বাংলা নিউজ > বাংলার মুখ > কলকাতা > ২১ জুলাই কমিশনের রিপোর্ট কেন ধামাচাপা দিয়ে রেখেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
২১ জুলাই ১৯৯৩, ধর্মতলায় যুব কংগ্রেসের কর্মসূচি। 
২১ জুলাই ১৯৯৩, ধর্মতলায় যুব কংগ্রেসের কর্মসূচি। 

২১ জুলাই কমিশনের রিপোর্ট কেন ধামাচাপা দিয়ে রেখেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?

  • ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে এবং মুখ্যমন্ত্রী হন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওড়িশা উচ্চ আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন একটি কমিশন গঠন করে মমতা সরকার।

দীপন মজুমদার

দক্ষিণবঙ্গ সম্পর্ক প্রমুখ, ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডল


১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি বিশেষ দিন। বলা ভালো, ২১ জুলাইয়ের ভয়ঙ্কর ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক গ্রাফ ধীরে ধীরে শিখরে পৌছে যায়। ১৯৯১ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার জেলায় জেলায় রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং রিগিং করে পুনরায় পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। সেই সময় ভোটার কার্ডে ফটো আইডি থাকত না যার যেরে খুব সহজেই ছাপ্পা ভোট বা রিগিংয়ের মতো দুষ্কর্ম করা যেত। ১৯৯৩ সালে তৎকালীন যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যুব কংগ্রেস ২১ জুলাই এসপ্ল্যানেড রোডে এক বিশাল জমায়েতের আয়োজন করে। প্রায় পঞ্চাশ হাজার যুব কংগ্রেসের কর্মী সেই কর্মসূচিতে যোগ দেন। কারণ সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের প্রধান বিরোধী দল ছিল জাতীয় কংগ্রেস।

দুপুর থেকেই ওই দিন সমস্ত জেলা থেকে কংগ্রেসের কর্মীরা কলকাতার বুকে জড়ো হতে শুরু করেন। তাদের মূল দাবি ছিল ভোটার আইডি কার্ডে সংশ্লিষ্ট ভোটারের ছবি থাকতে হবে। নইলে ছাপ্পা ভোট বা রিগিং আটকানো সম্ভব নয়। সেদিন সব কিছুই এগোচ্ছিল আম জনতার স্বতঃস্ফুর্ত আন্দোলনের হিসাবে। তবে মমতার পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তৎকালীন প্রদেশ কংগ্রেসের মূলত দু’টি লবি ছিল। একটি প্রয়াত কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির। অন্যটি প্রয়াত নেতা সোমেন মিত্রের। মমতা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির ঘনিষ্ঠ ছিল বলেই জানা যায়।

তাই প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির প্রচুর অনুগামী নেতা ওই দিন মহাকরণের কাছে জড়ো হন। প্রথমদিকে সভাস্থল পুরোপুরি শান্ত ছিল। অপ্রীতিকর কোনও ঘটনার সূত্রপাতও প্রথম দিকে হয়নি। পুরো এলাকাতে ঘোড়সওয়ার মাউন্টেড পুলিশ টহল দিচ্ছিল। এরপরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার অনুগামীরা জমায়েতে এসে উপস্থিত হওয়ার পর হঠাৎ তুমুল বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। দশ- পনেরো মিনিটেই এই বিশৃঙ্খলা বীভৎস আকার নেয়। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর থেকে পরে আমরা জানতে পারি, ওই দিন সভাস্থলে মমতার দেরি করে আসা ছিল ইচ্ছাকৃত। মাউন্টেড পুলিশের ঘোড়াগুলিকে পরিকল্পনামাফিক আলপিন ফুটিয়ে উত্যক্ত করতে থাকেন যুব কংগ্রেস কর্মীরা।

