বাংলা নিউজ > ঘরে বাইরে > খেলার মাঠ ‘দখল’ পুলিশের, প্রতিবাদ করায় কিশোর ও মা'কে আটক, ক্ষোভের মুখে ছাড়া হল
সর্বশেষ রবিবার পুলিশ মাঠ দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী মা সৈয়দা রত্না ও তার কিশোর ছেলেকে বিনা ওয়ারেন্টে বিনা মামলায় ১৩ ঘণ্টা আটক রেখে প্রচলিত আইন ও সংবিধানের লঙ্ঘন করেছে। (ছবি সৌজন্যে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/ডয়চে ভেচে)

খেলার মাঠ ‘দখল’ পুলিশের, প্রতিবাদ করায় কিশোর ও মা'কে আটক, ক্ষোভের মুখে ছাড়া হল

  • বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সোমবার সকালে এক অনুষ্ঠানে মা এবং ছেলেকে আটকের ব্যাপারে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ‘তাঁরা (মা-ছেলে) লাইভ ভিডিয়োয় এসে কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য প্রচার করছিলেন।’

ঢাকার কলাবাগান এলাকার তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষার আন্দোলন দমন করতে গিয়ে পুলিশ একাধিক বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়েছে। তারা ওই মাঠ দখল করে কলাবাগান থানার ভবন নির্মাণ করতে চায়।

সর্বশেষ রবিবার পুলিশ মাঠ দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী মা সৈয়দা রত্না ও তার কিশোর ছেলেকে বিনা ওয়ারেন্টে বিনা মামলায় ১৩ ঘণ্টা আটক রেখে প্রচলিত আইন ও সংবিধানের লঙ্ঘন করেছে। আর ১৭ বছরের ওই কিশোরকে আটক করে থানার লকআপে রেখে একইসঙ্গে শিশু আইনের লঙ্ঘন করেছে বলে আইন বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন: Film on Ilish: বাংলাদেশের জাতীয় মাছ নিয়ে সিনেমা, ইলিশই এই গল্পের নায়ক

এদিকে রবিবার দিবাগত রাত ১২ টার পর যখন স্থানীয় লোকজনের চাপের মুখে তাঁদের থানা থেকে ছাড়া হয় তখন সৈয়দা রত্নাকে একটি মুচলেকা দিতে বাধ্য করা হয়। যার মূল কথা হল, মাঠ রক্ষায় তিনি শারীরিক বা ভার্চুয়ালি কোনও আন্দোলন করতে পারবেন না। আর পুলিশ যখন তাঁকে থানায় ডাকবে তখনই তাঁকে হাজির হতে হবে।

রবিবার সকালে আটকের পর পুলিশ দাবি করেছিল যে তিনি ও তাঁর ছেলে সরকারি কাজে বাধা দিয়েছেন। কিন্তু এব্যাপারে সৈয়দা রত্নার কাছে জানতে চাইলে তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘আমি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ভবনের দেয়াল নির্মাণের দৃশ্য ফেসবুকে লাইভ করছিলাম, পুলিশ তখন আমায় আটক করে। আমার ছেলে তখন সেখানে ছিল না। একটু পরে সে আসে। তার হাতে ক্যামেরা থাকায় পুলিশ তাকেও আটক করে। থানায় নেওয়ার পর আমাকে ছোট্ট একটি রুমে রাখা হয়। আর আমার ছেলেকে লকআপে ঢোকানো হয়। আমি বারবার বলছিলাম আমার ছেলেকে লকআপে না রেখে আমার কাছে রাখা হোক। কিন্তু পুলিশ আমরা কথা শোনেনি।’

১৩ ঘন্টা পর রাতে ছাড়ার আগে মুচলেকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমায় একটি কাগজে সই করতে বলা হয়। তাতে আমাকে আন্দোলন বা ফেসবুক লাইভ না করার জন্য বলা হয়। আরো কিছু লেখা ছিল কিনা, আমি খেয়াল করিনি। আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘এই একটি মাত্র মাঠ আছে আমাদের এলাকায়। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই এটি খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু কয়েকমাস আগে পুলিশ মাঠের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেয় ভবন নির্মাণের জন্য। তখন থেকেই আমরা প্রতিবাদ করে আসছি।’

গত জানুয়ারি মাসে কাঁটাতারে বেড়া দেওয়ার পর শিশুরা ওই মাঠে খেলতে গেলে পুলিশ কয়েকটি শিশুকে কান ধরে ওঠবস করায়। সেই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে তখন কয়েকজন পুলিশ কনেস্টবলকে সাসপেন্ড করা হয়। আর কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার আগ ধেকেই কলাবাগান থানার শতাধিক পুলিশ সেখানে দিন-রাত অবস্থান শুরু করে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘মা ও তাঁর ছেলেকে আটক করা ছিল বেআইনি। তাঁদের মামলা বা ওয়ারেন্ট ছাড়া আটক করা হয়েছে। আর অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরকে আটক করে চরম বেআইনি কাজ করেছে পুলিশ। এর ফলে সে ট্রমার মধ্য দিয়ে যাবে। আটকের পর থানায় আবার ১৩ ঘণ্টা রাখা হয়েছে। তাঁরা এখন এর বিরুদ্ধে আদালতে যেতে পারেন। পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। পুলিশ এখন আইনের বাইরে গিয়ে পেশি শক্তির জোরে চলতে চায়। তারা তাই বেআইনি কাজ করছে।’

