বাংলা নিউজ > বায়োস্কোপ > ‘আজ কথা বলার অবস্থায় নেই,’ প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে ভেঙে পড়লেন অপর্ণা-শর্মিলা
কিংবদন্তী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বাংলা-সহ সমগ্র দেশ ও বিশ্ব।
কিংবদন্তী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বাংলা-সহ সমগ্র দেশ ও বিশ্ব।

‘আজ কথা বলার অবস্থায় নেই,’ প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে ভেঙে পড়লেন অপর্ণা-শর্মিলা

  • কিংবদন্তি শিল্পীর মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া ও স্মৃতিচারণায় আবিল হলেন বিশিষ্টরা।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বাংলা-সহ সমগ্র দেশ ও বিশ্ব। কিংবদন্তি শিল্পীর মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া ও স্মৃতিচারণায় আবিল হলেন বিশিষ্টরা।

ভারতীয় ছবির আর এক কিংবদন্তী পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের তিনি ছিলেন ‘মানসপুত্র,’ এমনই মনে করেন চলচ্চিত্র অনুরাগীরা। সত্যজিৎপুত্র সন্দীপ রায় সৌমিত্রর প্রয়াণে পরিবারের এক সদস্যকে হারানোর যন্ত্রণা অনুভব করছেন বলে জানালেন। তাঁর কথায়, ‘বাবার সঙ্গে এক অদ্ভূত কেমিস্ট্রি কাজ করত সৌমিত্রবাবুর। সুদীর্ঘ সম্পর্ক ছিল আন্তরিকতায় মাখা। অশনি সংকেত ছবির শ্যুটিংয়ের সময় ওঁকে ক্যামেরার ট্রলি ঠেলতেও দেখেছি। ওঁর সঙ্গে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক সুদীর্ঘ ও গভীর।’

অভিনেতা দীপংকর দে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শোকার্ত। পুরনো দিনের কথা বলতে গিয়ে জানালেন, ‘এক সময় একই পাড়ায় আমরা থাকতাম। ’

বাংলা ছবির রোমান্টিক জুটি হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেন তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন।
বাংলা ছবির রোমান্টিক জুটি হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেন তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন।

বাংলা ছবির রোমান্টিক জুটি হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেন তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। সহ-অভিনেতা ও পরম সুহৃদের প্রয়াণ নিয়ে বলতে গিয়ে আবেগমথিত হয়ে পড়েন। কোনওক্রমে বলেন, ‘বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আমার প্রথম ছবির নায়ক তিনি। তখন সৌমিত্রকাকু ডাকতাম। পরে তিনি আমাদের পারিবারিক বন্ধুহয়ে যাই। আমাদের মধ্যে এক সুন্দর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। বইপড়া নিয়ে ও আরও নানান বিষয়ে আমাদের অনেক আড্ডা হত। দীর্ঘ বন্ধুত্বের অসংখ্য টুকরো মুহূর্ত মনে পড়ে যাচ্ছে। আমার চেনা জগৎটা হারিয়ে যাচ্ছে। আজ আমি বেশি কিছু বলার অবস্থায় নেই।’

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে একাধিক ছবিতে জনপ্রিয় জুটি তৈরি হয়েছিল অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের। রবিবার তিনি বলেন, ‘ও কোনও দিন মরবে না। ওর কাজের মধ্যে দিয়ে, ওর স্মৃতির মধ্যে দিয়ে চিরদিন ও বেঁচে থাকবে মানুষের মনে। কাজের ফাঁকে হাসি-ঠাট্টায় মাতিয়ে রাখতেন সকলকে। ওঁর মার্জিত ব্যবহার সবাইকে মুগ্ধ করেছে বারে বারে।’

প্রথম ছবির সহ-অভিনেত্রীই শুধু নয়, একাধিক ছবি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল সৌমিত্র-শর্মিলা জুটি।
প্রথম ছবির সহ-অভিনেত্রীই শুধু নয়, একাধিক ছবি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল সৌমিত্র-শর্মিলা জুটি।

