সেক্ষেত্রে সিটটা যেমন নষ্ট হয় এই ব্যাপারটা অনেকটা তেমন। যাঁদের ট্যালেন্ট ছিল তাঁরা সেই সিনেমা গুলতে সুযোগ পেল না, সিনেমাটা নষ্ট হলো। এই জায়গাটা তো নিশ্চই  খুব কষ্টের।

তাহলে চলার পথের ভারসাম্যটা বজায় রাখার  উপায়?

সত্যি কথা বলতে ব্যালেন্সড ওয়েতে কেউই কাজ পায় না। আমাদের কলকাতা ইন্ডাস্ট্রিতে কিছু অ্যাক্টর রেগুরাল কাজ পাচ্ছেন,  আবার একটা শ্রেনীর হাতে কাজই নেই, এই সব নিয়েই তো চলেছি।  বারংবার নিজেকে প্রমাণ করেছি। আমার ছবি ভালো ব্যাবসা দিয়েছে, তারপরও আমার হাতে কাজ নেই! তার জন্য আমার দুঃখ রয়েছে, কিন্তু ফ্রাসস্ট্রেশন নেই। কারণ আমি কেমন প্রডাক্ট সেটা আমি জানি। আমি একজন ভালো মাত্রার অভিনেত্রী সেটা আমি জানি। আরে বাবা আমার ট্যালেন্টটা তো কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না! আর আমার ভাগ্যটাকেও কেউ বদলাতে পারবে না। একজন অভিনেতার কিন্তু কনফিডেন্সটাই সব। হতেপারে এই মুহূর্তে আমার চেয়ে বেশি অন্য একজন অ্যক্টর এখন প্রচুর কাজ করছেন বলে আমি তাঁর গায়ে কাদা ছিটিয়ে যা খুশি তাই বলব, সে খারাপ আর আমি অন্যতম সেরা! এটা ঠিক নয়। আমাদের সকলের সঙ্গেই কম বেশি অনেক অনভিপ্রত ঘটনা ঘটেছে এবং আজও ঘটে। এই নেপোটিজম, দলবাজি, কাদা ছেটানো, ইত্যাদি বন্ধ হওয়ার নয়। এর মধ্যে থেকেই তোমায় পথ নির্বাচন করতে হবে, লক্ষে এগোতে হবে।  

অভিনেত্রী
অভিনেত্রী

আপনার হিট-ফ্লপের দায় কি শুধুই আপনার নিজের?

আমার হিট ফ্লপের দায় নেপোটিজমের ওপর চাপাবো না। আমি কোন দিক দিয়ে আমার পথটা নিয়ে যাব সেটা তো আমিই নির্বাচন করেছি , এবার পথ নির্বাচন করার পর তার ফলটা যখন আমি খাই, আমি তো জানি এটা কোন পথ দিয়ে হেঁটে আসার ফল আমি খাচ্ছি। হ্যাঁ এই মুহূর্তে হয়ত অনেকেই বলবেন কনি খুব ফ্রাস্ট্রেটেড। কাজ নেই, বাড়িতে বসে আছে। তাতে আমার কিচ্ছু আসে যায় না। কারণ আমি জানি আমি আবার ফর্মে ফিরব খুব তাড়াতাড়ি। বহুবার মুখ থুবড়ে পড়েছি। কিন্তু হেরে যাইনি। আবার উঠে দাঁড়িয়েছি। আমি জানি আবার আমার  সময় আসবেই।

এখন তো  ছোট্ট ‘কিয়া’ জন্য ইন্ডাস্ট্রি থেকে কিছুটা দূরে, অভিনেত্রী, নাকি মাতৃ সত্তা, কোনটা গুরুত্বপূর্ণ?

এক্ষেত্রে বলতে পারো ইচ্ছে করেই মুখ থুবড়ে পড়লাম। কারণ মা হতে চাওয়াটা আমার এবং সব মেয়েরই সর্বকালের সেরা চাওয়া। মা হয়েছি বলে নয়, যখন থেকে বড় হয়েছি, নারীত্ব বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই আমার ভেতরেও খুব সহজাত ভাবেই প্রতিপালিত হয়েছে মাতৃ সত্তা। এই সময়টা প্রাণভরে অনুভব করতে চাই। আমি কেবল ইন্ডাস্ট্রিকে বলতে চাই একটা মেয়ের মা হওয়া মানে এই নয় যে তাঁর কেরিয়ার ধংস হয়ে গেল এমনটা কিন্তু নয়, এটা কিছুটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। 

আমার ছোট্টো মেয়েটার সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি  টুকটুক করে কাজ শুরু করেছি। লকডাউনে শর্ট ফিল্ম বানিয়েছি। লেখালেখি করেছি, আমি আমার নিজের ক্রিয়েটিভ জোনেই সময় কাটাচ্ছি। এই পরিস্থিতিতে সবার মতো আমারও অনেক ক্রাইসিস তৈরি হয়েছে, আমারও অভাব হয়েছে, রোজগার নেই। কিন্তু আমি মনে করি এটা একটা লার্নিং প্রসেস। অভাব মানুষকে উঠে দাঁড়াতে শেখায়।

বিয়ের পর থেকে বেশ অনেক গুলো কাজ করলেন, আগামী প্ল্যানিং?