যার ফলে আন্দোলনকারী যুব কংগ্রেস সমর্থক এবং পুলিশের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়। বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকায় পুলিশ প্রথমটাতে টিয়ার গ্যাসের ব্যাবহার করে। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যাপক লাঠিচার্জও করা হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব মণীষ গুপ্তের নির্দেশে কলকাতা পুলিশ কমিশনার তুষার তালুকদারের নেতৃত্বাধীন পুলিশ গুলি চালায়। সেই মণীষ গুপ্ত প্রথম তৃণমূল সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রী হন। বর্তমানে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ।

তৃণমূলের দাবি, পুলিশের গুলিতে সেদিন অন্তত ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মী প্রাণ হারান। পুরো কর্মসূচিটি ছিল যুব কংগ্রেসের এবং এই ঘটনার সাথে তৃণমূল কংগ্রেসের দূরদূরান্ত অবধি কোন যোগাযোগ ছিল না।

২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে এবং মুখ্যমন্ত্রী হন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওড়িশা উচ্চ আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন একটি কমিশন গঠন করে মমতা সরকার। এই কমিশন তার প্রাথমিক রিপোর্টে সুপারিশ করে, নিহত ১৩ জনের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সেই মতো ২১ জুলাইয়ের সমস্ত ‘শহিদ’দের পরিবারকে তৃণমূল সরকার সরকারি ক্ষতিপূরণ ও আরও সরকারি সুযোগ সুবিধা দিয়েছে।

এই ‘শহিদ’-এর তালিকায় ১৩ নম্বর নামটি হচ্ছে ‘ইনু’! তবে এতো সুযোগ সুবিধা দেওয়া সত্বেও তৃণমূল ইনুর আসল পরিচয় এবং তার পদবি বা উপাধি কী সেটা জানতে ব্যর্থ! আসলে এই ১৩ জনের মধ্যে অধিকাংশই ভুয়ো এবং তাদের বাস্তবে কোন অস্তিত্বই নেই। তবে তৃণমূল ভবনে বড় করে শহিদদের যে তালিকা টাঙানো আছে সেখানে হুগলি জেলাতে তাপসী মালিকের জায়গা হয়নি! যেই তাপসী মালিকের মৃতদেহের উপর দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরকম আরো একটি ভুয়ো শহিদ তৃণমূল কংগ্রেসের ওয়েবসাইটে গেলে পাওয়া যাবে।

বর্ধমান জেলার শহিদদের তালিকার চতুর্থ নাম লকাই। সমস্ত শহিদদের পরিবারকে তৃণমূল সরকার নাকি সরকারি সাহায্য করেছে। কিন্ত তারপরেও লকাইয়ের পুরো নামটা জানতে পারেনি! এতে প্রশ্ন ওঠে, তবে কি মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে মমতার ২১ জুলাইয়ের প্রচার?

২১ জুলাই কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারপতি চট্টোপাধ্যায় সরাসরি বলেছেন,"The people who were at the helm of the Home Department as well as the police brass cannot escape responsibility"। যে স্বরাষ্ট্র সচিব গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই মনীষ গুপ্ত এখন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ! যদিও জাস্টিস চ্যাটার্জী তার রিপোর্টে কোন আধিকারিকের নাম সরাসরি ভাবে উল্লেখ করেননি। যার ফলে কমিশনের প্রিলিমিনারি রিপোর্ট যে তৃণমূল সরকার দ্বারা ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত তা বলাই বাহুল্য।

আজ এতগুলো বছর কাটলেও ২১ জুলাই বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জাস্টিস চ্যাটার্জীর কমিশন এখনো জমা দিতে পাড়েনি। কবে জমা দেবে বা আদৌ জমা দেবে কি না তা নিয়ে গভীর প্রশ্নচিহ্ণ থেকেই যায়। আজ তৃণমূল কংগ্রেসের ২১ জুলাইয়ে শহিদরা চলে গেছে পেছনের সারিতে, দু’বছর আগেও মেট্রো চ্যানেলের শহিদ দিবস পালন হয়েছিল দেব- সোহমদের নাচা-গানা দিয়ে। শহিদদের প্রতি এটাই কি তৃণমূলের যথার্থ শ্রদ্ধাঞ্জলি? 

(মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত)

বন্ধ করুন