বাংলা নিউজ > বায়োস্কোপ > Review of Feludar Goendagiri: সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ দেখে ৫টি ভালো লাগা, ৫টি না-ভালো লাগা
কেমন হল ফেলুদার নতুন গোয়েন্দাগিরি? 

Review of Feludar Goendagiri: সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ দেখে ৫টি ভালো লাগা, ৫টি না-ভালো লাগা

  • ওটিটি মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছে সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি: দার্জিলিং জমজমাট’। কেমন হল এই ৬ পর্বের ওয়েবসিরিজ। 

গত সপ্তাহের শেষে ওটিটি মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছে সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি: দার্জিলিং জমজমাট’। ৬ পর্বের এই সিরিজ নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই অনুরাগীদের প্রতীক্ষা ছিল। ফলে সিরিজটি মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এ নিয়ে বিরাট আলোচনা হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। 

তা সে সত্যজিৎ রায়ের লেখনির আকর্ষণেই হোক, এবং সৃজিত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে বাঙালির আগ্রহের কারণেই হোক, টোটা রায়চৌধুরী অভিনীত নতুন ফেলুদাকে নিয়ে প্রথম থেকেই দর্শকের মধ্যে উদ্দীপনা রয়েছে। এর আগে সৃজিত-পরিচালিত ফেলুদা-কাহিনি যে শুধুই প্রশংসিত হয়েছে— এমন কথা বোধ করি সৃজিতবাবুর পরম বন্ধুও বলবেন না। প্রশংসা হয়েছে, তেড়ে সমালোচনা হয়েছে, নিন্দা হয়েছে এবং মশকরাও হয়েছে। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। মিশ্র সমালোচনাই পেয়েছে সৃজিতের নতুন ‘ফেলুদা-সিরিজ’। 

এবার আসা যাক, এই সিরিজ সম্পর্কে কিছু কথায়। একটি নির্মাণ কাজ, তা সে যাই হোক না কেন, তাতে ভালো এবং মন্দ— সবই থাকে। সাধারণ দর্শক এবং ফেলুদাকাহিনির পাঠক হিসাবে এই সিরিজের কী কী ভালো লাগল, আর কী কী মন্দ— তা দেখে নেওয়া যাক।

ভালো লাগা:

১। পূর্বতন ফেলুদা-ছায়াছবির স্মৃতি মন থেকে ঝেরে ফেললে এবং সত্যজিৎ রায়ের কাহিনির ছন্দবদ্ধতার মায়া কাটিয়ে উঠলে, সৃজিত-পরিচালিত সিরিজটি মৌলিকভাবে উপভোগ্য। হালকা মেজাজে পর পর ছ’টি পর্ব দেখে ফেলা সম্ভব। মাঝে মধ্যে গতি কমে গেলেও শেষ পর্যন্ত পুরো সিরিজ দেখা ফেলা যাবে। বিশেষ অসুবিধা হবে না।

২। যেহেতু সৃজিত ছবির কাহিনির সময়কালটিকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন কয়েক দশক আগে, তাই পরিবেশ এবং পরিস্থিতি তৈরি করার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দরে দৃশ্যগুলির ক্ষেত্রে আলাদা করে নজর দিতে হয়েছে। যাঁরা সে সময়কার কলকাতা বিমানবন্দরের অন্দরসজ্জা চর্মচক্ষে দেখেছেন, বা যাঁরা ইন্টারনেটে ছবি দেখেছেন, তাঁদের চোখে ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি: দার্জিলিং জমজমাট’-এ দেখানো কলকাতা বিমানবন্দরের চেহারা বিশেষ বেমানান ঠেকবে না। আলাদা করে খুঁটিনাটি বিষয়ের উপর প্রবল জোর দেওয়া হয়েছে এক্ষেত্রে।

৩। বেশির ভাগ বাঙালিরই দার্জিলিং নিয়ে যথেষ্ট আবেগ আছে। সেই আবেগের প্রতি ষোলো আনা দায়িত্ব পালন করেছেন সৃজিত। মোটের উপর গোটা শহরের সুন্দর দৃশ্যায়ন হয়েছে। যা দর্শককে অনেকখানি তৃপ্তি দেয়।

৪। ছবির কাহিনির গতি একমুখী এবং নির্ভার। কোথাও হোঁচট খেতে হয় না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাহিনি নিজের গতিতেই দর্শককে নিয়ে চলে। 