বিয়ের পর থেকে প্রেগন্যানসির পুরো সময়টা জুড়ে একটা ভালো জিনিস হয়েছে আমার জীবনে- পোস্ত, হামি, হইচই আনলিমিটেড, অন্দরমহল, কন্ঠ ও মুখার্জীদার বউ  সহ বেশ কিছু সফল ছবিতে আমি কাজ করেছি। তারপর একটা বছর দেড়েকের বিরতি নিলাম। কিয়াকে একটু তো বড় করতে হবে। তাছাড়া এটাই তো আমি চেয়েছিলাম। কিয়ার এই বড় হওয়ার প্রতিটা মুহূর্ত আমি আগলে রাখতে চাই আমার সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি হিসেবে। এই সময়টা তো আর কোনও দিন ফেরত আসবে না। তাছাড়া লকডাউনকে আমি ধন্যবাদ দিতে চাই, এই সময়টা আমাদের একে অপরকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। দূরে থাকা সম্পর্ক গুলোকে কাছে নিয়ে এসেছে এই কোভিড প্যান্ডামিক। নিজেকে ভালো করে বুঝতে শিখিয়েছে। আমি অনেক গুলো কাজ করেছি এই সময়টায়, হয়ত এর থেকে একটা টাকাও রোজগার হয়নি, কিন্তু আমার শিল্প সত্তা আমায় আরও কনফিডেন্ট করেছে।

ছবি সৌজন্য কনীনিকা
ছবি সৌজন্য কনীনিকা

স্বামী প্রোডিউসার মানেই অভিনেত্রী স্ত্রীর পোয়াবারো! টলি নেপোটিজমের কটাক্ষের কতটা শিকার আপনি?

(হাসি) আমার স্বামী প্রোডিউসার এটা ঠিকই , কিন্তু ষড়রিপুর পর এখনও পর্যন্ত কোনও ছবি প্রোডিউস করেনি, আর ষড়রিপু আমার বিয়ের আগের ছবি।  হয়ত ভবিষ্যতে ও  আবারও কাজ করবে। আমরা দু'জনেই কেউ কারও কাজের ব্যাপারে নাক গলাই না। তাহলে এর থেকে বোঝাই যাচ্ছে বর প্রডিউসার বলে আমি প্রচুর কাজ পাচ্ছি এমন কোনও গল্প বাস্তবে নেই,  সে টলিউড যাই বলুক! 

যত ভালোই কাজ করি না কেন, কাজ আমাকে কেউ দিতে চায় না! এটা আমি অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছি। তাতে যদি লোকে বলে আমার মুরোদ নেই, তাতে আমার ভারি বয়ে গেল!  কিন্তু যতবার সুযোগ পাবো ততবার নিজেকে প্রমাণ করব, এটাই আমার চ্যালেঞ্জ। আমি অলরাউন্ডার। আমি খেলতে ভালোবাসি। কিন্তু খেলার জন্য আমায় মাঠ দেওয়া হয় না। আমি টুয়েলভ ম্যান হয়ে বসে থাকি। কিন্তু যেটুকু সুযোগ পাই তাতে রান তুলে বেরিয়ে আসি। খেলতে নামলে মাঠ আমার।

আমি হার্ডওয়ার্কিং মানুষ। আমি কনফিডেন্ট। কারণ আমার কাছে পুরোটাই লবডঙ্কা। প্রতিবারই নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। একজন অ্যাক্টর নিজেই সবচেয়ে ভালো বোঝে তাঁর অ্যাক্টিং স্কিল। মাঝে মাঝে পালাবার চেষ্টা করেছি শুটিং ছেড়ে। কিন্তু এই ইন্ডাস্ট্রি ও পরিস্থিতি আমাকে প্রতিবারই টেনে এনেছে  ফ্লোরে। এটাই আমার ঠিকানা। এখানেই আমার মুক্তি।

আফসোস হয় কোনও কিছুর জন্য?

তখন ছোট ছিলাম। রক্ত গরম ছিল। সিনেমার সম্পর্কে অন্য ধারণা ছিল। ভাবতাম কেবল গাছের ডাল ধরে নাচতে হবে এমন সিনেমায় কাজ করব না। বোকার মতো, বুম্বাদা, মিঠুনদার সঙ্গে কাজের অফার ফিরিয়েছি। পরবর্তী সময়ে বিগ বসের ঘরে মিঠুনদাকে সামনে থেকে পেলেও, বুম্বাদার সঙ্গে কাজ না করার ক্ষোভটা আমার থেকেই গেল। জানি না, তবুও ভবিষ্যতে আশা থাকবে যাতে ক্ষোভটা মেটাতে পারি। স্বপ্নতো দেখতেই হবে, না হলে পূরণ হবে কেমন করে! তুমি যা ভাববে সেটা তোমার জীবনে ঘটবে, এটা আমি বিশ্বাস করি। আমি জানি সামনে ভালো সময় আসছে।

বন্ধ করুন