তাঁর প্রথম ছবির সহ-অভিনেত্রীই শুধু নয়, সুদীর্ঘ ছয় দশকের কেরিয়ারে একাধিক ছবি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল সৌমিত্র-শর্মিলা জুটি। এ দিন সতীর্থ ও বন্ধুর প্রয়াণে ভেঙে পড়েছেন শর্মিলা ঠাকুর। প্রতিক্রিয়ায় জানালেন, ‘ভীষণ ভীষণ খারাপ লাগছে। আজ আমার জীবনের এক গভীর শোকের দিন। অনেক দিন ধরেই ভুগছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম শেষ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে উঠবেন। উনি ছিলেন আমার বহু পুরনো বন্ধু। ওঁর মতো কে আছে আর? ওঁর অভিনয়, নাট্য পরিচালনা, সাহিত্য যা অবদান, তা যে ঐতিহ্যের পত্তন করেছে, তা চিরন্তন। ওঁর আবৃত্তি অসাধারণ। উনি চলে গেলেন, কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেক দিন উনি বেঁচে থাকবেন। আজ আমি অত্যন্ত শোকাহত, বড় দুঃখের দিন। অরণ্যের দিনরাত্রি ছবির শ্যুটিংয়ে উত্তরবঙ্গের এক ডাক বাংলোয় সৌমিত্র, শুভেন্দু ও আমি ছিলাম। রোজ কাজের পরে আমাদের আড্ডা জমত নানান বিষয়ে। উনি এত বিষয়ে গভীর ভাবে জানতেন যে, বারে বারে মুগ্ধ হয়েছি। এই অভাব অপূরণীয়।’

বর্ষীয়ান অভিনেতা ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় মানুষ হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অনাবিল উষ্ণ ব্যবহারের স্মৃতিচারণা করে অগ্রজ অভিনেতার সঙ্গে কাজ ও অবসরের ফাঁকে টুকরো নানান মুহূর্তের কথা রোমন্থন করেছেন। জানিয়েছেন, কোনও এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে উদ্যোক্তারা গাড়ির ব্যবস্থা করতে সমস্যায় পড়লে হাসিমুখে ট্যাক্সিতে বাড়ি ফেরার বিকল্প উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিদগ্ধ অভিনেতা।

সোনার কেল্লা ছবির সূত্রে মাত্র ৬ বছর বয়সে পরিচয় হয় অভিনেতা কুশল চক্রবর্তীর। স্মৃতি রোমন্থনে বললেন, ‘ওঁর মতো উচ্চতার মানুষ এত সহজ-সরল ব্যবহার করতেন বরাবর, যা ভাবতেই পারা যেত না। আজ চলচ্চিত্র জগতের এক পথনির্দেশককে হারালাম।’

সৌমিত্রর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের কথা জানিয়েছেন অভিনেতা শ্বাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘সৌমিত্র শুধু অভিনেতা নন, নাট্যকর্মী, পরিচালক, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ। তাঁর অভাব অপূরণীয়। আমার বাবার সঙ্গে যেমন বন্ধুত্বব ছিল, তেমনই আমাদের মতো কমবয়েসিদের সঙ্গেও তিনি অতি সাবলিল ভাবে মেলামেশা করতেন।’

নাট্যকর্মী শিল্পী গৌতম হালদার জানান, ‘আপামর বাঙালির কাছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নামটি শিহরণ জাগায়। গত কয়েক বছরে তাঁকে এক বন্ধু হিসেবে পেয়েছি। নাট্যমঞ্চে একসঙ্গে কাজ করার সময় ওঁর থেকে শিখেছি পরিমিতি বোধ, সংলাপকে কী করে শরীরী ও মনের ভাষায় একাকার করতে হয়, সেই শৈলী। পরে ছবিতে অভিনয়ের সময়ও তাঁর কাছে শিখেছি অভিনয়ের অজস্র বিষয়।’

সৌমিত্র সম্পর্কে স্মৃতিচারণায় বর্ষীয়ান অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক বলেন, ‘যে রকম নাম, যে রকম অ্যাচিভমেন্ট, কিন্তু বরাবর মাটির উপর দিয়েতিনি হেঁটেছেন। কোনও রকম আত্মম্ভরিতা তাঁর মধ্যে ছিল না। শ্যুটিংয়ে প্রতি পরে সহ-অভিনেতাদের কাছে জানতে চাইতেন, সব ঠিকঠাক হল তো? সবাইকে হাসি-ঠাট্টায় মাতিয়ে রাখতেন।’

বন্ধ করুন