সিএএ-বিরোধী আন্দোলন ঘিরে হিংসায় আক্রান্ত দিল্লি। ঘটনায় ইতিমধ্যে ৭ জনের মৃত্যু হয়েচে, আহত অসংখ্য। ছবি সৌজন্যে এপি। (AP)
সিএএ-বিরোধী আন্দোলন ঘিরে হিংসায় আক্রান্ত দিল্লি। ঘটনায় ইতিমধ্যে ৭ জনের মৃত্যু হয়েচে, আহত অসংখ্য। ছবি সৌজন্যে এপি। (AP)

জ্বলছে দিল্লি, বাঙালি সাংবাদিককে প্যান্ট খুলতে বলল রডধারী হানাদার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-সহ ভিভিআইপি সমাগম সত্ত্বেও দিল্লিতে হিংসার রমরমা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার আঁখোদেখি বিবরণ পাওয়া গিয়েছে সাংবাদিকের কলমে।

সিএএ-বিরোধী আন্দোলন কেন্দ্র করে দিল্লিতে হিংসার নিশানায় পড়ল সংবাদমাধ্যম। মঙ্গলবার গুলিবিদ্ধ হলেন এক সাংবাদিক। বেধড়ক মারধর করা হল আরও দুই সংবাদকর্মীকে। সোমবার উত্তপ্ত এলাকায় খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে হুমকির মুখে পড়ে কোনও রকমে রেহাই পেলেন আর এক বাঙালি সাংবাদিক।

এ দিন উত্তর-পূর্ব দিল্লির মৌজপুরে হামলাকারীদের গুলিতে জখম হয়েছেন জে কে ২৪X ৭ নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিক আকাশ। তাঁকে চিকিত্সার জন্য ভরতি করা হয়েছে স্থানীয় হাসপাতালে। এ ছাড়া জ্বলন্ত মসজিদের ছবি তুলতে গেলে প্রচণ্ড মারধর করা হয় এনডিটিভি চ্যানেলের দুই সাংবাদিক অরবিন্দ গুণশেখর ও সৌরভ শুক্লাকে। গতকাল ওই এলাকাতেই ছবি তুলতে গিয়ে আক্রান্ত হন টাইমস অফ ইন্ডিয়ার চিত্র সাংবাদিক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়।

মঙ্গলবার টাইমস অফ ইন্ডিয়া সংবাদপত্রে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে চিত্র সাংবাদিক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় তাঁর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছেন, যা পড়লে শিউরে উঠতে হয়। তিনি জানিয়েছেন, উত্তেজনাপূর্ণ জাফরাবাদ অঞ্চলে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হিংসার নিশানায় পড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি ও তাঁর সহকর্মী সাংবাদিক।

অনিন্দ্য লিখেছেন, সোমবার দুপুর ১২.১৫ নাগাদ তিনি মৌজপুর মেট্রো রেল স্টেশনে পৌঁছতেই এক হিন্দু সংগঠনের সদস্য তাঁর কপালে তিলক এঁকে দিতে তত্পর হন। আপত্তি করলে তাঁকে শুনতে হয়, ‘ভাই, আপনিও তো হিন্দু। তা হলে অসুবিধা কীসের?’

এর ১৫ মিনিট পরেই এলাকায় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে পাথর ছোড়াছুড়ি শুরু হয় এবং ‘মোদী’ ‘মোদী’ স্লোগানের মাঝে কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যায়। জানা যায়, স্থানীয় একটি বাড়িতে আগুন লেগেছে। সে দিকে এগোতে গেলে একটি শিব মন্দিরের কাছে অনিন্দ্যকে বাধা দেন একদল। অগ্নিকাণ্ডের ছবি তুলতে যাচ্ছেন জানতে পেরে তাঁরা সাংবাদিককে বলেন, ‘ভাই, আপনিও তো হিন্দু। তা হলে ওখানে কেন যাচ্ছেন? আজ হিন্দুরা জেগে উঠেছে।’

বাধা পেয়ে ঘুরপথে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ছবি তুলতে গেলে তাঁকে ঘিরে ফেলে হাতে লাঠি ও লোহার রডধারী একদল। তারা সাংবাদিকের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে বাধা দেন তাঁর সহ-সাংবাদিক সাক্ষী চাঁদ। রুখে দাঁড়াতেই সেখান থেকে চম্পট দেয় সশস্ত্র দলটি।

তবে একটু পরেই অনিন্দ্য বুঝতে পারেন, তাঁর পিছু নেওয়া হয়েছে। অনুসরণকারীদের মধ্যে এক তরুণ এগিয়ে এসে তাঁকে সতর্ক করে, ‘ভাই, তুই একটু বেশি চালাকি করছিস। তুই হিন্দু, না মুসলিম?’ তারা সাংবাদিকের প্যান্ট খুলে ধর্মীয় চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করলে হাতজোড় করে অনেক অনুনয়ের পরে কিছু হুমকি দেওয়ার পরে রেহাই দেওয়া হয় চিত্র সাংবাদিককে।

নিজের দফতরের অপেক্ষমান গাড়ি খুঁজে না পেয়ে একটি অটো রিকশা ধরে তথ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন অনিন্দ্য। কিন্তু অটোচালক মুসলিম হওয়ায় তাঁদের মাঝপথে থামিয়ে ঘেরাও করে চার জন সশস্ত্র যুবক। কলার ধরে দুজনকে অটো থেকে নামিয়ে মারধরের উপক্রম করে দুষ্কৃতীরা। নিজের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এবং অটোচালক যে নির্দোষ, সে কথা জানিয়ে অনেক অনুনয়ের পরে ছাড়া পান অনিন্দ্য ও তাঁর সঙ্গী চালক।

শহরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-সহ ভিভিআইপি সমাগম সত্ত্বেও দিল্লিতে হিংসার রমরমা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার আঁখোদেখি বিবরণ পাওয়া গিয়েছে সাংবাদিকের কলমে। সংবাদমাধ্যমের কর্মীর প্রতিই যদি এ হেন আচরণ হয়, তা হলে রাজধানীর অশান্ত পরিস্থিতিতে সাধারণের নিরাপত্তা যে বিপন্নতার কোন ধাপে এসে দাঁড়িয়েছে, তা এখন স্পষ্ট।

বন্ধ করুন