বাংলা নিউজ > ঘরে বাইরে > অভিজাত এলাকায় প্রাইভেট গাড়ির উপর কর আরোপের প্রস্তাব ঢাকা উত্তরের মেয়রের
অভিজাত এলাকায় প্রাইভেট গাড়ির উপর কর আরোপের প্রস্তাব ঢাকা উত্তরের মেয়রের (ছবি: রয়টার্স)
অভিজাত এলাকায় প্রাইভেট গাড়ির উপর কর আরোপের প্রস্তাব ঢাকা উত্তরের মেয়রের (ছবি: রয়টার্স)

অভিজাত এলাকায় প্রাইভেট গাড়ির উপর কর আরোপের প্রস্তাব ঢাকা উত্তরের মেয়রের

  • ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ কমাতে ঢাকা উত্তরের মেয়র অভিজাত এলাকায় ব্যক্তিগত যানবাহন প্রবেশে ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব করেছেন।

ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ কমাতে ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম অভিজাত এলাকায় ব্যক্তিগত যানবাহন (প্রাইভেট কার) প্রবেশের সময় ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব করেছেন। আর এজন্য প্রথমে গাড়ির সংখ্যা গণনা করা হবে।

কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ কমানোর আরো অনেক স্বীকৃত পদ্ধতি আছে সেগুলো কাজে না লাগিয়ে মেয়রের এই উদ্যোগ কোনো কাজে আসবে না। এছাড়া বিকল্প সড়কের ব্যবস্থা না করে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায় না।

মেয়র আতিকুল ইসলাম শনিবার উত্তর সিটি কর্পোরেশনে "বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবসের" এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘‘ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানীতে প্রাইভেট কার প্রবেশ করতে হলে ট্যাক্স লাগবে। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বেড়ে গেছে। এ কারণে যানজট বেড়ে গেছে।'' তিনি আরো বলেন,"অভিজাত এলাকায় মেশিন বসিয়ে প্রথমে গাড়ি গণনা করা হবে। দেখব কত গাড়ি প্রবেশ করে। তারপর একটি সমীক্ষা করে বিষয়টি কার্যকর করব।"

বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত প্রাইভেট কারের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। এটা মোট যানবাহনের চার ভাগের এক ভাগ। গবেষণা বলছে, ব্যক্তিগত গাড়িতে প্রতি ১০ বর্গফুট রাস্তায় দুইজন যাত্রী চলাচল করে। কিন্তু গণপরিবহণের এই একই পরিমাণ সড়কে ১৫-১৬ জন যাত্রী চলাচল করে। ঢাকার সড়কের অর্ধেকেরও বেশি কমপক্ষে ৬০ ভাগ জায়গা দখল করে থাকে ব্যক্তিগত যানবাহন। আর গণপরিবহন দখল করে মাত্র সাত ভাগ। বাকি সড়ক দখল করে অযান্ত্রিকসহ অন্যান্য যানবাহন এবং অবৈধ দখল এবং পার্কিং।

নগর বিশেষজ্ঞ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন মনে করেন,"মেয়রের চিন্তা ঠিক আছে, কিন্তু তার আগে আরো অনেক কিছু করার আছে। তারমধ্যে যারা ওই এলাকা হয়ে ঢাকার এক প্রান্ত হয়ে আরেক প্রান্তে চলাচল করেন তাদের জন্য বিকল্প সড়কের ব্যবস্থা করতে হবে। বিকল্প সড়কের ব্যবস্থা না করে ট্যাক্স আরোপ করা যায় না। এই ব্যবস্থা সিংগাপুরে বহু আগে থেকেই আছে। কিন্তু সেখানে বিকল্পও আছে। ফুটপাথ হাঁটার উপযোগী এবং দখলমুক্ত করতে হবে। সাইকেল চালানোর নিরাপদ ব্যবস্থা করতে হবে। এসব না করে হঠাৎ করেই ট্যাক্স আরোপ করলে কোনো ফল পাওয়া যাবে না।"