আরও পড়ুন: How to Control Blood Sugar: ডায়াবিটিস থেকে বাঁচতে চান? চান, হজম ক্ষমতা বাড়ুক? তাহলে এই ৫টি নিয়ম মেনে চলুন

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, ‘পুলিশ সংবিধান ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন ছাড়াও সরাসরি ফৌজজারি অপরাধ করেছে। এই ঘটনায় জড়িত পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করা উচিত। আমরা মামলা করি না বলে পুলিশ বার বার অপরাধ করতে সাহস পায়। পুলিশ কোনও মুচলেকা রাখতে পারে না। মুচলেকা রেখেও তারা একটি অপরাধ করেছে। আর এই মুচলেকা প্রমাণ করে পুলিশ তাদের মানসিক নির্যাতন করেছে।’ তাঁর মতে, ‘বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু সনদে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। এখন সরকারের উচিত হবে দায়ী পুলিশ সদস্যদের শাস্তির আওতায় আনা। তা যদি করা না হয়, তাহলে প্রমাণ হবে বাংলাদেশ ওই সনদে স্বাক্ষর করেও তা মানছে না।’

আর মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন,  ‘পুলিশ নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন-সহ নানা বেআইনি কাজ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে। তার কোনো প্রতিকার নেই। তাই আজকের এই পরিস্থিতি।’ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি করেন তিনি।

এদিকে এ বিষয়ে জানতে কলাবাগান থানার ওসিকে বার বার ফোন করে ও মেসেজ পাঠিয়েও কোনও জবাব পাওয়া যায়নি। ওই এলাকার ডেপুটি পুলিশ কমিশনারকেও পাওয়া যায়নি। অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনার শাহেন শাহকে পাওয়া গেলেও তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। সব ওসি সাহেব জানেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করুন।’ তাঁকে ফোনে বার বার চেষ্টা করেও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানালে তিনি বলেন, ‘চেষ্টা করে যান, এক সময় না এক সময় পাবেন।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সোমবার সকালে এক অনুষ্ঠানে মা এবং ছেলেকে আটকের ব্যাপারে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, 'তাঁরা (মা-ছেলে) লাইভ ভিডিয়োয় এসে কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য প্রচার করছিলেন। সে জন্য তাদের বারবার নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এক পর্যায়ে যখন থামাতে পারেনি, তখন তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'ঢাকার জেলা প্রশাসক মাঠের জায়গাটি খাস জমি বলে চিহ্নিত করে বরাদ্দ দিয়েছে কলাবাগান থানাকে। সব প্রক্রিয়া শেষে যখন ভবন নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন খেলার মাঠ রাখার দাবিতে অনেকে কথা বলেছেন। আমরা মনে করি, খেলার মাঠে বাচ্চারা খেলাধুলা করবে এটাই স্বাভাবিক। খেলার মাঠের ব্যবস্থা যেমন করতে হবে আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও থানার জন্য জায়গাটা জরুরি। জায়গাটায় কী করা যায়, এটা আমরা পরে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।'

তবে স্থপতি ইকবাল হাবিব ডয়চে ভেলেকে বলেন, 'কলাবাগানের ওই ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে তিনটি খেলার মাঠ থাকার কথা। আছে মাত্র একটি। ওটি দখল করতে গিয়ে পুলিশ ১৭ ধরনের আইন লঙ্ঘন করেছে। তেঁতুলতলা মাঠটি ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। এটা কোনও পতিত খাস জমি নয়। ড্যাপ-সহ আরও অনেক নগর পরিকল্পনায় ওটাকে খেলার মাঠ হিসেবে দেখানো হয়েছে। আর আদালতের রায় আছে দীর্ঘদিন ধরে যদি কোনও খোলা জায়গা মাঠ হিসেবে ব্যবহার হয়, সেই ব্যবহার প্রাধান্য পাবে।'

আরও পড়ুন: Sovan-Baisakhi: বান্ধবী বৈশাখীকে জন্মদিনে আদুরে উপহার দিলেন শোভন, আর কী করলেন?

এদিকে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ওই মাঠরক্ষায় সেচ্চার হয়েছে। তারা মা ও ছেলেকে ১৩ ঘণ্টা আটক রাখার বিচার দাবি করেছেন। বিকেলে তাঁরা মাঠের সামনে মানব বন্ধন করে বলেছেন, তাঁরা মাঠের জায়গায় কোনওভাবেই থানা ভবন হতে দেবেন না। তাঁরা প্রয়োজনে ঢাকা-সহ পুরো দেশের মানুষকে সংগঠিত করবেন মাঠ দখলের বিরুদ্ধে।

সকালে তাঁরা এক সংবাদ বৈঠকে মাঠ রক্ষার আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেখানে বেলার নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, 'মুচলেকার ভাষা হচ্ছে মাঠ রক্ষার আন্দোলন করা যাবে না। আমরা বলি গণতন্ত্র। আবার বলি মাঠ রক্ষার আন্দোলন করা যাবে না। তাহলে কী নিয়ে আন্দোলন করব, তার একটা তালিকা আমাদের দিয়ে দেওয়া হোক।'

বন্ধ করুন