৫। আলাদা করে টোটা রায়চৌধুরীর কথা বলা উচিত। তিনি ভালো অভিনেতা। ফেলুদা হিসাবে তিনি তাঁর পূর্বসূরীদের সাপেক্ষে কোথায় থাকবেন, তার উত্তর দেবে সময় এবং লেগে যাবে আরও কয়েকটি বছর। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য— তিনি এমন এক অভিনেতা, যাঁকে পর্দায় দেখে চোখে আরাম লাগে। বিরাট কায়দার মধ্যে না গিয়েও তিনি অতি সহজে নিজ অভিনীত চরিত্রে প্রাণদান করেন। 

না-ভালো লাগা:

১। দর্শক হিসাবে পর্দায় ফেলুদা-কাহিনি দেখার বড় আকর্ষণের জায়গা হল রহস্য সমাধানের পাশাপাশি বেড়াতে যাওয়ার মতো একটি অনুভূতি তৈরি করা। ‘সোনার কেল্লা’ বা ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টির কথা বাদ দিলেও সন্দীপ রায় পরিচালিত ফেলুদা-কাহিনিগুলিতেও সেই অনুভূতি যতটা চাগাড় দেয়, এক্ষেত্রে তার খামতি আছে। সন্দীপবাবুর ‘যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতে’র মতো ছবি (ছোটপর্দার জন্য বানানো। প্রচুর স্টক ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছিল, যা রীতিমতো চোখে লাগে)-ও হয়তো সৃজিত-পরিচালিত ফেলুদা-কাহিনির চেয়ে উনিশ-বিশে এগিয়ে থাকবে। ঘর থেকে বেরিয়ে ফেলুদার সঙ্গে পায়ে পায়ে হেঁটে রহস্যের এপিসেন্টারে পৌঁছোনোর যে অনুভূতি, তার কাছে নিয়ে যেতে কিছুটা ব্যর্থ এই সিরিজ। দার্জিলিংকে সুন্দরভাবে ধরা হলেও, ঘর থেকে বেরিয়ে সেখানে পৌঁছোনোর আনন্দ পাওয়া যায় না এই সিরিজ দেখতে বসে।

২। সিরিজের গতি কোনও কোনও সময়ে বড় ধীর হয়ে যায়। ৬ পর্বের বদলে হয়তো গোটা সিরিজ ৫ পর্বের হলেও বিশেষ ক্ষতি হত না। এমনই মনে হয় মাঝে মধ্যে। 

৩। রহস্যকাহিনির টানটান ভাব বিশেষ তৈরি হয় না এই সিরিজে। যাঁরা মূলকাহিনি আগে পড়েননি (যদি আদৌ এই সিরিজের এমন কোনও দর্শক থেকে থাকেন), তাহলে তাঁর মনেও হয়তো রহস্যের জমাটি ভাব জাঁকিয়ে বসবে না।

৪। বড়পর্দা-ছোটপর্দা-ওয়েবপর্দা— সব ক’টি মাধ্যমের আলাদা আলাদা ধরন আছে। বাজেটও আলাদা আলাদা হতে পারে। এই ছবি বড়পর্দার জন্য বানালে হয়তো যত অর্থ বিনিয়োগ হত, এক্ষেত্রে তা হয়নি। কম বাজেটে কাজের জন্য বহু কিছুর সঙ্গেই আপস করতে হয়। হালে বাংলা ওয়েবপর্দায় গোয়েন্দাকাহিনির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। গুণমানের নিরিখে সেগুলি ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি: দার্জিলিং জমজমাট’-এর পাশে যেখানেই থাকুক না কেন, একথা বলাই যায়, নির্মাণকৌশলের নিরিখে সেগুলি সৃজিতবাবুর নতুন ফেলুদা-সিরিজের আশপাশেই দাঁড়িয়ে থাকে। অভিনেতাদের উপস্থিতি, চরিত্রগুলির নাম উপেক্ষা করলে, মনে মনে সেপিয়া কালারটোনটি মুছে ফেললে অন্য আর পাঁচটি বাংলা ওয়েবপর্দার গোয়েন্দাকাহিনির চেয়ে দৃশ্যত বিশেষ আলাদা বলে মনে হয় না এই সিরিজটিকে। হয়তো স্বল্প বাজেটের কারণেই।

৫। অভিনয়ের নিরিখে টোটা রায়চৌধুরী যদি এই সিরিজের সম্পদ হন, তাহলে একথাও বলতে হবে, বাকি অনেকেরই অভিনয় বেশ বেমানান। আলাদা করে কারও নাম উল্লেখ না করলেও বলাই যায়, কিছু ক্ষেত্রে অতিঅভিনয় কাহিনির ছন্দ কাটে। 

বন্ধ করুন