আর এটা সব দিন এবং সব সময়ের জন্য করার প্রয়োজন নেই । কর্মদিবসে পিক আওয়ারের জন্য করা যায়। ছুটির দিনে এবং অফপিক আওয়ারে এটা করার কোনো উযোগিতা নেই বলে মনে করেন তিনি।

তার মতে, ঢাকায় ট্রাফিক সিগনালই কাজ করে না। হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলে। সেখানে ট্যাক্স বসাতে হলে তো স্বয়ংক্রীয় যান্ত্রিক ব্যবস্থা লাগবে। তা কি এখানে করা যাবে? না করা গেলে তো যানজট আরো বাড়বে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের(বুয়েট) শিক্ষক এবং নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, ‘‘ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ কমানোর আরো অনেক স্বীকৃত ও কার্যকর পদ্ধতি আছে। একটি শহরের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথম গবেষণা করে বের করতে হয় যে সড়ক অনুপাতে কতটি প্রাইভেট কার চলতে পারবে। তারপর সেই সংখ্যায় গাড়ি আনতে হলে প্রথমে রেজিস্ট্রেশন নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। একটি পরিবারের সর্বোচ্চ কয়টি গাড়ি থাকতে পারবে তা ঠিক করে দেয়া। ঢাকায় একটি পরিবারে ছয়টি গাড়িও আছে। এটা কীভাবে সম্ভব?''

তিনি বলেন," বাংলাদেশে তো ব্যক্তিগত গাড়ি উৎসাহিত করা হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কিনতে সফট লোন দেয়া হয়। ড্রাইভারের বেতন দেয়া হয়। ফুয়েল দেয়া হয়। গাড়ি না কেনা তো লোকসান। ব্যাংকের কর্মকর্তারা অনায়াসে গাড়ি পেয়ে যান। নাম মাত্র কিস্তি কাটা হয়। প্রজেক্টের নামে শত শত গাড়ি কিনে ব্যক্তিগত গাড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এগুলো আগে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।"

"সিংগাপুরে গাড়ির সংখ্যা নির্ধারিত। গাড়ি কিনতে হলে নিলামে অংশ নিয়ে অনেক টাকা দিতে হয় সরকারকে। আর সেই টাকা দিয়ে গণপরিবহণ ও সড়কের উন্নয়ন করা হয়। ফলে সাধারণ মানুষ এই ব্যবস্থাকে স্বাগত জানায়। আমাদের এখানে সেটা না করে হঠাৎ একজন মেয়র একটি কথা বললেন পরিকল্পনা ছাড়া এভাবে কাজ হয় না। আগে প্রয়োজন গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন। আর বিকল্প সড়ক।''

সরকার বাংলাদেশে হাইওয়ে এবং এক্সপ্রেস ওয়ে থেকেও টোল আদায়ের পরিকল্পনা করছে। টোলের পরিমাণ এবং পদ্ধতি নির্ধারণের কাজ চলছে। অধ্যাপক শামসুল হক বলেন," এটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছে। দর্শনটা হলো গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য আপনি যদি বিল দেন তাহলে সড়ক সেবা ব্যবহারের জন্য কেন অর্থ দেবেন না। এই অনিরাপদ সড়কর্থ আবার সড়ক উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু বিকল্প সড়কও থাকতে হবে। কারণ যার অর্থ নেই তিনি কি সড়কে চলাচল করবেন না?"

তারা দুইজনই মনে করেন, মেয়র যেটা করতে চাইছেন সেটা ঘোড়ার আগে গাড়ির মত। এটা করতে হবে সার্বিক পরিকল্পনার অধীনে। আগে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃত পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। এক পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ একটি গাড়ি নীতি করতে হবে। অনেক বেশি মাত্রায় ট্যাক্স আরোপ করতে হবে। তাহলে প্রাইভেট কার এমনিতেই কমে যাবে। রাস্তায় ট্যাক্স আরোপ করার দরকার নাও হতে পারে। আর সবার আগে গণপরিবহন করতে হবে উন্নত।

বন্ধ করুন